কী কথা বলুন।
–আজ এই বাড়িতে একটি লোক এসেছিল, তারই পরিচয় জানতে চাই।
–আমি কলকাতায় এসেছি শুনে, আজ সকাল থেকেই তো এখানে অনেক লোক আনাগোনা করছেন। আপনি কার কথা জানতে চান?
–প্রায় ঘণ্টাখানেক আগে এখানে একটি লোক এসেছিল।
ঘণ্টাখানেক আগে জন-তিনেক লোক আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল।
–আমি যার কথা বলছি সে একখানা ট্যাক্সিতে চড়ে এসেছিল। সে খুব কালো, খুব রোগা আর ঢ্যাঙা। তার চোখে কালো চশমা।
–ও, বুঝেছি। কিন্তু তাকে আমি চিনি না।
–চেনেন না?
না। সে কেবল একখানা চিঠি দিতে এসেছিল।
–চিঠি? কার চিঠি?
–তাও বলতে পারব না।
–কেন?
–পত্ৰলেখক পত্রে নিজের নাম-সই করেনি। কিন্তু পত্ৰখানা রহস্যময়।
চিঠিখানা একবার দেখতে পারি।
নরেন ইতস্তত করে বললে, পত্রলেখক চিঠির কথা কারুর কাছে প্রকাশ করতে বারণ করেছে!
এইবার সুন্দরবাবু কথোপকথনে অংশ গ্রহণ করলেন। বললেন, মশাই আপনার দাদার হত্যাকারীকে আপনি শাস্তি দিতে চান?
–নিশ্চয়!
বরেনবাবুর হত্যাকারীকে আবিষ্কার না করে ছাড়ব না। এই চিঠিখানার ভিতরে হয়তো কোনও সূত্র থাকতে পারে। সুতরাং
–বেশ, চিঠিখানা দেখুন তাহলে। কিন্তু এর ভিতরে হত্যাকারীর নাম ধাম কিছুই নেই। নরেন পকেট থেকে একখানা কাগজ বার করে সমর্পণ করলে জয়ন্তের হাতে।
চিঠিখানা খুলে দুই-তিন পংক্তি পাঠ করেই জয়ন্তের দৃষ্টি হয়ে উঠল সচকিত। নিজের পকেটের ভিতরে হাত চালিয়ে সেই কাগজখানা সে বার করলে, বরেনবাবুর বাড়িতে অগ্নিকাণ্ডের সময়ে যেখানা পাওয়া গিয়েছিল চশমার খাপের মধ্যে। দুখানা কাগজের হাতের লেখা মিলিয়ে দেখে জয়ন্ত মৃদু হাস্য করলে, যেন আপন মনেই। তারপরে সে উচ্চৈঃস্বরে পত্র খানা পাঠ করলেঃ
নরেনবাবু, আপনার দাদার হত্যাকারীর নাম শুনতে চান? তাহলে আজ রাত্রি সাড়ে নয়টা থেকে সাড়ে দশটার মধ্যে বরাহনগরের ২০ নম্বর রতন রায় রোডে আমার বাড়িতে এসে আমার সঙ্গে দেখা করবেন। একাই আসবেন। আমি আপনার সঙ্গে দেখা করতে পারতুম, কিন্তু বাড়ি ছেড়ে বেরুলেই আমার বিপদের সম্ভাবনা, কারণ হত্যাকারী আমারও গতিবিধির ওপরে লক্ষ রেখেছে। সাবধান, পত্রের মর্ম কারুর কাছে প্রকাশ করবেন না। ইতি।
চিঠিখানা নরেনবাবুর হাতে ফিরিয়ে দিয়ে জয়ন্ত বললে, তা হলে রাত্রে আপনি পত্রলেখকের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন?
–তাই তো স্থির করেছি।
–বেশ করেছেন। আপনার যাওয়াই উচিত। আমার আর কিছু জিজ্ঞাস্য নেই। এসো মানিক, আসুন সুন্দরবাবু। পথে এসে গাড়িতে উঠে মোটর চালিয়ে দিয়ে জয়ন্ত বললে, সুন্দরবাবু রহস্য ক্রমেই ঘনীভূত হয়ে উঠছে।
কীরকম?
