লণ্ঠন হাতে করে একটা লোক আসছে। গাড়ির কাছে এসে দাঁড়িয়ে সে চালককে ডেকে বললে, তোমার মিটারে কত ভাড়া উঠেছে?
–কেন?
নরেনবাবুর ফিরতে দেরি হবে। হয়তো আজ রাত্রে তিনি ফিরতে নাও পারেন। ভাড়া নিয়ে তিনি তোমাকে চলে যেতে বললেন।
–বেশ, ভাড়া দিন পাঁচ টাকা।
লোকটা লণ্ঠন তুলে হুমড়ি খেয়ে মিটারে কত ভাড়া উঠেছে দেখবার চেষ্টা করলে। কিন্তু পরমুহূর্তে চালকের প্রচণ্ড একটা ঘুসি গিয়ে পড়ল ঠিক তার চিবুকের উপরে। সঙ্গে সঙ্গে টু-শব্দ পর্যন্ত করবার সময় না পেয়ে লোকটা হল ধরাশায়ী। একেবারে অজ্ঞান!
চালক মৃদুকণ্ঠে ডাকল, মানিক!
পাশের ঝোপ থেকে সাড়া এল, উ!
–বেরিয়ে এসো। সুন্দরবাবু!
হুম!
–আপনিও বেরিয়ে আসুন।
–এই যে ভায়া!
–আগে ওই লোকটার হাত-পা-মুখ বেঁধে ফেলুন। ওর এখনও জ্ঞান হয়নি।
লোকটাকে বন্দি করতে বেশিক্ষণ লাগল না।
চালক-বেশী জয়ন্ত বললে, এখানকার সব প্রস্তুত?
–হ্যাঁ।
আচম্বিতে বাড়ির ভিতরে জেগে উঠল প্রচণ্ড হট্টগোল। একাধিক ব্যক্তির ক্রুদ্ধ চিৎকার। তারপরই উপর-উপরি দুইবার রিভলভারের গর্জন! আর্তনাদ! পরমুহূর্তে দোতলার ঘরের আলোটা গেল নিভে।
জয়ন্ত বললে, আর দেরি নয় সুন্দরবাবু। ডাকুন আপনার লোকজনদের।
পকেট থেকে বাঁশি বার করে সুন্দরবাবু খুব জোরে দিলেন তিনবার ফুঁ।
জয়ন্ত দ্রুতপদে বাড়ির দিকে ছুটে গেল–পিছনে-পিছনে মানিক।
.
চোদ্দো । অদ্ভুত রহস্য
দুজনেই দৌড়ে বাড়ির সদর-দরজার কাছে হাজির হল। দুজনেরই হাতে প্রস্তুত হয়ে আছে। রিভলভার।
জয়ন্ত বললে, মানিক, আমি এখানেই থাকি। চরের মুখে শুনেছি, বাড়ির পিছন দিকেও একটা খিড়কির দরজা আছে। তুমি সেইখানে গিয়ে পাহারা দাও।
তারপর?
–যদি কেউ বাড়ির বাইরে যাবার চেষ্টা করে গুলি করবে–অর্থাৎ প্রাণে মারবে না, কেবল রিভলভার ছুঁড়ে ভয় দেখাবে।
–বেশ।
সুন্দরবাবু এখুনি লোকজন নিয়ে এসে বাড়ি ঘেরাও করে ফেলবেন। আমাদের বেশিক্ষণ পাহারা দিতে হবে না।
মানিক ছুটে চলে গেল।
হঠাৎ গুডুম শব্দে একটা বন্দুক গর্জন করে উঠল। গাছে গাছে কাক ও অন্যান্য পাখিদের ভীত চিৎকার।
জয়ন্ত আপন মনেই বললে, বন্দুক ছুড়লে কে? শব্দটা এল যেন বাড়ির ওপর থেকে! মানিকের কোনও বিপদ হল না তো?
ধুপ ধুপ করে ভারী ভারী পা ফেলে সুন্দরবাবু উধ্বশ্বাসে দৌড়ে এসে কেবল তিনবার বললেন, হুম, হুম, হুম!
–ব্যাপার কী?
কী কাণ্ড, বাপ!
কাণ্ড আবার কী?
–মাথার ছ্যাঁদার ভিতর দিয়ে এক্ষুনি প্রাণপক্ষী বহির্গত হয়ে যেত।
বুঝিয়ে বলুন।
–কোথা থেকে কোন ব্যাটা ত্যাঁদোড় আমার মাথা টিপ করে বন্দুক ছুঁড়েছিল।
–গুলি লাগেনি তো?
