খানিকক্ষণ পরে সে মুখ তুলে বললে, মানিক পুলিশের সাড়া পেয়ে ওরা তাড়াতাড়িতে নরেনবাবুকেও নিয়ে পালাতে পারেনি। আমরা যে গুপ্তপথের সন্ধান পাব, সেটা ওরা আন্দাজ করতে পারবে না। নরেনবাবুর একটা ব্যবস্থা করবার জন্যে ওরা নিশ্চয়ই দু-এক দিনের মধ্যে লুকিয়ে আবার সুড়ঙ্গের ভিতরে প্রবেশ করবে।
–তোমার অনুমান অসঙ্গত নয়।
–সে সুযোগ আমরা ছাড়ব না। তারা আসবে রাতের অন্ধকারেই। আমরাও কাল থেকে এইখানে রাত জেগে গঙ্গার গান শুনব। এবারে সুড়ঙ্গে ঢুকলে আর তারা বেরুতে পারবে না। আপনার নরেনবাবুকে আমাদের বাড়িতে লুকিয়ে রাখব। তাঁকে যে আমরা উদ্ধার করেছি, সেটা ওদের জানতে দেওয়া হবে না।
–মন্দ ফন্দি নয়। এখন চলো, ঘুমে আমার চোখ জড়িয়ে আসছে।
.
সতেরো। বিজনবিহারী রায়
তারপর কেটে যায় এক, দুই, তিন দিন। জয়ন্ত সদলবলে রাত জাগে বাহনগরের গঙ্গার ধারে। কেবল তারা নয়, সে-মুল্লুকের মশাও সানন্দে ঐকতান বাজিয়ে রাত জাগে তাদের সঙ্গে । সুন্দরবাবুর অভিযোগের অন্ত নেই।
তিনদিন পরে জয়ন্তও হাল ছেড়ে দিল। সে বুঝল, নরেনবাবুর জন্যে অপরাধীরা আর সুড়ঙ্গের মধ্যে পদার্পণ করবে না।
সুন্দরবাবু বললেন, আমি তো গোড়া থেকেই বলে আসছি ওরা আমাদের চেয়ে চালাক। এত সহজে ফাঁদে পা দেবার বান্দা ওরা নয়।
জয়ন্ত বললে, আমার মত আলাদা। ওদের আসল উদ্দেশ্য এইবার বুঝতে পেরেছি।
-মানে?
–ওদের ইচ্ছা, নরেনবাবু অন্ধকূপে বন্দি হয়ে তিলে তিলে দিনে-দিনে মৃত্যুর কবলগত হোন। ওরা নরেনবাবুকে পথ থেকে সরাতে চেয়েছিল। ওরা ভাবছে ওদের সে উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়েছে, কাজেই অকারণে সুড়ঙ্গের ভিতরে এসে ওরা আর পুলিশের নজরে পড়তে রাজি নয়।
কিন্তু নরেনবাবুকে যমালয়ে পাঠাবার জন্যে ওদের এতটা আগ্রহ কেন?
–এখনও এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর খুঁজে পাইনি। তবে যে কারণে বরেনবাবু মারা পড়েছেন, সেই কারণেই ওরা নরেনবাবুকে বধ করতে চায়, সে বিষয়ে আর কোনওই সন্দেহ নেই।
–এ আবার তোমার কীরকম হেঁয়ালি! এদিকে বলছ তুমি সঠিক উত্তর জানো না, আবার বলছ ওরা একই কারণে বরেনবাবুকে বধ করবার পরে বরেনবাবুকেও বধ করতে চায়!
সুন্দরবাবু, আপাতত এর বেশি আর কিছু বলতে পারব না। তবে এই মামলাটা হাতে নিয়েই আমার মনে যে সন্দেহ জেগেছিল, অবশেষে সেই সন্দেহই বোধ করি সত্যে পরিণত হবে। আপনি আজ সন্ধ্যার সময়ে আমার বাড়িতে একবার আসবেন?
আসব। কিন্তু কেন বলো দেখি?
–আমাদের বরানগর অভিযান তো ব্যর্থ হল, আজ আর একটা নতুন সূত্রের সন্ধানে যাত্রা করব।
.
