–বিজনবিহারী রায়।
জয়ন্ত ও মানিকের মধ্যে হল দৃষ্টি বিনিময়। জয়ন্ত বললে, বিজনবাবুর কণ্ঠস্বর কি অর্ধ-কোমল অর্ধ-কর্কশ?
আর একদিনও কার সম্বন্ধে আপনি এই প্রশ্ন করেছিলেন। হা, বিজনের গলার আওয়াজ ওইরকমই বটে। কিন্তু আপনি জানলেন কেমন করে?
–আমি শুনেছি।
–কোথায়?
–পরে বলব। বিজনবাবুর চেহারা কেমন?
–লোক বলে নাকি অনেকটা আমার মতনই দেখতে।
–তার ঠিকানা কী?
–তাও জানি না। সে আমার দিদির সঙ্গে থাকে না। তবে এত দোষের মধ্যেও তার একটি মস্ত গুণ আছে। সে অত্যন্ত মাতৃভক্ত। রোজ সকালে একবার করে আমার দিদির সঙ্গে দেখা করে যায়।
–আপনার দিদির ঠিকানা কী?
–পাঁচ নম্বর চন্দ্র বসু স্ট্রিট।
কাল সকালে সেখানে গেলে বিজনবাবুর সঙ্গে দেখা হবে তো?
–হওয়াই তো উচিত। কিন্তু তার সঙ্গে আপনার কী দরকার?
জয়ন্ত রহস্যময় হাসি হেসে বললে, তার সঙ্গে দেখা হবার পরে বলব। কিন্তু সাবধান নরেনবাবু, আমি যে কাল বিজনবাবুর সঙ্গে দেখা করতে যাব, এ কথা যেন ঘুণাক্ষরেও কারও কাছে প্রকাশ করবেন না।
.
উনিশ । টেলিফোনের কীর্তি
পাঁচ নম্বর চন্দ্র বসু স্ট্রিট। নরেনবাবুর দিদির বাড়ি।
তখনও ভালো করে ফরসা হয়নি কলকাতা। শেষরাতের আঁধারের সঙ্গে ঊষার আলোর যুঝাবুঝি চলছে তখনও। শহরের ঘুম ভেঙেছে বটে, কিন্তু তার মুখরতা এখনও স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি।
যথাসম্ভব আত্মগোপনের জন্যে একটা জায়গা বেছে নিয়ে জয়ন্ত বললে, মানিক, মাতৃভক্ত হত্যাকারীর জন্যে বোধকরি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে! তা হোক, একটু আগে আসাই ভালো।
পাঁচ নম্বর চন্দ্র বসু স্ট্রিট। তার দরজার এসে দাঁড়াল একখানা ট্যাক্সি। আরোহী নীচে নেমে ভাড়া দিলে। ট্যাক্সি চলে গেল।
জয়ন্ত বললে, ওই কি বিজনবিহারী? লোকটাকে দেখতে অনেকটা বরেনবাবুর মতোই বটে–এমনকী গায়ের রং পর্যন্ত। দেখলে, বাড়িতে ঢোকবার আগে বিজন চারিদিকে কীরকম সতর্ক দৃষ্টি বুলিয়ে গেল?
মানিক বললে, আমাদের দেখতে পায়নি তো?
আশা করি পায়নি।
আরও মিনিট পাঁচেক অপেক্ষা করে তারা দুজনে পায়ে-পায়ে এগিয়ে গেল বাড়ির দিকে। দরজার কড়া নাড়তেই একজন বেয়ারা বেরিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করলে, কাকে চাই?
