অনেকগুলো পাথরের কিম্ভুতকিমাকার মূর্তি রয়েছে। সৃষ্টির প্রথম অবস্থায় এই পিপে মানুষগুলোর চেহারা কীরকম ছিল, সেই মূর্তিগুলোর সাহায্যে তাইই দেখানো হয়েছে।
এক জায়গায় একটা যন্ত্র দেখলুম, তার নাম নরডিম্ব-প্রস্ফুটন-যন্ত্র! তার পাশে রয়েছে। উটপাখির ডিমের মতন মস্ত একটা ডিম–উপরে লেখা নরডিম! দেখে আমার মাথা ঘুরে গেল বললেও কম বলা হয়!–ওরে বাবা! ঘোড়ার ডিমের কথা তো লোকের মুখে শুনেছি, মানুষের ডিম আবার কী? এর কথা তো ঠাট্টা করেও কেউ বলে না!
অনেকক্ষণ সেই ডিম আর যন্ত্রের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলুম। কিন্তু তবু কোনও হদিস না পেয়ে স্থির করলুম-নিশ্চয়ই এটা একটা বড় রকমের কৌতুক! জাদুঘরে এরকম গাঁজাখুরি কৌতুক থাকা উচিত নয়।
আর একটা ঘরে গিয়ে দেখলুম চন্দ্রসেনের প্রকাণ্ড প্রতিমূর্তি। চন্দ্রসেন–এই অদ্ভুত জীবদের স্রষ্টা! সে মূর্তি দেখে মনে কিছুমাত্র শ্রদ্ধার উদয় হল না। বয়সের ভারে ঝুঁকে পড়া, শীর্ণদেহের এক বৃদ্ধ–তার দুই চক্ষে ঠিক যেন হিংসা-পাগল হত্যাকারীর দৃষ্টি। দেখলেই ভয়ে বুক শিউরে ওঠে! আমার মনে হল চন্দ্রসেনের চোখদুটো যেন কুটিল ভাবে আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। এ-রাজ্যে সাধারণ মানুষের আবির্ভাব দেখে চোখদুটো যেন মোটেই খুশি নয়!
ঘরের ভিতরটা তখন অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে এসেছে। ভয়ে-ভয়ে পিছন পানে তাকিয়ে। দেখি, সেই মানকে বলে লোকটা চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে।
তার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই সে বললে, এ-ঘরে আর বেশিক্ষণ থাকবেন না।
আমি বললুম কেন?
মানকে ভয়েভয়ে খুব চুপিচুপি বললে, অন্ধকার হলে এ-ঘরে আর কেউ আসে না।
কেন?
একটা হাত তুলে চন্দ্রসেনের মূর্তি দেখিয়ে সে বললে, ওঁর ভয়ে!
আমি আবার মূর্তির দিকে তাকালুম। কোনও জানলার ফাঁক দিয়ে একটি ক্ষীণ আলোকের টুকরো মূর্তির ঠোঁটের ওপরে এসে পড়েছে। আমার মনে হল, চন্দ্রসেনের মুখে যেন একটা রক্তপিপাসু নিষ্ঠুর হাসির রেখা ফুটে উঠেছে।
ফিরে বললুম, ওঁর ভয়ে কীরকম? ওটা তো পাথরের মূর্তি?
সে বললে, অন্ধকার হলেই ওই মূর্তি জাগ্রত হয়ে ওঠে। তখন সকলেই শুনতে পায় কে যেন ভারী ভারী পাথুরে পা ফেলে ঘরময় চলে বেড়াচ্ছে। আসুন, আমি আর এখানে থাকব না।
আমি তার কথা বিশ্বাস করলুম না বটে, কিন্তু এই ঘরে–এমনকী জাদুঘরেও আর থাকতে ইচ্ছা হল না। একেবারে বাইরে বেরিয়ে হোটেলের দিকে গেলুম ভোম্বলের খোঁজে।
সেখানে গিয়ে দেখি, ভোম্বল ততক্ষণে মহাধুমধাড়াক্কা লাগিয়ে দিয়েছে। তার খাবার টেবিলের উপরে পঁচিশ-ত্রিশ খানা থালা পড়ে রয়েছে এবং একটা ঘটিতে মুখ দিয়ে ঢক ঢক করে কী পান করছে।
আমাকে দেখেই ভোম্বল টেবিল চাপড়ে খুব ফুর্তির সঙ্গে বলে উঠল, এই যে অমলা! এসো, এসো, একটু ভাং খাবে এসো!
