আমি নিজের মুখখানা আরও বেশি গোমড়া করে তুললুম। আর সত্যি বলতে কী, এই ভূতুড়ে জন্তুটা আমাকে তার বন্ধু মনে করে শুনে আমার রাগ যেন আরও বেড়ে উঠল। আমি হব এইসব অপরূপ চেহারার বন্ধু? তা আর জানি না কচুপোড়া খাও!
আমি এখনও কথা কইলুম না দেখে ভোম্বল আরও দমে গিয়ে বললে, হ্যাঁ ভাই অমল, তুমি কি সত্যি সত্যি আমাকে মাপ করবে না? দ্যাখো, এই আমি আট হাত বার করলুম! আট হাত জোড় করে আমি মাপ চাইছি এমন কাজ আর কক্ষনোও করব না! বলো তো আমি চার-পাঁচটা নাক বের করে চার-পাঁচটা নাকে খত দেব!
ধাঁ করে আমার মাথায় এক বুদ্ধি এল। আমি বেশ বুঝলুম ভোম্বলের সিদ্ধি খাওয়ার কথাটা পণ্ডিতের কানে তুলে দিলে পাছে কমলার সঙ্গে তার বিয়ের সম্বন্ধটা ভেঙে যায়, সেই ভয়েই সে আমার কাছে এত কাকুতিমিনতি করছে! নইলে মনেমনে সে নিশ্চয়ই আমাকে দু-চক্ষে দেখতে পারে না! হাতে যখন পেয়েছি, তখন আর একে হাতছাড়া করা নয়! এই ভীষণ শত্ৰুপুরীতে একে দিয়েই কাজ করিয়ে নিতে–অর্থাৎ কাঁটা দিয়ে কাটা তুলতে হবে।
কাজেই এইবারে আমি মুখ খুলে বললুম, ওরকম গান তুমি আর কখনও গাইবে না?
না, না, না! এই তিন সত্যি!
আচ্ছা, এবারের মতন তোমাকে মাপ করা গেল!
কালকের কথা কারুকে বোলো না?
না।…কিন্তু একটা কথা জিজ্ঞাসা করি। তোমার কি রাজসভায় যাতায়াত আছে?
খুব আছে! রাজা যে আমাকে বড় ভালোবাসেন।
আচ্ছা ভোম্বল, তুমি অমরচন্দ্রকে চেনো?
খুব চিনি! কিন্তু একথা জিজ্ঞাসা করছ কেন?
তুমি বোধহয় ওই অমরচন্দ্র আর আমাদের পণ্ডিতকে দেখতে পারো না?
ভোম্বলের মুখ শুকিয়ে গেল। চারিদিকটা একবার দেখে নিয়ে ভয়ে-ভয়ে বললে, একথা তুমি জানলে কেমন করে?
আমি বললুম, যেমন করে তোক জেনেছি। আচ্ছা ভোম্বল, জ্যান্ত মানুষের দেহ নিয়ে ছুরি দিয়ে কাটাকুটি করা কি ভালো?
ভোম্বল বললে, কে কাটছে, আর কাকে কাটছে, তা না জেনে মত দি কেমন করে? এই ধরো, যদি কেউ বলে যে আমি বেঁচে থাকতে-থাকতেই ছুরি দিয়ে কেউ আমার দেহ ব্যবচ্ছেদ করবে, তাহলে আমি এমন চেঁচিয়ে আপত্তি করব যে আকাশ ফেটে যাবে। কিন্তু তোমার দেহ ব্যবচ্ছেদ করলে আমি আপত্তি না করতেও পারি!
আমি চোখ রাঙিয়ে বললুম, বটে, বটে! তাই নাকি?
থতমত খেয়ে ভোম্বল বললে, না ভাই, আমি ঠাট্টা করছিলুম!