–বিজনবাবুকে।
–তিনি তো এই সবে এলেন।
তাকে গিয়ে বলো দুজন ভদ্রলোক তার সঙ্গে দেখা করতে চান।
বেয়ারার প্রস্থান।
বেয়ারা ফিরে এসে বললে, আপনারা বাইরের ঘরে বসুন। বাবু এখনি আসছেন।
বেয়ারা বৈঠকখানার দরজা খুলে দিলে। ঘরের ভিতরে ঢুকল জয়ন্ত ও মানিক। পরমুহূর্তেই দরজা বন্ধ হওয়ার ও বাহির থেকে শিকল-তোলার শব্দ হল।
জয়ন্ত চেঁচিয়ে বললে, এই! দরজা খুলে দাও। কারুর সাড়া নেই।
মানিক বললে, যা ভেবেছি। বিজন হয় সন্দেহ করছে, নয় রাস্তায় আমাদের দেখে চিনে ফেলেছে। আমরা বন্দি।
জয়ন্ত বললে, ভারি বোকা বানালে তো! দেখছি ঘর থেকে বেরুবার আর কোনও পথ নেই। সে দরজা নিয়ে ধস্তাধস্তি করতে লাগল। লাথি ও ধাক্কা মারতে লাগল দরজার উপরে।
মানিক বললে, বৃথা চেষ্টা করছ কেন? তোমার গায়ে যত জোরই থাক, ঘরের ভিতর থেকে এই মজবুত দরজা কিছুতেই ভাঙতে পারবে না, অন্য উপায় দেখো।
কী উপায় আছে আর? ঘরটা যদি রাস্তার ধারেও হত চেঁচিয়ে পথের লোক ডাকতে পারতুম।
ঘরের বাইরে জাগ্রত হল হা-হা-হা-হা করে অট্টহাস্য। তারপরেই সেই পরিচিত অর্ধ কোমল ও অর্ধ-কর্কশ কণ্ঠস্বরে শোনা গেল, কী হে শার্লক হোমস আর ওয়াটসনের বাংলা সংস্করণ! গোয়েন্দাগিরি ভারি সোজা, নয়?
জয়ন্ত বললে, দরজা খুলে দাও বিজন। আমাদের বন্দি করে তুমি কিছুই সুবিধে করতে পারবে না। পুলিশ তোমার নাম জানতে পেরেছে।
পুলিশকে আমি থোড়াই কেয়ার করি। তোদের কী হাল হয় দ্যাখ–সেদিন বড় কঁকি দিয়েছিলি। এই সঙ্গে ভঁদো সুন্দর-গোয়েন্দাটাকে পেলেই সোনায় সোহাগা হত। যতসব নেড়াবুনে, সব-হল কীর্তনে। সবাই মহা ডিটেকটিভ!
মানিক চুপি চুপি বলল, জয়ন্ত মুক্তির উপায় আবিষ্কার করেছি।
জয়ন্ত সবিস্ময়ে বললে, কীরকম?
ওই দ্যাখ টেবিলের ওপরে টেলিফোন। এবার সত্য-সত্যই সুন্দরবাবু এসে আমাদের উদ্ধার করতে পারবেন।
জয়ন্ত এক লাফে টেবিলের সামনে গিয়ে পড়ল। টেলিফোনের রিসিভারটা তুলে নিয়ে সুন্দরবাবুর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করলে। বললে, সুন্দরবাবু আমরা আবার বিজনের হাতে বন্দি হয়েছি। সদলবলে শীঘ্র পাঁচ নম্বর চন্দ্র বসু স্ট্রিটে এসে আমাদের উদ্ধার আর বিজনের গ্রেপ্তার করুন।
বিজন বোধহয় কান পেতে ছিল। হতাশ কণ্ঠে বলে উঠল, হায়রে, আবার আমার ভুল হয়ে গেল! ঘরে যে টেলিফোন আছে, সেটা আমার মনে ছিল না।
এবারে ঘরের ভিতর থেকে একসঙ্গে অট্টহাস্য করে উঠল জয়ন্ত এবং মানিক। ঘরের বাইরে আর কেউ হাসবার চেষ্টা করলে না।
মিনিট দশেকের মধ্যে ঘটনাস্থলে সদলবলে সুন্দরবাবুর আবির্ভাব। জয়ন্ত মানিকের উদ্ধারলাভ। কিন্তু সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজেও বিজনের কোনও পাত্তা পাওয়া গেল না।
সুন্দরবাবু আপশোশ করে বললেন, কী ঘ্যাঁচড়া মাছ রে বাবা! যতবার জাল ফেলি ততবার ছিঁড়ে পালিয়ে যায়!
জয়ন্ত বললে, সুন্দরবাবু, আমার হাতের সব তাস এখনও ফুরোয়নি।
ফুরোয়নি নাকি?
–না। বরানগরের বাড়িতে বিজনের দলের যে লোকটা ধরা পড়েছিল, সে এখন কোথায়?
হাজতে।
–তাকে আজকেই ছেড়ে দিন।
