একটা গোল টেবিলের ধারে বসে আছে বিমল ও কুমার। ঘরের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে রামহরি, এবং ঘরের ভিতরে গম্ভীর মুখে পায়চারি করছেন বিনয়বাবু।
যাঁরা যকের ধন প্রভৃতি উপন্যাস পড়েছেন, বিমল, কুমার ও রামহরিকে তারা নিশ্চয়ই চেনেন। আর যাঁরা মেঘদূতের মর্ত্যে আগমন ও মায়াকানন প্রভৃতি উপন্যাস পাঠ করেছেন, তাঁদের কাছে নানাশাস্ত্রে সুপণ্ডিত, সরলপ্রাণ বিপুলবক্ষ ও শক্তিমান এই বিনয়বাবুর নতুন পরিচয় বোধহয় আর দিতে হবে না।
বিমল জিজ্ঞাসা করলে, তারপর বিনয়বাবু?
বিনয়বাবু বললেন, মৃণু বেড়াতে গিয়েছিল বৈকালে। সন্ধে থেকে রাত প্রায় দশটা পর্যন্ত খোঁজাখুঁজির পরেও তাকে না পেয়ে মনে মনে ভাবলুম, হয়তো এতক্ষণ সে বাসায় ফিরে এসেছে। কিন্তু বাসায় ফিরে দেখি, মৃণু তখনও আসেনি। লোকজন নিয়ে আবার বেরিয়ে পড়লুম, সারারাত ধরে তাকে পথে-বিপথে সর্বত্র কোথাও খুঁজতে বাকি রাখলুম না, তারপর সকালবেলায় আধমরার মতন আবার শূন্য বাসায় ফিরে এলুম। বিমল! কুমার! তোমরা জানো তো, মৃণু আমার একমাত্র সন্তান। তার বয়স হল প্রায় ষোলো বৎসর, কিন্তু তাকে ছেড়ে থাকতে পারব না বলে এখনও তার বিয়ে দিইনি। তার মা বেঁচে নেই, আমিই তার সব। তাকে ছেড়ে আমিও একদণ্ড থাকতে পারি না। আমার এই আদরের মৃণুকে ডাকাতে ধরে নিয়ে গেছে, এখন আমি কেমন করে বেঁচে থাকব?বলতে বলতে বিনয়বাবুর দুই চোখ কান্নার জলে ভরে উঠল।
কুমার বললে, বিনয়বাবু, স্থির হোন। মৃণুকে যে ডাকাতে ধরে নিয়ে গেছে, আপনি এরকম সন্দেহ করছেন কেন?
বিনয়বাবু বললেন, সন্দেহের কারণ আছে কুমার! মৃণু হারিয়ে যাবার পর দুদিনে এখানকার আরও তিনজন লোক হারিয়ে গেছে।
বিমল বললে, তারাও কি স্ত্রীলোক?
না, পুরুষ। একজন হচ্ছে সাহেব, বাকি দুজন পাহাড়ি। তাদের অন্তর্ধানও অত্যন্ত রহস্যজনক। অনেক খোঁজ করেও পুলিশ কোনও সূত্রই আবিষ্কার করতে পারেনি। কিন্তু আমি একটা সূত্র আবিষ্কার করেছি।
বিমল ও কুমার একসঙ্গে বলে উঠল, কী আবিষ্কার করেছেন বিনয়বাবু?
শহরের বাইরে পাহাড়ের এক জঙ্গল ভরা গুঁড়ি-পথের সামনে মৃণুর একপাটি জুতো কুড়িয়ে পেয়েছি। সেখানে তন্নতন্ন করে খুঁজেও জুতোর অন্য পাটি আর পাইনি। এথেকে কি বুঝব? জুতোর অন্য পাটি মৃণুর পায়েই আছে। ইচ্ছে করে একপাটি জুতো খুলে আর এক পায়ে জুতো পরে কেউ এই পাহাড়ে-পথে হাঁটে না। মৃণুকে কেউ বা কারা নিশ্চয়ই তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে টেনে-হিঁচড়ে বা ধরাধরি করে বয়ে নিয়ে গিয়েছে, আর সেই সময়েই ধস্তাধস্তি করতে গিয়ে তার পা থেকে এক-পাটি জুতো খুলে পড়ে গিয়েছে।
বিমল বললে, বিনয়বাবু, যে-জায়গায় আপনি মৃণুর জুতো কুড়িয়ে পেয়েছেন, সে জায়গাটা আমাদের একবার দেখাতে পারেন?
