জয়ন্ত অগ্রসর হল! এক হাতে টর্চ এবং আর এক হাতে রিভলভার নিয়ে সেই সঙ্কীর্ণ সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বললে, আমার বিশ্বাস শত্রুদের কেউ আর এ মুল্লুকে নেই। আপনারাও নির্ভয়ে আমার পিছনে আসুন।
মোট ত্রিশটা ধাপ। তারপর সিঁড়ির শেষ।
এদিকে-ওদিকে টর্চের আলো ফেলে জমাট অন্ধকার বিদীর্ণ করে জয়ন্ত বললে, বাড়িখানা আছে, আমাদের মাথার উপরে–এখন আমরা পাতালের গর্ভে। এখানটা দেখছি ছোটখাটো ঘরের মতো, আর
জয়ন্তের কথা ফুরুবার আগেই সেই অন্ধকূপের মধ্যে বিকট একটা ভৌতিক কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হয়ে উঠল—হুঁ-উ-উ-উ! হু-উ-উ-উ!
মস্ত একটা লম্ফ ত্যাগ করে আবার সিঁড়ির ওপরে গিয়ে পড়ে সুন্দরবাবু সভয়ে বলে উঠলেন, এ কী রে বাবা, এ কী আওয়াজ! পালিয়ে এসো জয়ন্ত পালিয়ে এসো মানিক।
.
ষোলো । পাতাল-পুরে
যেদিক থেকে শব্দটা আসছিল, সেই দিকে জয়ন্ত ফিরে দাঁড়াল চোখের পলক পড়বার আগেই।
টর্চের আলোতে দেখা গেল এক কোণে মেঝেয় ওপরে পড়ে রয়েছে একটা নিশ্চেষ্ট মনুষ্য-মুর্তি–তার মুখে বন্ধন, তার হাতে বন্ধন, তার পায়ে বন্ধন।
মানিক দুই পা এগিয়ে হেঁট হয়ে মূর্তিটাকে দেখে সবিস্ময়ে বলে উঠল, নরেনবাবু না?
নরেন নিঃসহায়ের মতো ঘাড় নেড়ে কেবল বলতে পারলে, হু-উ-উ-উ!
জয়ন্ত ও মানিক তৎক্ষণাৎ তার বন্ধন খুলে দিলে।
সিঁড়ির ওপর থেকে আবার নীচে নামতে নামতে সুন্দরবাবু হাঁফ ছেড়ে বললে, নরেনবাবু, এভাবে আমাদের ভয় দেখানো উচিত হয়নি। হু-উ-উ-উ-উ কী রে বাবা!
নরেন শ্রান্ত স্বরে বললে, কী করব বলুন, ও ছাড়া আর কোনও শব্দ উচ্চারণ করবার উপায় আমার ছিল না।
জয়ন্ত বললে, ব্যাপারটা সংক্ষেপে বর্ণনা করতে পারবেন?
–পারব। বাড়ির উপরকার ঘরে ওঠবার পর একজন খুব রোগা আর ঢ্যাঙা লোক আমার সঙ্গে অল্পক্ষণ বাজে কথা কইলে। তারপরেই অতর্কিতে পিছন থেকে আমাকে আক্রমণ করলে কয়েকজন লোক। কোনওক্রমে একবার তাদের হাত ছাড়িয়ে আমি উপর-উপরি দুইবার রিভলভার ছুড়লুম–একটা লোক জখম হয়ে মাটির ওপরে পড়ে গেল বটে, কিন্তু বাকি লোকগুলো আবার আমার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে বেঁধে ফেললে আমার হাত পা মুখ। তারপর তারা আমাকে নিয়ে কী করত জানি না, কিন্তু হঠাৎ বাইরে আপনাদের বাঁশি বেজে উঠল। রোগা আর ঢ্যাঙা লোকটা বললে, পালাও পালাও–পুলিশ এসেছে। তখন আমার আর সেই আহত লোকটার দেহ মাটির ওপর থেকে তুলে নিয়ে তারা দেওয়ালের একটা গুপ্তদ্বার খুলে সিঁড়ি দিয়ে এইখানে নেমে এল। আসবার সময়ে সেই রোগা ঢ্যাঙা লোকটা বোধহয় আপনাদের লক্ষ করে একবার বন্দুকও ছুঁড়েছিল।
জয়ন্ত শুধোলে, নরেনবাবু, সে লোকটার গলার আওয়াজ কেমন?