এ ঠাট্টাটা তোমার কালকের গানের চেয়েও খারাপ।
যাই-ই বলো ভাই, তুমি ভারি বরসিক। ঠাট্টা বোঝে না। এ দেশের লোকরা খুব ঠাট্টা বোঝে। আমি একবার ঠাট্টা করে একজনের চারটে হাত কেটে নিয়েছিলুম। সে কিছু বলেনি।
বলবে কেন? চারটের জায়গায় তার আবার আটটা নতুন হাত গজিয়ে উঠেছিল।
হ্যাঁ, এ কথা সত্যি বটে। কিন্তু দ্যাখো অমল, তোমার আজকের কথা শুনে আমার আর একটা কথা মনে পড়ে গেল। কিছুদিন আগে একটা তুর্কি পথ ভুলে আমাদের দেশে এসে পড়েছিল। পণ্ডিতমশাই সেই তুর্কিটার জ্যান্ত দেহ নিয়েই কাটাকুটি করেছিলেন।
এর সঙ্গে যেন আমার নিজের কোনও সম্পর্কই নেই, এমনি উদাসীন ভাবে আমি বললুম, কেন?
কেন, তা ঠিক জানি না। তবে গুজবে শুনেছিলুম, আমাদের চেয়েও নাকি নতুন একরকম মানুষ তৈরি করবার চেষ্টা হচ্ছিল।
আমি শিউরে উঠে বললুম, তারপর?
নতুন মানুষ তৈরি হল না ছাই হল! মাঝখান থেকে সেই তুর্কি বেচারাই দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে মারা পড়ল! সেই থেকে এখানে আইন হয়েছে, যার দেহ কাটাকুটি করা হবে, কাটবার আগে তার নিজের মত না নিলে চলবে না।
একটা অস্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বাঁচলুম, বুকের ওপর থেকে মস্ত একটা বোঝা নেমে গেল! পণ্ডিত যদি খুব আদর মাখা মিষ্টি সুরেও বলেন–অমল, তুমি লক্ষ্মীছেলে। আমি তোমার দেহখানি লম্বালম্বি ভাবে ছুরি দিয়ে কেটে ফালাফালা করতে চাই। আশাকরি আমার এ অনুরোধ তুমি রাখবে! তখন আমি নিশ্চয়ই বলব না যে, আপনার আদেশ আমি মাথায় পেতে নিলুম! তবে আর দেরি কেন? দয়া করে ছুরি উঁচিয়ে এগিয়ে আসুন, আমি ধন্য হই!
ভোম্বল বললে, দ্যাখো, আজ কদিন ধরে একটা ব্যাপার লক্ষ করছি! তুমি যার নাম করলে, ওই অমরা ব্যাটা আর পণ্ডিত প্রায়ই একসঙ্গে কী গুজগুজ করে। ওরা বোধহয় আবার কোনও শয়তানি করবার চেষ্টায় আছে!
আমি মনের ভাব লুকিয়ে বললুম, না, না, আমাদের পণ্ডিতমশাই খুব সাধু লোক। দয়ার শরীর!
হেঃ, সাধু লোক! দয়ার শরীর! তুমি তাহলে তোক চেনেন না! জুজুবুড়োজুজুবুড়ো, পণ্ডিত হচ্ছে, একটি জুজুবুড়ো! যাক সেকথা। আজ তুমি বেড়াতে যাবে নাকি?
আবার!
ভয় নেই! আজ আর আমি হোটেলেও যাব না–গান-টানও গাইব না!
তবে কোথায় যাব?
মন্ত্রীসভায়। সেখানে আজ তর্ক হবে।
আচ্ছা, পণ্ডিতমশাইকে জিজ্ঞাসা করে দেখব। তার মত নেওয়া চাই তো!
.
একাদশ । আবার নরডিম্ব
বৈকালে আমরা যখন চা পান করি, এরা তখন লঙ্কার শরবত খায়! পণ্ডিতমশাই বলেন, পৃথিবীর সবটাই যে সুখের নয়, এ সত্য মনে রাখবার জন্যেই লঙ্কার ঝাল শরবতের ব্যবস্থা।
পৃথিবীতে দুঃখ যে কত, জুজু রাজ্যের জুজুদের পাল্লায় পড়ে সেটা হাড়ে-হাড়ে টের পাচ্ছি। তাই ঝাল শরবত পান করে সে দুঃখ আরও বাড়াবার চেষ্টা আমি কোনওদিন করিনি।
আজ বৈকালে ঝাল-শরবতের মহিমায় কমলা যখন হা হু করছিল, সেই সময়ে তার সঙ্গে আমার দেখা হল।
কমলা বললে, আজ নীল শাড়ি পরে আমাকে কেমন দেখাচ্ছে?