কেন পারব না? কিন্তু সেখানে গিয়ে কোনওই লাভ নেই। বিশজন লোক নিয়ে সেখানকার প্রতি ইঞ্চি জায়গা আমি খুঁজে দেখেছি, আমার পর পুলিশও খুঁজতে বাকি রাখেনি। তবু–
বিমল বাধা দিয়ে বললে, তবু আমরা আর একবার সে জায়গাটা দেখব। চলুন বিনয়বাবু, এস কুমার!
বিমলের আগ্রহ দেখে বিনয়বাবু কিছুমাত্র উৎসাহিত হলেন না, কারণ তাঁর দৃঢ়বিশ্বাস ছিল, যেখানে যাওয়া হচ্ছে সেখানে গিয়ে আর খোঁজাখুঁজি করা পণ্ডশ্রম ছাড়া আর কিছুই নয়। তবু মুখে কিছু না বলে সকলকে নিয়ে তিনি বাইরে বেরিয়ে গেলেন। বাঘাও বাসায় একলাটি শিকলিতে বাঁধা থাকতে রাজি হল না, কাজেই কুমার তাকেও সঙ্গে নিয়ে গেল।
ঘণ্টা-দুয়েক পথ চলার পর সকলে যেখানে এসে হাজির হল, পাহাড়ের সে-জায়গাটা ভয়ানক নির্জন। একটা শুড়ি-পথ জঙ্গলের বুক ফুড়ে ভিতরে ঢুকে গেছে, তারই সুমুখে দাঁড়িয়ে বিনয়বাবু বললেন, এখানেই মৃণুর একপাটি জুতো পাওয়া যায়।
বিমল অনেকক্ষণ সেইখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জায়গাটা পরীক্ষা করলে, কিন্তু নতুন কিছুই আবিষ্কার করতে পারলে না।
কুমার বললে, যদি কেউ মৃণুকে ধরে নিয়ে গিয়ে থাকে, তবে ওই শুড়ি-পথের ভেতর দিয়েই হয়তো সে গেছে।
বিনয়বাবু বললেন, ও-পথের সমস্তই আমরা বার বার খুঁজে দেখেছি, কিন্তু কিছুই পাইনি।
এমন সময়ে জঙ্গলের ভিতরে খানিক তফাত থেকে বাঘার ঘন ঘন চিৎকার শোনা গেল।
কুমার তার বাঘার ভাষা বুঝত। সে ব্যস্ত হয়ে বললে, বাঘা নিশ্চয়ই সন্দেহজনক কিছু। দেখেছে! বাঘা! বাঘা!
তার ডাক শুনে বাঘা একটু পরেই জঙ্গলের ভিতর থেকে উত্তেজিত ভাবে ল্যাজ নাড়তে নাড়তে বেরিয়ে এল। তারপর কুমারের মুখের পানে চেয়ে ঘেউ ঘেউ করে একবার ডাকে, আবার জঙ্গলের ভিতরে ছুটে যায়, আবার বেরিয়ে আসে, ল্যাজ নেড়ে ডাকে, আর জঙ্গলের ভিতরে গিয়ে ঢোকে।
কুমার বললে, বিনয়বাবু, বুঝতে পারছেন কি, বাঘা আমাদের জঙ্গলের ভেতরে যেতে বলছে?
বিমল বললে, বাঘাকে আমিও জানি, ওকে কুকুর বলে অবহেলা করলে আমরাই হয়তো ঠকব! চলো, ওর সঙ্গে সঙ্গে যাওয়া যাক।
জঙ্গলের ঝোপঝাপ ঠেলে সকলেই বাঘার সঙ্গে সঙ্গে অগ্রসর হল। যেতে যেতে বিমল লক্ষ করলে, জঙ্গলের অনেক ঝোপঝাঁপ যেন কারা দু-হাতে উপড়ে ফেলেছে, যেন একদল মত্তহস্তী এই জঙ্গল ভেদ করে এগিয়ে গিয়েছে। বিমল শুধু লক্ষই করলে, কারুকে কিছু বললে না।
বাঘাকে অনুসরণ করে আরও কিছুদূর অগ্রসর হয়েই দেখা গেল, একটা ঝোপের পাশে মানুষের এক মৃতদেহ পড়ে রয়েছে।
