ধু-ধু মাঠের মধ্যে আচম্বিতে ট্রেনের গতি হয়ে গেল স্তব্ধ।
মানিক বললে, ব্যাপার কী?
জয়ন্ত বললে, বিজনের নতুন কীর্তি। অ্যালার্মের শিকল টেনে গাড়ি থামিয়ে ওরা এইখান থেকেই লম্বা দিতে চায়। ওরা বুঝে নিয়েছে পরের স্টেশন ওদের পক্ষে নিরাপদ হবে না। সুন্দরবাবু সবাইকে নিয়ে টপ করে নেমে পড়ুন। ওই দেখুন অপরাধীরা ট্রেন থেকে নেমে পড়ে মাঠের ওপর দিয়ে উধ্বশ্বাসে ছুটছে। ওই সেই রোগা ঢ্যাঙা লোকটা, আর ওই লোকটা বোধহয় বিজন। ওরা দূরের ওই জঙ্গলটা লক্ষ করে ছুটছে। কিন্তু জঙ্গলে পৌঁছোবার আগেই ওদের গ্রেপ্তার করতে হবে, নইলে আবার ওরা পূর্বেকার মতো আমাদের কলা দেখাতে পারে।
এবারে গাড়ির সঙ্গে গাড়ির নয়, মানুষের সঙ্গে মানুষের দৌড় প্রতিযোগিতা।
হঠাৎ রোগা-ঢ্যাঙা লোকটা এবং বিজন দৌড় থামিয়ে ফিরে দাঁড়াল–তাদের দুজনেরই হাতে বন্দুক।
জয়ন্ত বললে, হুশিয়ার!
ওরা বন্দুক ছুড়ছে। মানিক অস্ফুট আর্তনাদ করে মাঠের ওপরে পড়ে গেল। তার ডান পায়ে লেগেছে বন্দুকের গুলি!
সুন্দরবাবু সক্রোধে বললেন, কী! আবার গুলি ছোঁড়া হচ্ছে। তবে দ্যাখ মজাটা। এই সেপাই, চালাও গুলি চালাও গুলি।
পুলিশের এক ডজন বন্দুক সগর্জনে অগ্নি ও ধূম উদগিরণ করতে লাগল বারংবার। মাঠের মধ্যে এই অকল্পিত খণ্ডযুদ্ধ দেখে চারিদিক থেকে ছুটে আসতে লাগল কাতারে কাতারে লোকজন।
জয়ন্ত বললে, বিজন, আত্মসমর্পণ করো।
একটা মরা গাছের কাটা গুঁড়ির আড়ালে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে বসে পড়ে বন্দুকে কার্তুজ ভরতে লাগল বিজন। সে কোনও জবাব দিলে না।
জয়ন্ত বলল, বিজন, শুনছ?
বিজন বললে, হ্যাঁ শুনেছি। তোমাদের কথার উত্তর হচ্ছে এই–সে বন্দুক তুলে জয়ন্তের দিকে লক্ষ্য স্থির করতে লাগল।
পাশেই ছিল একটা মস্ত উই ঢিপি। জয়ন্ত এক লাফে তার আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল।
হা-হা করে হেসে উঠে বিজন বললে, কী হে বীরপুরুষ, ভয় পেয়ে লুকোলি কেন?
