ভোম্বলের মুখ আবার ভোম্বলেরই মতন কুৎসিত হয়ে গেল। দন্তবিকাশ করে হেসে বললে, দেবরাজ ইন্দ্র যে বিদ্যার জোরে মহর্ষি গৌতমের মূর্তি ধারণ করেছিলেন, আমিও সেই বিদ্যা জানি! হ্যাঁ, আর পণ্ডিতের মেয়ে কমলাও এ বিদ্যায় ভারি পাকা। এ রাজ্যে এই বহুরূপী বিদ্যায় আমাদের আর জুড়ি নেই–আমাদের মতন ভালো নকল আর কেউ করতে পারে না! না, মিছে কথায় সময় কাটানো হচ্ছে–আমার খিদে পেয়েছে! চলো জাদুঘরে যাই! চাকা! এই চাকা! বলেই সে এমন তীক্ষ্ণ শিস দিল যে আমার মনে হল কানের কাছে বুঝি কোনও কলের গাড়ির ইঞ্জিন বাঁশি বাজালে!
কোথা থেকে সোঁ-সোঁ করে দু-খানা মস্ত চাকা আমাদের সামনে এসে হাজির। তাদের চঞনাভির মধ্যে অর্থাৎ মাঝখানে দুজন পিপে-মানুষ কী কৌশলে নিজেদের সংলগ্ন করে রেখেছে এবং হাতে করে পাখির দাঁড়ের মতন বেয়াড়া এক বসবার আসন ধরে আছে।
লোকে যেমন করে ব্যাগ বা পোর্টম্যান্টো গাড়ির ওপরে উঠিয়ে দেয়, ভোম্বল ঠিক তেমনি ভাবেই ধরে আমাকে সেই দাঁড় আসনে তুলে বসিয়ে দিলে! তারপর নিজেও আমার পাশে এসে বসে হেঁকে বললে, এই! জাদুঘর শিগগির!
বোঁ করে চাকা ছুটল–কে যেন আমাকে এক হাচটা টান মেরে দাঁড় থেকে ফেলে দেয় আর কী! কী কষ্টে যে ঝোঁক সামলে নিলুম, তা আর বলবার নয়! চাকা দুখানা ছুটল ঠিক আমাদের পাঞ্জাব মেলের মতন, হু-হু হাওয়ার তোড়ে নিশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসতে লাগল। দাঁড়ের ওপর বসে থাকে, কার সাধ্য!–ভোম্বলের কিন্তু কোনওই খেয়াল নেই– দন্তবিকাশ করে হাসতে হাসতে সে দিব্যি আরামেই যাচ্ছে! গাড়ির পায়ে নমস্কার!
আচমকা গাড়িখানা দাঁড়িয়ে পড়ল। এবং এবারে আমি কিছুতেই টাল সামলাতে পারলুম না–দাঁড় থেকে ঠিকরে দশ হাত দূরে খুব নরম কী একটা জিনিসের ওপর দিয়ে পড়লুম এবং পরমুহূর্তেই সে জিনিসটাও আমাকে তুলে ছুঁড়ে ফেলে দিলে।
খনখনে গলায় কে বলে উঠল, কীরকম লোক মশাই আপনি?
আমি নিশ্চয় কারুর ঘাড়ের ওপরে গিয়ে পড়েছিলুম। তাড়াতাড়ি মাটি থেকে উঠে গায়ের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বললুম, আমাকে মাপ করবেন! আমি–
আপনি কি দেখতে পাননি যে, আমি এখন আমার শ্রীখোলের ভেতরে নেই? আপনি কি চোখের মাথা খেয়েছেন? আপনি কি–ও হরি, এটা যে সেই মানুষটা!
