মানিক, মেঝের রক্তের ওপরে কতকগুলো পদচিহ্ন রয়েছে দ্যাখো। আমি পরীক্ষা করে ছয়জন লোকের পদচিহ্ন পেয়েছি। একজনের পা খুব বড়, বোধহয় মাথাতেও সে খুব ঢ্যাঙা।
কী আশ্চর্য! বাড়ির কোনও দরজা দিয়েই কোনও লোক বাইরে বেরুতে পারেনি, কিন্তু এতগুলো মানুষ কি শূন্যপথে পাখির মতো উড়ে পালিয়েছে?
–মানিক, এ ঘরের দরজা দিয়েও কেউ বাইরে যায়নি।
–কেমন করে জানলে?
–তাহলে রক্তাক্ত দেহটা থেকে নির্গত রক্তের ধারা ঘরের বাইরেও দেখতে পাওয়া যেত। কিন্তু বাইরে কোথাও এক ফোঁটাও রক্তের দাগ নেই।
সুন্দরবাবু মহা বিস্ময়ে দুই ভুরু কপালে তুলে বললে, তাও তো বটে, তাও তো বটে! ঘরের ভিতরে অনেকগুলো লোক ছিল, কিন্তু তারা ঘরের ভিতরেও নেই আর ঘরের বাইরেও যায়নি! অবাক করলে বাবা!
মানিক বললে, প্রায় আসবাবহীন ঘর। চারিদিকে ইটের দেওয়াল। একটা টিকটিকিও এখানে লুকিয়ে থাকতে পারে না। এ কী সমস্যা?
জয়ন্ত মুখ টিপে হাসতে হাসতে বললে, এই সমস্যার সমাধান না করে আমি এখান থেকে নড়ব না।
.
পনেরো । ভৌতিক রহস্য
সুন্দরবাবু ঘুরে-ঘুরে ঘরের চারিদিক দেখে নিলেন সন্দিগ্ধ চোখে। তারপর হেলমেটটা আবার মাথায় পরে ফেললেন।
মানিক বললে, ও কী মশাই, ওটা আবার মস্তকে ধারণ করলেন কেন? এখানে আমরা ছাড়া আর কেউ তো নেই।
–এখন নেই, কিন্তু এখনি তারা দেখা দিতেও পারে। যে সব শত্রু ঘরের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায় না, অথচ ঘরের ভিতরেও থাকে না, তাদের বিশ্বাস নেই। তারা মায়াধর, তারা সব করতে পারে।
মানিক নিজের রিভলভারের পিছন দিকটা দিয়ে ঘরের চারিদিকের দেওয়াল ঠুকে ঠুকে পরীক্ষা করতে লাগল।
সুন্দরবাবু শুধোলেন, কী দেখছ মানিক?
–দেখছি দেওয়ালের কোনও জায়গা ফাঁপা কি না! কিন্তু না, এ নিরেট দেওয়াল, এর কোথাও গুপ্তঘার নেই।
জয়ন্ত বললে, কিন্তু বলতে বলতে থেমে পড়ে সে পশ্চিম দিকের একটা জানলার কাছে ছুটে গেল।
মানিক বললে, কী হল জয়ন্ত?
–এ দিকের জানলা দিয়ে গঙ্গা দেখা যায়।
–সেটা আমরা এখান থেকেই দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু কথা কইতে কইতে তুমি হঠাৎ ছুটে গেলে কেন?
–একটা শব্দ শুনছ না?
কান পেতে মানিক বললে, শুনছি। একখানা মোটরবোটের শব্দ।
–হ্যাঁ। গঙ্গার ওপর দিয়ে একখানা মোটরবোট যাচ্ছে।
–মোটর-বোটের শব্দটা আগে ছিল না, এই মাত্র জাগল। নিশ্চয় বোটখানা ছাড়া হয়েছে। কাছাকাছি কোনও জায়গা থেকে। এতরাত্রে বোটে চড়ে গঙ্গার হাওয়া খাবার শখ হল কোন মহাপুরুষদের, সেই কথাই ভাবছি।
সন্দেহজনক বটে!
সুন্দরবাবু বললেন, জনকয় সেপাইকে গঙ্গার ধারে পাঠাব নাকি?
