কী বলছ?
–ঠিকই বলছি। চুনোপুঁটিকে ছেড়ে দিলে যদি রুই-কাতলা ধরা পড়ে আপত্তি কী?
–তোমার কথার মানে বোঝা যাচ্ছে না।
–মানে খুব সহজ! হাজতে সে একলা আছে?
হ্যাঁ।
–আরও ভালো। প্রহরী যদি হাজতঘরের দরজা বন্ধ করতে ভুলে গিয়ে সরে দাঁড়ায় তাহলে নিশ্চয়ই সে চম্পট দেবে।
–দেবেই তো।
–সেও সন্দেহ করতে পারবে না যে তাকে আমরা ইচ্ছা করেই ছেড়ে দিচ্ছি।
তারপর?
তারপর তার পিছনে চর মোতায়েন রাখুন। সে কোথায় যায় দেখুন।
–তুমি কি ভাবছ, সে সোজা বিজনের কাছে গিয়েই হাজির হবে!
নিশ্চয়ই বিজনের কোনও গুপ্ত আস্তানা আছে। তার পক্ষে কলকাতা যখন বেশি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, তখন সেইখানেই গিয়ে সে গা-ঢাকা দেয়। বিজন এখন বেশ কিছুদিন বাইরে মুখ দেখাতে সাহস করবে বলে মনে হচ্ছে না। দলের লোকজন নিয়ে কোথাও গিয়ে লুকিয়ে থাকবে। আমাদের বন্দি নিশ্চয়ই তার গুপ্ত আস্তানার খবর রাখে। তার পক্ষে সেইখানে যাওয়াই স্বাভাবিক।
–হ্যাঁ জয়ন্ত, তোমার অনুমান সঙ্গত।
–তাহলে এই উপায় অবলম্বন করুন।
তথাস্তু।
.
কুড়ি । অপচয়ে ঠ্যাং
পরদিন প্রভাতেই জয়ন্তের ঘরের টেলিফোন যন্ত্র বেজে উঠল টুং টুং টুং।
রিসিভার ধরেই জয়ন্ত শুনলে সুন্দরবাবুর প্রফুল্ল কণ্ঠের সম্বোধন–ভো-ভো জয়ন্ত!
–গলা শুনেই বুঝেছি খবর শুভ।
–অত্যন্ত এবং আশাতীত। পরে পরে এই ব্যাপারগুলো ঘটেছে। বিজনের অনুচরের হাজত থেকে পলায়ন। আমাদের চরের তার পিছনে অনুসরণ। হাওড়ায় গিয়ে বিজনের অনুচরের ট্রেনে আরোহণ। পরে তার হরিহরপুরে অবতরণ। তারপর গ্রাম ছাড়িয়ে মাঠের মধ্যে একখানা বাড়িতে তার গমন।
–আপনার চর নিশ্চয়ই বিজনের দর্শন পায়নি?
–বিজনকে সে চেনে না। তবে শুনলুম, সে বাড়িতে লোক আছে আটদশ জন।
হরিহরপুর এখান থেকে কতদূর?
–পঁয়ত্রিশ মাইল।
–অতঃপর?
–তিনখানা সেপাই ভর্তি বড় জিপগাড়ি নিয়ে এক ঘণ্টার মধ্যে তোমার ওখানে যাচ্ছি। গাড়িতে তোমার আর মানিকের জন্যেও একটু জায়গা থাকবে। এর মধ্যে প্রস্তুত হতে পারবে তো?
–আমি কোনও সময়েই অপ্রস্তুত নই।
–সোনার ছেলে, লক্ষ্মী ছেলে।
.