এতক্ষণ পরে আমি একটু দম পেলুম এবং আমার চোখের ধোঁয়া ধোঁয়া ভাবটা কেটে গেল। ভালো করে তাকিয়ে দেখি, একটা পিপে মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি দিচ্ছে।
অনুতপ্ত স্বরে বললুম, দেখুন, এরকম দাঁড়ে চড়ার অভ্যাস আমার কোনও কালেই নেই। তাই
আরে গেল, এ যে আমার শ্রীখোলের সঙ্গে কথা কয়! মশাই কথা কইতে হয় তো আমার সঙ্গে কথা বলুন।
তখন ডান দিকে ফিরে দেখি, পথের ওপরে জেলি মাছের মতন কী একটা পড়ে রয়েছে। তার মাঝখানে একখানা থলথলে মুখ থরথর করে কাঁপছে। এবং তার চোখ দুটো ক্রোধে ও রুদ্ধ আক্রোশে আমার পানে তাকিয়ে যেন জ্বলে জ্বলে উঠছে! মুখখানা এক-এক বার ফুলছে, আবার হাওয়া বেরিয়ে গেলে ফুটবলের ব্লাডারের অবস্থা যেমন হয়, তেমনি চুপসে যাচ্ছে!
এখন ডোম্বলের হাসির ঘটা দেখে কে! হাসতে-হাসতে তার চোখ দিয়ে জল ঝরছে। অনেক চেষ্টার পর হাসি থামিয়ে সে বললে, অমল, তুমি একেবারে ও বেচারার মাঝখানে। গিয়ে ঝাঁপ খেয়েছ, আর ওর দম তাই ফুরিয়ে গেছে! ওহে নসু! ভায়া, এ লোকটি জেনেশুনে এ কাজ করেনি, তুমি ঠান্ডা হও! আর এও বলি, রাস্তার মাঝখানে শ্রীখোল থেকে বেরিয়ে আসা তোমার উচিত হয়নি!
নসু মুখ ভেংচে বললে, খুব তো মুখশাবাশি করছ, নিজে এ-দশায় পড়লে টের পেতে! আমার গা-টা নদী না পুকুর, যে ও লোকটা এসে অমন করে ঝপ খাবে! যাও, যাও আমার পিলে একেবারে চমকে গেছে! এমনি বকবক করতে করতে সে উঠে নিজের পিপের ভিতরে গিয়ে ঢুকল এবং তিনখানা ঠ্যাং ও খানকয়েক হাত বার করে বারকয়েক ছুড়লে এবং তারপর হঠাৎ সব গুটিয়ে নিয়ে গড়গড়িয়ে পথ দিয়ে ছুটে চলল!
ভোম্বল বললে, এই হচ্ছে আমাদের জাদুঘর। যাও, তুমি ভেতরে ঢুকে চারিদিক ভালো করে দেখে এসো গে যাও! মানকে! তুই এই ভদ্রলোককে সমস্ত দেখিয়ে আন! এই বলে সে একদিকে এগিয়ে চলল।
ভোম্বল আমাকে তুমি বলে ডাকছে, তা আমিও বললুম, ওহে ভোম্বল, তুমি কোথায় চললে?
হোটেলে, আর যৎকিঞ্চিৎ পেটে না দিলে চলে না! জাদুঘর দেখে-শুনে তুমি আবার আমার কাছে এসো। সে আর আমার দিকে ফিরেও তাকালে না–খাবারের গন্ধ বোধহয় তার নাকে ঢুকেছে।
আমারও পেটে এখন আগুন জ্বলছে। একবার ভাবলুম আমিও হোটেলে গিয়ে ঢুকি, কিন্তু এদেশে আমাদের টাকাপয়সা যদি না চলে, তবে খাবারের দাম দেব কেমন করে? এমনি সাত-পাঁচ ভেবে শ্রীমান মানকের সঙ্গে আমি যাদুঘরের ভিতরেই প্রবেশ করলুম।
জাদুঘরের ভিতরে ঢুকে আমি যে কত রকমের অজানা জিনিস দেখলুম তা আর গুনে ওঠা যায় না! এই অদ্ভুত জীবদের স্রষ্টার নিজের হাতে আঁকা অনেকগুলো ছবিতে বুঝিয়ে দেওয়া আছে, মানুষের দেহের উপাদান থেকে কেমন করে এদের দেহ গড়া হয়েছে, কেমন। করে তাদের মাংসের ভিতর থেকে হাড় বাদ দেওয়া হয়েছে, দ্রব্যগুণের মহিমায় এদের মগজের শক্তি কেমন করে বাড়িয়ে তোলা হয়েছে প্রভৃতি। সেসব এখানে অকারণে বর্ণনা করে লাভ নেই, কারণ আসল ছবিগুলো না দেখলে কেউ কিছু বুঝতে পারবেন না!