–এখন আর পাঠিয়ে লাভ হবে না। এতক্ষণে বোটখানা অনেক দূরে চলে গিয়েছে, আর তার নাগাল পাওয়া অসম্ভব!
তুমি কি বলতে চাও যে–
বাধা দিয়ে জয়ন্ত বললে, আমি কিছুই বলতে চাই না। আমি খালি আপনাকে একটা ব্যাপার দেখাতে চাই।
কী?
একটা লণ্ঠন উঁচু করে তুলে ধরে জয়ন্ত বললে, যে দেওয়ালে জানলাটা গাঁথা আছে তার দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখুন।
সুন্দরবাবু বিপুল বিস্ময়ে বললেন, ওরে বাবা, এত মোটা দেওয়াল তো আমি জীবনে কখনও দেখিনি!
–ঘরের অন্য তিনদিকের দেওয়াল দেখুন। কোনও দেওয়ালই তো চওড়া নয়!
–তাই তো হে। এর মানে কী?
–সেইটেই বিবেচ্য।
–হুম, এ যেন চিনের প্রাচীরের নমুনা।
–এইবার মেঝের রক্তের দিকে তাকান। কী দেখছেন?
–একটু অত্যুক্তি করলে বলা যায়, মেঝের ওপর দিয়ে বইছে রক্তের ঢেউ।
আর কিছু দেখছেন না?
রক্তের মাঝে-মাঝে অনেকগুলো মানুষের পায়ের দাগ।
আর কিছু।
–উঁহু!
–মানিক, তুমি কী বলে?
–পশ্চিম দিকে রয়েছে একটা দেওয়াল-আলমারি। একটা লম্বা রক্তের রেখা ওই আলমারির তলায় গিয়ে শেষ হয়েছে। যেন কোনও আহত রক্তাক্ত লোক ওই আলমারির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল।
–সে আহত না হয়ে, মৃত হতেও পারে। হয়তো কারা তার রক্তাক্ত মৃতদেহ ওই পর্যন্ত বহন করে নিয়ে গিয়েছিল।
–কিন্তু কেন? দেহটাকে আলমারির ভিতরে রেখে দেবে বলে?
হতেও পারে, না হতেও পারে। আলমারিটা খুলেই দ্যাখো না!
–কিন্তু আলমারিটা তো বাহির থেকে তালাবন্ধ।
–ভারী তো পুঁচকে তালা। ভেঙে ফ্যালো।
–তালা ভাঙতে দেরি লাগল না। একটা বীভৎস দৃশ্য দেখবার জন্যে প্রস্তুত হলেন সুন্দরবাবু।
কিন্তু আলমারির দরজা খুলে পাওয়া গেল কেবল চারটে তাক। সেগুলোর ওপরে রয়েছে কয়েকটা আজে-বাজে জিনিস।
জয়ন্ত বললে, আর-একটা জিনিস লক্ষ করুন সুন্দরবাবু।
–ভায়া, বার বার লক্ষ করতে করতে আমি ক্রমেই লক্ষ্যহারা হয়ে পড়ছি যে।
–আলমারির ফ্রেমের ওপরে রয়েছে একটা পিতলের মোটা হাতল।
–তাতে কী হয়েছে?
–ওরকম জায়গায় অমনধারা হাতল থাকার কোনও মানে হয় না।
–হুম!
–হাতলটা ধরে জোরসে মারুন টান!
–মারলুম টান–হেঁইয়ো। আরে, এ কী!
হড় হড় করে গোটা আলমারিটাই দরজার পাল্লার মতো দেওয়ালের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল বাইরের দিকে। জয়ন্ত ছাড়া আর আর সকলেরই দৃষ্টি বিস্মিত এবং চমকিত। জয়ন্ত সহজ কণ্ঠেই বললে, এ-মানিক, আলমারির ওপাশে কী আছে, এইবারে সেটা দেখা যাক।
আলমারির ওপাশে আছে দুটো দেওয়ালের মাঝখানে হাত-দেড়েক চওড়া আর অল্প একটু ফাঁকা জায়গা–সেখানে পাশাপাশি দুজন মানুষ দাঁড়াতে পারে না। নীচে গাঢ় অন্ধকারের ভিতরে নেমে গিয়েছে একসার ছোট ছোট সিঁড়ি।