মনের রাগ কোনওরকমে সামলে বললুম, আমি সিদ্ধি ছুঁই না! সন্ধের আগে আমার ফেরবার কথা, আমাকে নিয়ে চলো!
ভোম্বল তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে বললে, ভাগ্যিস মনে করিয়ে দিলে! চলো, তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসি। নইলে পণ্ডিতবুড়োটা রাগ করবে, আর তার মেয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে দেবে না!
মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দেবে না মানে?
ওহ, তুমি জানো না বুঝি? কমলার সঙ্গে আমার বিয়ের সম্বন্ধ যে স্থির হয়ে আছে।
কমলা! অমন সুশ্রী মেয়ের সঙ্গে এই বিটকেল জন্তুটার বিয়ে হবে! আশ্চর্য!
ভোম্বল বললে, শোনো। আমি যে ভাং খাই, পণ্ডিতবুড়োকে একথা বোলো না। যদি বলল, তাহলে তুমি বিপদে পড়বে! এখন চলো।
আমরা দুজনে হোটেল থেকে বেরিয়ে এলুম।
ভোম্বল বেজায় টলছিল। তাই বোধহয় তিনখানা পায়ে আর টাল সামলাতে না পেরে খান ছয়েক পা বার করে হাঁটতে লাগল। তারপর চারখানা হাত বার করে চার হাতে তালি। দিতে-দিতে গাইতে লাগল–
ও তার নামটি যে ভাই অমলা!
ও সে নয়কো তবু অবলা!
তাকে দাও না সবাই কানমলা–
কানমলা হো! কানমলা
কানমলা! তার নাম অমলা!
ঠ্যাং আছে তার মোটে দুটো,
মগজে তার মস্ত ফুটো, বু
দ্ধিতে তাই ডাহা ঝুটো–
করো না তাকে চ্যাং-দোলা!
ও তার নাম রেখেছি অমলা!
হয় কুপোকাৎ চড়লে গাড়ি,
ভবঘুরের নেইকো বাড়ি,
কী চেহারা! ঠিক আনাড়ি!
খোরাক খালি কাঁচকলা!
ও তার নাম রেখেছি অমলা!
ও সে নয়কো তবু অবলা!
তাকে। দাও না জোরে কানমলা,
কানমলা হো। কানমলা–
কানমলা! তার নাম অমলা!
আমার এমন রাগ হতে লাগল ইচ্ছা হল, মারি তার গালে ঠাস করে এক চড়! কিন্তু হতভাগা এখন মত্ত, একে মারা না মারা দুই-ই সমান! কাজেই মুখ বুজে তার সব অসভ্যতা সহ্য করতে হল।
.
দশম। আমি নতুন মানুষ হব
পরের দিন সকালে পাখির গানে আমার ঘুম ভেঙে গেল।
জানলার ধারে পুচ্ছ নাচিয়ে একটি চমৎকার রঙিন পাখি মিষ্টি সুরে গান গাইছিল।
আমাদের চেনা পৃথিবীর পাখি দেখে চোখ যেন জুড়িয়ে গেল! ভাগ্যিস, চন্দ্রসেনের মগজে এখানকার পাখিদের দেহকেও উন্নত করবার খেয়াল গজায়নি!
এমন সময়ে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করলে সুন্দরী কমলা। তার মুখখানি কেমন যেন ম্লান ম্লান।
আমি শুধালুম, তোমার মুখ অমন কেন? অসুখ করেছে নাকি?
কমলা বললে, না! বাবা আমার ওপরে রাগ করেছেন।
কেন?
আমি এইরকম মূর্তি ধরেছি বলে। তিনি বললেন, আমি যদি শ্রীখোলের ভেতরে না থাকি তাহলে আমার পাপ হবে। একথা কি সত্যি?