–স্বাভাবিক।
–আধা নরম আধা কর্কশ নয়?
না।
–মানিক, তাহলে বোধ হচ্ছে বেহালার বাগানবাড়িতে যে আমাদের সঙ্গে কর্তৃত্বের স্বরে কথা কয়েছিল, সে আর এই রোগা-ঢ্যাঙা লোকটা একই ব্যক্তি নয়। আচ্ছা নরেনবাবু, আপনাকে এখানে ফেলে রেখে লোকগুলি কোন দিকে গিয়েছে বলতে পারেন?
–হ্যাঁ। তারা ওই দরজাটা খুলে বেরিয়ে গেল। নরেন অঙ্গুলিনির্দেশ করল। দেওয়ালের গায়ে রয়েছে ছোট একটা দরজা, তার কপাট বন্ধ ছিল না।
জয়ন্ত দরজার ওপাশটা টর্চের সাহায্যে আলোকিত করে বললে, এ যে একটা সুড়ঙ্গ!
সুন্দরবাবু চমৎকৃত হয়ে বললেন, বাব্বাঃ, এরা দেখছি জাত শয়তান! আয়োজনের কিছুই বাকি রাখেনি। কেবল স্থলপথে জলপথেই ওদের চলাচল নয় হে জয়ন্ত, ওরা হয়তো এরোপ্লেনে উঠেও আমাদের ফাঁকি দিতে পারে।
জয়ন্ত ভাবতে-ভাবতে বললে, আমার মনে হয়, এদের একজন বিচক্ষণ দলপতি আছে। সাধারণত সে নিজে থাকে আড়ালে আড়ালে নিরাপদ ব্যবধানে, আর তার হুকুম তামিল করে দলের অন্য সবাই। ওই রোগা আর ঢ্যাঙা লোকটা হয় তার ডান হাতের মতো।
সুন্দরবাবু বললেন, আমার মনে হয়, এই অদৃশ্য দলপতি কোনওদিনই দৃশ্যমান হবে না। ধরা পড়বে বড় জোর তার চেলা-চামুন্ডারা।
দলপতিকে চোখে না দেখলেও খুব সম্ভব আমরা তারই অর্ধ-কোমল আর অর্ধ-কর্কশ কণ্ঠস্বর শুনেছি–সে স্বর আমি কোনওদিনই ভুলব না, কারণ সযত্নে তার রেকর্ড রেখেছি আমার স্মৃতির গ্রামোফোনে। তার স্বর আবার শুনলেই তাকে চিনতে পারব। আর এটাও জেনেছি, আপনার ওপরে তার প্রচণ্ড ক্রোধ। নিশ্চয় সে পুরাতন পাপী, কখনও না কখনও আপনার পাল্লায় গিয়ে পড়েছিল, আর বোধহয় আপনি তাকে জামাই-আদর করেননি।
সুন্দরবাবু বললেন, তোমার ওই অর্ধ-কোমল-অর্ধ-কর্কশ কণ্ঠের অধিকারীকে আমি তো স্মৃতি-সাগর মন্থন করেও আবিষ্কার করতে পারলুম না।
–আপাতত থাক ও-কথা। নরেনবাবু, আপনি দুইজন পাহারাওয়ালার সঙ্গে আবার ওপরে গিয়ে একটু বিশ্রাম গ্রহণ করুন। ততক্ষণে আমরা সুড়ঙ্গটার ভিতরে দৃষ্টি সঞ্চালন করে আসি।
সুড়ঙ্গটাও সংকীর্ণ, তার ভিতরে পাশাপাশি চলতে পারে না দুজন মানুষ। বেশ খানিকটা এগিয়ে যেখানে সুড়ঙ্গটা শেষ হয়েছে, সেখানেও রয়েছে আর একটা ছোট দরজা; টানতেই খুলে গেল তার কবাট।
বাহির থেকে দরজার ওপরে ঝুলছে এত লতাপাতা যে সহজে তার অস্তিত্ব আবিষ্কার করা যায় না। তারপর প্রায় কাঠা-চারেক জমি জুড়ে বিরাজ করছে কাঁটা-ঝোপের পর কাঁটাঝোপ আর আগাছার নিবিড় জঙ্গল।
জয়ন্ত স্তব্ধ মুখে সেই দিকে তাকিয়ে রইল যেখানে আঘাটাতেও গঙ্গার জলবাহু ছড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে চাঁদের আলোর হিরের টুকরো।
