তোমার যদি ভালো না লাগে, তবে কেন তুমি খোলার ভেতরে থাকবে?
আমিও তাই বলি। বাবা কিন্তু বোঝেন না। বাবা ভারি একরোখা মানুষ। আচ্ছা, বাবা যে বলেন, তুমি নাকি আমাদের মতন হরেকরকম মূর্তি ধরতে পারো না, তোমার দেহ নাকি হাড়ে হাড়ে ভরা, আর তুমি নাকি গড়াতে পারো না? একথা কি সত্যি?
সত্যি।
তোমার শ্রীখোল নেই?
নিশ্চয়ই নেই! আমাদের দেশে খোলার ভেতরে থাকে কেবল কচ্ছপ, কাঁকড়া, শামুক আর গেঁড়ি-গুগলিরা।
আমি কেতাবে তোমার মতন জীবের কথা পড়েছি বটে, কিন্তু এর আগে চোখে কখনও দেখিনি। আচ্ছা, তোমাদের দেশে সব মানুষই কি একরকম দেখতে?
হ্যাঁ।
তোমার চেহারা আমার খুব ভালো লাগে। আচ্ছা, তোমাদের দেশের মেয়েদেরও দেখতে কি আমাদেরই মতন?
হ্যাঁ। তবে তারা তোমার মতন এত সুন্দর নয়।
আমার কথা শুনে কমলা খুব খুশি হয়ে হাসতে লাগল।
জানালা দিয়ে দূরের একখানা বাড়ি দেখিয়ে আমি জিজ্ঞাসা করলুম, আচ্ছা কমলা, ওই যে মস্ত বাড়িখানা দেখা যাচ্ছে, ওখানে কী হয়?
কমলা একবার উঁকি মেরে দেখে বললে, ও হচ্ছে স্ফুটনাগার!
সে আবার কী?
দুর, তুমি ভারি বোকা! কিচ্ছু জানো না! ওখানে যে ছেলেমেয়েরা জন্মায়! আমার পিঠ কটকট করছে, আমি এখন শ্রীখোলের ভেতরে ঢুকতে চললুম। আমার সে মূর্তি আমি তোমাকে দেখাব না, তাহলে তুমি আমাকেও ঠাট্টা করবে! পিঠে কালো কেশমালা দুলিয়ে। কমলা একছুটে চলে গেল।
আমি দুই চোখ মুদে শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলুম, স্ফুটনাগার আবার কাকে বলে? কমলার কথায় তো কিছুই স্পষ্ট হল না!
হঠাৎ ঘরের ভিতরে পণ্ডিতমশাই ও আর-একজনের গলা পেলুম। আমি উঠে বসতে যাচ্ছিলুম, কিন্তু তার পরেই ভাবলুম ওরা কি বলাবলি করে চুপিচুপি শোনাই যাক না!
খানিক পরেই বুঝলুম, ওরা আমার সম্বন্ধেই কথা কইছে! ওরা বোধহয় ভেবেছে, আমার ঘুম এখনও ভাঙেনি, আমি কিছুই শুনতে পাচ্ছি না!
অচেনা গলায় কে বললে, পণ্ডিতমশাই, আপনার এই নমুনাটি বেশ সরেস নয়।
পণ্ডিত বললেন, তা না হতেও পারে। কিন্তু এই নিরেস নমুনা নিয়েই আমরা যদি কেল্লা ফতে করতে পারি, তাহলে তো আমাদের সুনাম আরও বেশিই হবে! আমার ধ্রুব বিশ্বাস যে একবার অস্ত্র করলেই আমি ওর দেহকে ঠিক বদলাতে পারব।
তারপর?
আরও অনেক মানুষ ধরে এনে এই একই উপায়ে আমাদের জাতির জীবনীশক্তি বাড়িয়ে তুলব। এ ছাড়া আর উপায় নেই–বহু বৎসরের পুরোনো হয়ে পড়েছে বলে এখানকার সকলেরই জীবনীশক্তির অবস্থা হয়ে আসছে ক্রমেই ক্ষীণ!
অস্ত্র করবার আগে ওই লোকটাকে কি সব কথা জানানো হবে?
অমরচন্দ্র, তুমি একটি আস্ত গাড়ল। আমাদের উদ্দেশ্য বুঝতে পারলে অমল মোটেই খুশি হবে না।
কী পদ্ধতিতে আপনি কাজ করবেন?