হরিহরপুর ছোট গ্রাম। কিন্তু তার প্রান্তে আছে প্রকাণ্ড এক প্রান্তর এবং প্রান্তরের প্রান্ত। গিয়ে মিশেছে দিকচক্রবালরেখায়।
প্রান্তরের মাঝখানে চারিদিকে কলাইশুটি খেত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একখানা প্রাচীরে ঘেরা নিঃসঙ্গ বাড়ি। তার পিছন দিকে গুটি-আষ্টেক নারিকেল গাছ করেছে নিরালা একটি কুঞ্জ রচনা, তা ছাড়া আর কোনও গাছপালা নেই তার আশেপাশে।
তীক্ষ্ণ চক্ষে সমস্ত পর্যবেক্ষণ করে জয়ন্ত বলল, সুন্দরবাবু, বিজন আস্তানা নির্বাচন করেছে চমৎকার। পুলিশ যে-কোনও দিক দিয়েই অগ্রসর হোক, লুকিয়ে তাকে আক্রমণ করতে পারবে না। সে এখন মরিয়া হয়ে উঠছে নিশ্চয়ই, দিনের আলোয় আমরা যদি ওদিকে অগ্রসর হবার চেষ্টা করি, তাহলে শেষ পর্যন্ত ওরা ধরা পড়লেও আমাদের লোকক্ষয় অনিবার্য, কারণ ওরা বাধা দেবেই, আর ওদের সঙ্গেও আগ্নেয়াস্ত্র আছে, ওদের বাড়িটাও প্রায় কেল্লার মতো। রাত্রির অন্ধকারের জন্যে আমাদের অপেক্ষা করাই উচিত।
সন্ধ্যার ছায়ায় পৃথিবী হয়ে উঠল অস্পষ্ট। তারপর এল রাত্রি। চারিদিকে, চাঁদের আলোয় নীরব খেলা। ইতিমধ্যে একবার গলাসাধা হয়ে গেল শৃগাল-সভ্যদের।
উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম,–চারিদিক থেকে অগ্রসর হল সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী, নিঃশব্দে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে। বাড়ির প্রাচীরের কাছে এসেও পাওয়া গেল না কারুর সাড়াশব্দ। বাড়ির ফটকের কাছে গিয়ে দেখা গেল বাহির থেকে তালা বন্ধ।
কয়েকজন লোক প্রাচীর লঙঘন করে বাড়ির ভেতরে গিয়ে ঢুকল। অল্পক্ষণ পরে তারা ফিরে এসে বললে, বাড়ির ভিতরে কেউ নেই।
মানিক বললে, যা সন্দেহ করেছিলুম তাই। আমাদের মতো ওরাও নিয়েছে রাত্রির সুযোগ। সবাই লম্বা দিয়েছে। আমাদের হল লাভে ব্যাং, অপচয়ে ঠ্যাং।
জয়ন্ত হাতঘড়ির দিকে দৃষ্টিপাত করে বললে, এত সহজে হতাশ হোয়ো না মানিক। ওরা টের পেয়েছে আমাদের অস্তিত্ব। কিন্তু পালিয়ে ওরা যাবে কোথায়? বড়জোর স্টেশনের দিকে। তিন ঘণ্টার মধ্যে স্টেশনে একখানা মাত্র স্লো প্যাসেঞ্জার আসবে সন্ধ্যার পর, সাড়ে আটটার সময়ে। এখন ঘড়িতে আটটা বেজে পঁচিশ মিনিট হয়েছে। স্টেশনে মোটরে চড়ে পৌঁছোতে আমাদের সাত-আট মিনিটের বেশি দেরি লাগবে না। এসব লোকাল ট্রেন প্রায়ই দেরি করে স্টেশনে আসে। হয়তো এখনও আমরা গিয়ে ট্রেন ধরতে পারব।
বায়ুবেগে ছুটল তিনখানা জিপগাড়ি। কিন্তু তারা স্টেশনে গিয়ে পৌঁছেই দেখলে, একখানা ট্রেন ধূম উদগার করে দৌড় মারলে সশব্দে। তাদের দুর্ভাগ্যক্রমে ট্রেন এসেছিল আজ প্রায় যথাসময়েই।
জয়ন্ত বললে, সুন্দরবাবু, দৌড়ে স্টেশনে যান। পরের স্টেশনে খবর দিন, ট্রেন ওখানে গেলেই যেন আটকে রাখা হয়। ট্রেনের সঙ্গে সঙ্গেই ছুটবে আমাদের গাড়ি তিনখানা। খুব সম্ভব পরের স্টেশনে আগে গিয়ে পৌঁছোব আমরাই।
সুন্দরবাবু স্টেশনে ছুটলেন। এবং কাজ সেরে ফিরে এসে আবার গাড়িতে উঠলেন। আকাশের গায়ে চলন্ত ট্রেনের ধোঁয়ার রেখা লক্ষ করে পুলিশের গাড়িগুলো হল ঝড়ের বেগে ধাবমান। তারপর চলল ট্রেনের সঙ্গে মোটরের দৌড়-পাল্লা। খানিক পরে মোটরই এগিয়ে গেল ট্রেনকে পিছনে ফেলে।
