জয়ন্ত সাগ্রহে বললে, বলুন সব কথা খুলে বলুন।
–বেহালা বাগানবাড়িতে তুমি একজনের আধা-কোমল আধা কর্কশ গলার আওয়াজ শুনেছিলে না?
–হুঁ।
–বিজনবিহারীও ওই রকম অদ্ভুত কণ্ঠস্বরের অধিকারী।
–কেমন করে জানলেন?
–শোনো। হরিয়া মালির মুখে বিজনবিহারী রায়ের নাম শুনেই সজাগ হয়ে উঠেছে। আমার ঘুমন্ত স্মৃতি। তুমি বলেছিলে সেই আধা-কোমল আর আধা-কর্কশ কণ্ঠের অধিকারীর নাকি আমার ওপরে রাগ আছে। সেই যদি বিজন হয় তাহলে আমার ওপরে তার রাগ থাকবার কথা। কারণ বছর পাঁচেক আগে তাকে একটা খুনের মামলায় গ্রেপ্তার করেছিলুম। মামলা
অনেকদিন ধরে চলেছিল, তাকেও হাজতে আবদ্ধ থাকতে হয়। শেষটা যথেষ্ট প্রমাণ অভাবে সে খালাস পায় বটে, কিন্তু আসলে বিজনই যে হত্যাকারী, এ বিষয়ে কোনওই সন্দেহ নেই। জয়ন্ত, আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, এই বরেনবাবুর হত্যাকাণ্ডেও সেই বিজনের হাত আছে।
–কিন্তু বিজন এখন কোথায় জানেন না তো?
তার ঠিকানা জানি না বটে, তবে মাসখানেক আগেও সে কলকাতায় ছিল বলেই শুনেছি।
কার মুখে শুনেছেন?
–ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের এক ইন্সপেক্টরের মুখে। বিজনকে তিনি মোটরে চড়ে পথ। দিয়ে যেতে দেখেছিলেন।
জয়ন্ত খানিকক্ষণ নীরব থেকে বললে, সুন্দরবাবু, আপনি মূল্যবান সংবাদ এনেছেন। আর আমাদের অন্ধকারে হাতড়ে মরতে হবে না। বিজন যখন কলকাতাতেই আত্মগোপন করে আছে, তখন তাকে আবিষ্কার করতে আমাদের আর বিশেষ বেগ পেতে হবে না। তার পরেই বোঝা যাবে বর্তমান মামলার সঙ্গে তার সম্পর্ক আছে কতখানি!
.
আঠারো । ভাগনে
চা এবং খাবার এল–সঙ্গে সঙ্গে উৎফুল্ল হয়ে উঠল সুন্দরবাবু বদনমণ্ডল। তাঁর জীবনের সেই সময়টাই সবচেয়ে উপভোগ্য, যখন তাঁর ডানহাতখানি খাবারের থালার দিকে বার বার আনাগোনা করবার সুযোগ পায়।
খেতে-খেতে সুন্দরবাবু বললেন, দ্যাখো জয়ন্ত, বিজন কলকাতা ত্যাগ করেনি বলেই ভালো। কলকাতা হচ্ছে জনসমুদ্রের মতো, আর বিজন হচ্ছে তার মধ্যে এক ঘটি জলের মতো। ঘটির জল সমুদ্রে মিশে গেলে কেউ কি তাকে আবিষ্কার করতে পারে হে? বরং কলকাতায় বাইরে গেলেই সে সহজে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। এই দ্যাখো না, বিজন আর আমি দুজনেই কলকাতায় আছি, অথচ আজ পাঁচ বছরের মধ্যে তার চুলের টিকি পর্যন্ত আমার দৃষ্টিগোচর হয়নি।
জয়ন্ত বললে, খোঁজেননি, তাই তার দেখা পাননি। খুঁজলে ভগবানের দেখা পেতে দেরি লাগে বটে, কিন্তু শয়তান ধরা দেয় খুব সহজেই।
মানিক বললে, কিন্তু জয়ন্ত, বিজন যে বরেনবাবুর হত্যাকারী আর সেই যে নরেনবাবুকেও হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিল, এখন পর্যন্ত এমন কোনও প্রমাণই আমরা পাইনি। আমরা বড়জোর তার অদ্ভুত কণ্ঠস্বর শুনেছি, কিন্তু আদালতে সেটা ঠিক প্রমাণ বলে গ্রাহ্য হবে কি?