প্রথমে অমলের দেহকে আমি লম্বালম্বি ভাবে ফালাফালা করে কাটব। তারপর দেহের সেই খণ্ডগুলোকে বাজের আগুনে তাতিয়ে হাড়গোড় সব বার করে নেব।
এতক্ষণ শান্ত ভাবে চুপ করে সব শুনছিলুম, কিন্তু এই পর্যন্ত শুনেই আতঙ্কে আমি প্রায় চিৎকার করে উঠেছিলুম আর কী! ওরে চাঁদমুখো বুড়ো রাক্ষস, তোর মনে মনে এত শয়তানি?
অমরচন্দ্র বললে, কিন্তু পণ্ডিতমশাই, মনে আছে তো, গেল বছরে সেই তুর্কি লোকটার ওপরে অস্ত্রাঘাত করে আপনি বিফল হয়েছিলেন। সেই থেকে মহারাজা হুকুম দিয়েছেন, এ রাজ্যে কেউ আর এরকম পরীক্ষা করতে পারবে না?
হুঁ। কিছুই আমি ভুলিনি। কিন্তু আমি কাজ সারব খুব লুকিয়ে। তারপর যদি সফল হই, মহারাজা আর আমার ওপরে রাগ করতে পারবেন না। সেবারের পরীক্ষা ব্যর্থ হয়েছিল বলেই তো অত গোলমাল হয়!
এখানকার অনেক পণ্ডিতও আপনার শত্রু, এ কথাটাও মনে রাখবেন! আর রাজসভায় ভোম্বলদাসের খুবই পসার, সে-ও আপনার বিশেষ বন্ধু নয়!
পণ্ডিত বললেন, সবই আমার মনে আছে। যেদিন অস্ত্র করব, তুমি হাজির থাকবে তো?
নিশ্চয়ই! প্রমোদকেও নিয়ে আসব।
হ্যাঁ, তাকেও দরকার হবে বইকী,–ছুরি চালাতে ছোকরা খুব মজবুত!
অমরচন্দ্র বললে, ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি, আপনার এবারকার পরীক্ষা যেন সার্থক হয়–চন্দ্রসেনের প্রেতাত্মা যেন আমাদের সাহায্য করেন।
তারপর পায়ের শব্দে বুঝলুম, দুই শয়তান ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
হুঁ, তা হলে আমার দেহকে লম্বালম্বি ভাবে ফালাফালা করে কেটে, বাজের আগুনে তাতিয়ে, হাড়গোড় বার করে নিয়ে নতুন এক পরীক্ষা করা হবে? ওঃ, কী সুমধুর কথা রে, শুনে অঙ্গ যেন জল হয়ে গেল!
আমি ভয় পেয়েছি? ধেৎ, ভয় তো খুব ছোট কথা, আমার বুকটা এরই মধ্যে কুঁকড়ে যেন শুকনো চামড়ার মতন শক্ত হয়ে উঠেছে।
এমন সময়ে ঘরের ভিতরে আবার পায়ের শব্দ!
ইনি আবার কোন অবতার? এখানে এসে বুক ধড়াস ধড়াস করেই প্রাণটা বেরিয়ে যাবে দেখছি। সর্বদাই নতুন-নতুন বিপদের ভাবনায় মনটা অস্থির হয়ে আছে। যে সৃষ্টিছাড়া দেশ!
কান পেতে মটকা মেরে পড়ে রইলুম।
তার পরেই ভোম্বলদাসের ভরাট ভারিকে গলায় শুনলুম, আরে ও কী! ওহে অমল, তোমাদের দেশের লোকেরা কি এত বেলা পর্যন্ত বিছানায় কাত হয়ে থাকে?
আমি উঠে বসে নির্বাক হয়ে রইলুম–ভোম্বল কালকে যে গানটা গেয়েছিল, সেটা এখনও আমি ভুলতে পারিনি। আমার নাম অমলা? আমায় দেবে কানমলা? বটে!
ভোম্বল তার কাতলা মাছের মতন ড্যাবডেবে চোখে আমার মুখের পানে চেয়ে বুঝতে পারলে যে, আমি তার ওপরে একটুও খুশি নই। সে আমার কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বললে, অমল! ভায়া! কাল সন্ধের সময়ে আমি বেঁকের মুখে একটা গান গেয়ে ফেলেছিলুম। তা ভাই, বন্ধুত্ব থাকলে অমন হয়েই থাকে। তুমি কিছু মনে কোরো না।