–আজকের চিঠি আর সেই চশমার খাপের চিঠি একই লোকের লেখা। তার ওপরে পত্রবাহকও খুনিদের দলের লোক।
–আচ্ছা, নরেনবাবুকে তারা কোন উদ্দেশ্যে ডেকে নিয়ে যাচ্ছে?
–উদ্দেশ্য হয়তো ভালো নয়। কিন্তু আমরা ঘটনাস্থলের আশেপাশে লুকিয়ে থাকব। আপনি একদল সশস্ত্র পাহারাওয়ালা নিয়ে আসবেন। তারপর যা করেন মা কালী!
.
তেরো। রাত সাড়ে নয়টা
বরাহনগর। কুড়ি নম্বর রতন রায় রোড। একখানা পুরোনো দোতলা বাড়ি, তার চারিদিক ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে বড় বড় গাছ। জমির ওপরে গাছগুলোর আশেপাশে ঝোপঝাড়। এক সময়ে এখানে বোধহয় বাগানের অস্তিত্ব ছিল, কিন্তু ফুলগাছদের তাড়িয়ে এখন তাদের স্থান দখল করেছে বেশ একটি ছোটখাটো জঙ্গল।
বাড়ির দোতলায় একখানা ঘরের ভিতর থেকে বাইরে এসে পড়েছে আলোর রেখা। বাড়িতে ঢোকবার পথ আর বড় রাস্তার সংযোগস্থলে হ্যারিকেন লন্ঠন হাতে করে দাঁড়িয়েছিল নিশ্চল একটা মূর্তি। রাত বোধহয় তখন নয়টা বাজে।
এতক্ষণ ঝিঁঝিদের একঘেয়ে গান ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছিল না, হঠাৎ স্তব্ধতাকে যেন ধাক্কা মেরে খানিক দূরে বেজে উঠল এক মোটরের ভেঁপু! লণ্ঠন হাতে নিশ্চল মূর্তিটা চমকে উঠল। তার পরেই শোনা গেল একখানা চলন্ত গাড়ির শব্দ।
ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে একখানা ট্যাক্সি। ভিতর থেকে মুখ বাড়িয়ে আছে একজন লোক।
গাড়িখানা বাড়ির কাছে এসে থামল। তার আরোহী লণ্ঠনধারী লোকটিকে জিজ্ঞাসা করলে, মশাই বলতে পারেন, এ বাড়িখানার নম্বর কত?
কুড়ি।
বটে, এই বাড়িখানাই তো আমি খুঁজছি।
আপনি কি নরেনবাবু?
–হ্যাঁ, আপনি কী করে জানলেন?
–আপনার জন্যেই তো আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি।
–আমার জন্যে?
আজ্ঞে হ্যাঁ। বড়বাবু আপনাকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে যেতে বলেছেন।
–কে বড়বাবু?
–আমার কর্তা। আসুন, গাড়ি নিয়ে ভিতরে আসুন বলেই লোকটা গাড়ির পাদানির ওপরে উঠে দাঁড়াল।
চালক লোকটার নির্দেশমতো গাড়ি চালিয়ে ভিতরে ঢুকে সেই পুরোনো বাড়িখানার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
লোকটা নেমে পড়ে দরজার কাছে গিয়ে বললে, আসুন নরেনবাবু।
নরেন একটু ইতস্তত করে গাড়ি থেকে নেমে বললে, ড্রাইভার।
হুজুর!
গাড়ি নিয়ে তুমি অপেক্ষা করো। আমি এখনি ফিরে আসছি।
–যে আজ্ঞে।
লোকটার সঙ্গে নরেন বাড়ির ভিতরে ঢুকল। সঙ্গে-সঙ্গে দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
ট্যাক্সিচালক একবার এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল। তারপর গাড়িখানাকে পিছু হটিয়ে পথের এমন এক জায়গায় এনে দাঁড় করালে, যেখানে দু-পাশেই আছে দুটো বড় ঝোপ।
মিনিট পাঁচেক যায়। দূরে কোথা থেকে ভেসে আসছে একটা কোকিলের কুহু স্বর। কাছে ঝিঁঝিদের গলার ওপরে গলা তোলবার চেষ্টা করছে একটা কোলা ব্যাং। মাঝে-মাঝে হঠাৎ জাগা বাতাসে সবুজ পাতাদের শিহরন গান। তাছাড়া আর কোনও শব্দ নেই।