জয়ন্ত শান্তস্বরেই বললে, বিজনবিহারী তুমিও তো লুকোতে কসুর করোনি। আর কেন যাদু, লীলাখেলা বন্ধ করো। এগিয়ে এসো, দুই হাতে লোহার বালা পরো। আমরা তোমাকে গুলি করে মারতে চাই না, ফাঁসিকাঠে দোল খাওয়াতে চাই।
বিজন বন্দুকের নল ফেরাল সুন্দরবাবুর দিকে।
সুন্দরবাবু বিনাবাক্যব্যয়ে করলেন প্রকাণ্ড একটি লম্ফত্যাগ। তিনি একেবারে সেপাইদের দলের ভিতর গিয়ে পড়লেন। তারপর দারুণ ক্রোধে চিৎকার করে বললেন, কী, আবার আমাকে বধ করবার চেষ্টা? মেরে ফ্যালো, মেরে ফ্যালো ছোটলোকটাকে, এখুনি গুলি করে মেরে ফ্যালো।
জয়ন্ত বললে, বিজন, বন্দুক ছাড়ো।
–প্রাণ থাকতে নয়।
–তাহলে প্রাণ তোমার যাবেই। দলে আমরা ভারী।
–হোক। যতক্ষণ বাঁচব, যুদ্ধ করব।
–তবে মরো।
সেপাইরা গুলিবৃষ্টি বন্ধ করেছিল। তারা আবার বন্দুক ছুঁড়তে লাগল এবং গর্জন করতে লাগল বিজনেরও বন্দুক।
কিন্তু যুদ্ধ বেশিক্ষণ চলল না। অধিকাংশ অপরাধীই একে-একে ভূতলশায়ী হল–কেউ নিহত, কেউ আহত।
সগর্বে মাথা তুলে এবং বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কেবল বিজনবিহারী। গুলিহীন বন্দুকটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হাতে নিলে সে রিভলভার। মুখে তার দৃঢ় প্রতিজ্ঞার ভাব।
জয়ন্ত বললে, আবার বলছি, এখনও আত্মসমর্পণ করো বিজন।
দুই চক্ষে অগ্নিবৃষ্টি করে কর্কশ-কোমল কণ্ঠে বিজন বললে, পুঁচকে গোয়েন্দা আমি আত্মসমর্পণ করব না, আমি করব জীবন সমর্পণ। চোখের পলক না পড়তেই রিভলভারের নলটা নিজের কপালের পাশে রেখে সে ঘোড়া টিপে দিলে। আগ্নেয়াস্ত্রের গর্জন–সঙ্গে সঙ্গে বিজনবিহারীর পতন।
জয়ন্ত বললে, ওকে বাধা দিতে পারলুম না। তুচ্ছ সম্পত্তির লোভে যে মাতুল হত্যা করে তার মরা উচিত ছিল ফাঁসিকাঠেই দোল খেয়ে। যাক মানিক, তোমার কি বেশি লেগেছে ভাই?
না জয়ন্ত। কিন্তু যা বলেছিলাম। আমার হল অপচয়ে ঠ্যাং।
সুন্দরবাবু সহানুভূতি প্রকাশ করবার জন্যে দুঃখিতভাবে বললেন, হুম!
হিমালয়ের ভয়ংকর (উপন্যাস)
এক । কার পা
কুমার সবে চায়ের পেয়ালায় প্রথম চুমুকটি দিয়েছে, এমন সময়ে বিমল হঠাৎ ঝড়ের মতন ঘরের ভিতর ঢুকে বলে উঠল, কুমার, কুমার। শিগগির, শিগগির করো! ওঠো, জামাকাপড় ছেড়ে পোঁটলা-পুঁটলি গুছিয়ে নাও!
কুমার হতভম্বের মতন চায়ের পেয়ালাটি টেবিলের উপরে রেখে বললে, ব্যাপার কী বিমল?
বেশি কথা বলবার সময় নেই! বিনয়বাবু তার মেয়ে মৃণুকে নিয়ে দার্জিলিংয়ে বেড়াতে গেছেন, জানো তো? হঠাৎ আজ সকালে তাঁর এক জরুরি টেলিগ্রাম পেয়েছি। তার মেয়েকে কে বা কারা চুরি করে নিয়ে গেছে। আর এর ভেতরে নাকি গভীর রহস্য আছে। অবিলম্বে আমাদের সাহায্যের দরকার।…একথা শুনে কি নিশ্চিন্তে থাকা যায়? দার্জিলিংয়ের ট্রেন ছাড়তে আর এক ঘণ্টা দেরি। আমি প্রস্তুত, আমার মোটঘাট নিয়ে রামহরিও প্রস্তুত হয়ে তোমার বাড়ির নীচে দাঁড়িয়ে আছে, এখন তুমিও প্রস্তুত হয়ে নাও। ওঠো, ওঠো, আর দেরি নয়!
কুমার একলাফে চেয়ার ত্যাগ করে বললে, আমাদের সঙ্গে বাঘাও যাবে তো?
তা আর বলতে! হয়তো তার সাহায্যেরও দরকার হবে!
জিনিসপত্তর গুছিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়তে কুমারের আধঘণ্টাও লাগল না! সবাই শিয়ালদহ স্টেশনের দিকে ছুটল!
দার্জিলিং! দূরে হিমালয়ের বিপুল দেহ বিরাট এক তুষার দানবের মতন আকাশে অনেকখানি আচ্ছন্ন করে আছে। কিন্তু তখন এসব লক্ষ করবার মতো মনের অবস্থা কারুরই ছিল না।