সুন্দরবাবু ঘাড় নাড়তে নাড়তে বললেন, হুম! মানিক প্রায়ই বুদ্ধিমানের মতো কথা বলে না, কিন্তু তার আজকের কথার দাম লাখ টাকা।
মানিক মুখ টিপে হেসে বললেন, আমি কেমন করে বুদ্ধিমানের মতো কথা বলব সুন্দরবাবু? ষোলো আনা বুদ্ধিই যে আপনার মগজের ভিতরে বন্দি হয়ে আছে। বলছেন, আমার কথার দাম লাখ টাকা। এমন করে আমায় আর লজ্জা দেবেন না দাদা। আপনার কাছে আমি? শাখামৃগের কাছে নেংটি ইঁদুর।
সুন্দরবাবু ভুরু কুঁচকে সন্দিগ্ধ স্বরে বললেন, শাখামৃগ মানে কী জয়ন্ত?
–শুনলে কি খুশি হবেন?
–কেন হব না?
মানেটা ভালো নয়।
–তবু আমি শুনব। শাখামৃগ মানে কী?
কপি।
কী কপি, ফুলকপি? ফুলকপিও নয়, বাঁধাকপিও নয়–শুধু কপি। অর্থাৎ বানর।
সুন্দরবাবু একটিমাত্র বাক্য উচ্চারণ না করে দাঁড়িয়ে উঠলেন। তারপর মানিকের ভাবহীন মুখের দিকে প্রজ্জ্বলিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে হন হন করে ঘরের ভিতর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
জয়ন্ত হাসতে হাসতে বললে, সুন্দরবাবুকে তাড়ালে মানিক?
উনি তাড়া খেয়ে চলেও যান, আবার তাড়াতাড়ি ফিরেও আসেন।
–যাক ওকথা। এখন বাড়ির ভিতর থেকে একবার বরেনবাবুকে ডেকে আনো দেখি। তার সঙ্গে দুটো কথা কইব।
মানিক চলে গেল এবং মিনিট-তিনেক পরে বরেনবাবুকে নিয়ে ফিরে এল।
নরেন বললে, আর অজ্ঞাতবাস ভালো লাগছে না জয়ন্তবাবু।
বসুন। আর আপনাকে অজ্ঞাতবাস করতেও হবে না। যে উদ্দেশ্যে আপনাকে লুকিয়ে রেখেছি, আমাদের সে উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়েছে।
–শুনে বাঁচলুম।
–আচ্ছা নরেনবাবু, আপনার দাদার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী কে?
–আমি।
নরেনবাবু উইল করে গেছেন?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
আপনার সন্তান আছে?
না।
স্ত্রী?
–বিবাহ করিনি, কখনও করবও না।
–আপনার মৃত্যুর পর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে কে?
–আমার ভাগনে।
–শুনেছি আপনার ভগ্নী বন্ধ্যা।
–সে আমার ছোট বোন! আমার বিধবা দিদির ছেলে আছে।
কয় ছেলে?
–একটি মাত্র।
বটে? তার বয়স কত?
–সে প্রায় আমারই সমবয়সি।
তিনি কী করেন?
–জানি না।
–সে কী?
–আশ্চর্য হচ্ছেন? আশ্চর্য হবার কথাই বটে। আসল কথা কী জানেন জয়ন্তবাবু? দিদির সঙ্গে আমাদের সদ্ভাব আছে বটে, কিন্তু আমার ভাগনের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক তুলে দিতে বাধ্য হয়েছি।
–কেন?
–সে মানুষ নয়, একেবারে লক্ষ্মীছাড়া। তার কথা স্মরণ করতেও লজ্জায় আমার মাথা কাটা যায়।
দুঃখের কথা!
–লোক ঠকানো তার ব্যবসা। একবার খুনের মামলাতেও পড়েছিল।
জয়ন্ত চমকে উঠলে। একটু চুপ করে জিজ্ঞাসা করলে, তার নাম কী?