লাগেনি মানে। নিশ্চয় লেগেছে, আলবত লেগেছে।
জয়ন্ত সবিস্ময়ে বললে, তবু আপনি মাটির ওপরে লম্বমান হননি।
–কেন লম্বমান হইনি দেখতে পাচ্ছে না। ইতিমধ্যে মাথায় আমি স্টিল হেলমেট পরে নিয়েছি যে। উঃ নইলে কী সর্বনাশই যে হত!
–ও আলোচনা এখন থাক। আপাতত যে বন্দুক ছুঁড়েছে তাকে ধরতে হবে তো।
নিশ্চয়ই।
এমন সময় মানিক এসে বললে, আমার আর খিড়কিতে থাকবার দরকার নেই জয়ন্ত। দ্বাররক্ষা করবার জন্যে পাহারাওয়ালারা এসে পড়েছে।
–খিড়কি দিয়ে কেউ বেরুবার চেষ্টা করেনি?
জনপ্রাণী না।
সুন্দরবাবু পরম আহ্লাদে বললেন, ব্যাটারা তাহলে বাড়ির ভিতরে আছে, এবারে আর আমাদের কলা দেখাতে পারবে না। চলো জয়ন্ত, আমার আর তর সইছে না।
আপনার মাথায় হেলমেট আছে, আপনিই পথ দেখান। কেউ যদি গুলি ছোড়ে, হেলমেট দিয়ে ঠেকাবেন।
কিন্তু কেউ আর বন্দুক ছুড়ল না, বাড়ির ভিতরটা মৃত্যুর মতো স্তব্ধ। একতলার সব ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজেও একটা মিশকালো বিড়াল ছাড়া আর কারুর দেখা পাওয়া গেল না।
জয়ন্ত বললে, এইবার দোতলা। বন্দুকের শব্দটা এসেছিল দোতলা থেকেই।
সুন্দরবাবু হলেন পশ্চাদপদ। পাহারাওয়ালাদের ডেকে বললেন, তোমরা আগে আগে যাও। যাকে দেখবে তাকে গ্রেপ্তার করবে। ভয় নেই, আমি তোমাদের পিছনেই আছি।
দোতলায় চারখানা ঘর। সব ঘরই খাঁ-খাঁ করছে। কিন্তু একখানা ঘরের রক্তপ্লাবিত মেঝের ওপর পড়ে রয়েছে একটা রিভলভার।
জয়ন্ত বললে, সুন্দরবাবু আপনারা বাড়ির ছাদটা একবার খুঁজে আসুন। আমি এই ঘরেই আছি।
ছাদও শূন্য। হতভম্ব সুন্দরবাবু হেলমেট খুলে টাক চুলকোতে চুলকোতে নেমে এসে দেখলেন, জয়ন্ত গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে, তার হাতে একটা রিভলভার।
সুন্দরবাবু বললেন, ব্যাটারা মায়াবী। হাওয়া হয়ে হাওয়ার সঙ্গে মিলিয়ে গিয়েছে।
জয়ন্ত বললে, এই রিভলভারটাই আমি নরেনবাবুকে দিয়েছিলুম। কিন্তু অস্ত্রটা এখানে ফেলে নরেনবাবু গেলেন কোথায়?
–হুম, সেই বন্দুকধারীই বা কোথায়?
মানিক বললে, ঘরের মেঝেয় এত রক্ত কার? নরেনবাবু নয় তো?
জয়ন্ত বললে, সম্ভবত নয়। আমরা রিভলভার ছোড়বার শব্দ শুনেছি দুই বার। এই রিভলভারেও ছয়টা ঘরের ভিতরে দুটো ঘরে গুলি নেই। আমার বিশ্বাস আত্মরক্ষার জন্যে নরেনবাবুই গুলি ছুঁড়ে শত্রুদের কাউকে হত বা আহত করেছেন।
মানিক বললে, কিন্তু নরেনবাবুই বা কোথায়, আর তার হত কি আহত শত্রুর দেহটাই বা কোথায়? এই বাড়ির ভিতর থেকে সুন্দরবাবুর টাক ফাটাবার জন্যে যে লোকটা বন্দুক ছুঁড়েছিল, সেও তো তার বন্দুক নিয়ে অদৃশ্য হয়েছে!