সেদিনের সন্ধ্যা।
জয়ন্ত বৈঠকখানায় বসে বাঁশি বাজাচ্ছে এবং মানিক ধরেছে তবলা।
সুন্দরবাবুর প্রবেশ। দুই বন্ধুর প্রতি বিরক্তিপূর্ণ দৃষ্টিপাত। একখানা চেয়ার টেনে নিয়ে উপবেশন। অধীরভাবে একবার হুম শব্দ উচ্চারণ। কিন্তু জয়ন্ত ও মানিক তার দিকে ফিরেও তাকালে না। সমান তালে বাজাতে লাগল বাঁশি আর তবলা।
সুন্দরবাবু আর পারলেন না, বললেন, কী হে জয়ন্ত বাঁশির প্যানপ্যানানি শোনবার জন্যেই কি আজ আমাকে এখানে আসতে বলেছ?
উত্তর নেই। বাঁশি আর তবলা বোবা হল না।
আরও মিনিট দুয়েক অপেক্ষা করে সুন্দরবাবু উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, এসেছিলুম একটা জরুরি খবর দিতে। তা তোমরা যখন শুনবে না আমি আর কী করব বলো? চললাম।
মানিকের তবলায় পড়ল তেহাই, জয়ন্তের বাঁশি হল স্তব্ধ।
জয়ন্ত বললে, আপনি জানেন তো সুন্দরবাবু, মাঝে মাঝে বাঁশি বাজাবার জন্যে আমার প্রাণ আনচান করে।
মানিক বললে, আর তবলা বাজাবার জন্যে আমার হাত নিশপিশ করে।
হুম! ও দুটো যন্ত্রই আমাকে দেয় যম-যন্ত্রণা।
জয়ন্ত বললে, তবে সেতার শুনবেন?
–মানিক বললে, কিংবা
বাধা দিয়ে সুন্দরবাবু বললেন, রক্ষা করো! আবার সেতারের প্রিং প্রিং! ওসব আমি বুঝিও না, ভালোও লাগে না।
মানিক বললে, তবে আপনার কী ভালো লাগে সুন্দরবাবু? আমাদের মধু যদি এখন চা আর ফাউলের স্যান্ডউইচ নিয়ে আসে?
সুন্দরবাবু একগাল হেসে বললেন, তাহলে মধুকে আমি একাধিক ধন্যবাদ দেব।
–বেশ সেই ব্যবস্থাই হবে।
তবে আমিও আবার বসলুম।
জয়ন্ত বললে, একটা নতুন সূত্রের সন্ধানে যাত্রা করেছিলাম। কিন্তু বিশেষ সুবিধা করে উঠতে পারিনি।
সুন্দরবাবু বললেন, আমারও বক্তব্য আছে। আগে তোমার কথাই শুনি।
–বেহালায় গিয়েছিলুম। আশেপাশের লোকের কাছে খবর নিয়ে জানলুম, দশ নম্বর রামবাবুর লেনের সেই বাগানবাড়ির মালিক হচ্ছেন বিজনবিহারী রায়। কিন্তু তিনি নাকি আর কলকাতায় বাস করেন না।
–বটে! তাহলে আমার খবর শুনবে? আমি তোমারও চেয়ে অগ্রসর হয়েছি।
সুসংবাদ!
–নিমতলার সেই আগুনে-পোড়া মৃতদেহটার ছবি কাগজে ছাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, পুরস্কার ঘোষণা করে। আজ একজন লোক তাকে শনাক্ত করে গিয়েছে।
–কে শনাক্ত করেছে?
–তার নাম হরিয়া। সে বেহালার ওই বাগানবাড়িতে আগে মালির কাজ করত। হরিয়া বলে, আগুনে পুড়ে যে লোকটা মরেছে সে হচ্ছে বাগানবাড়ির মালিক বিজনবিহারী রায়ের মোটর চালক।
–তাহলে আপনি বিজনবাবুরও ঠিকানা পেয়েছেন?
উঁহুঁ। হরিয়া বলে বিজনবাবু কলকাতায় বাসা তুলে দিয়ে কোথায় চলে গিয়েছে।
কিন্তু কে এই বিজনবিহারী রায়?
–তাও জেনেছি ভায়া, তাও জেনেছি। সেইজন্যেই তো বলছি আমি তোমারও চেয়ে বেশি অগ্রসর হয়েছি।
