ভোম্বল অমনি সুর বদলে চোখ মটকে বললে, নিশ্চয়, নিশ্চয়! আপনার বন্ধু তো আমারও বন্ধু! হ্যাঁ, ভালো কথা কমলা কোথায়?
পণ্ডিত বললেন, এতক্ষণে সে বোধহয় মন্ত্রীমশাইয়ের বাড়িতে গিয়েছে। আপাতত তুমি এক কাজ করতে পারো ভোম্বল? অমলকে নিয়ে খানিকটা বেড়িয়ে আসবে?
ভোম্বল বললে, নিশ্চয়, নিশ্চয়! আপনার কথায় আমি প্রাণ দিতে পারি, এটা তো অতি তুচ্ছ ব্যাপার! আসুন অমলবাবু, আমার সঙ্গে আসুন! আপনাকে আমি জাদুঘরে নিয়ে যাব। সেখানে একটা ভালো হোটেল আছে, একটু-আধটু খাওয়া-দাওয়াও করা যাবে কী বলেন? বলেই সে মহা মুরুব্বির মতন আমার পিঠ চাপড়ে দিলে।
পণ্ডিত বললেন, সন্ধের আগেই ওকে আবার ফিরিয়ে আনা চাই। মনে রেখো, ওর ভার এখন তোমার উপরে, ওর জন্যে তুমি দায়ী হবে! বলেই তিনি হাত-পা ভিতরে গুটিয়ে নিয়ে গড়াতে-গড়াতে ঘর থেকে বেগে বেরিয়ে গেলেন।
.
নবম । নরডিম্ব
ভোম্বল চোখ দুটো নাচাতে নাচাতে বললে, যখন পণ্ডিতের হুকুম, পালন করতেই হবে। অমলবাবু, তাহলে আপনি হচ্ছেন একটি মনুষ্য? আমাদের দেখে আপনার কী মনে হয়? বলেই সে দন্তবিকাশ করে হাসলে।
আমি জবাব দিলুম না।
সে আবার দন্তবিকাশ করে হেসে বললে, আপনি গড়িয়ে গড়িয়ে হাঁটতে পারেন?
আমি চটে গিয়ে বললুম, নিশ্চয়ই পারি না! দেখতেই পাচ্ছেন আমি পিপে নই!
তাহলে উপায় নেই–আমাকেও দেখছি আপনার সঙ্গে ছোটলোকের মতন পায়ে হেঁটে মরতে হবে। পায়ে হাঁটা এক ঝকমারি। হাঁপ ধরে।…আসুন, এই পথে।
ঘরের ভিতর থেকে বেরিয়ে দেখি, একটা পথ ঢালু হয়ে নীচের দিকে নেমে গেছে। সেটা হচ্ছে সিঁড়ি! এদের সিঁড়িতে ধাপ নেই–তাই গড়িয়ে নামবার সুবিধা হয়। আমার কিন্তু একটু মুশকিল হল। ঢালু পথ দিয়ে নামতে গিয়ে দু-চার বার হুমড়ি খেয়ে পড়বার মতন হলুম। এবং শেষ পর্যন্ত টাল সামলাতে পারলুমও না। খানিকটা সড় সড় করে নেমে গিয়ে মস্ত একটা ডিগবাজি খেয়ে দড়াম করে নীচের চাতালের ওপরে আছাড় খেয়ে পড়লুম।
ভোম্বলের কিন্তু কোনওই বালাই নেই। সে হাত-পা ভিতরে গুটিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে চোখের নিমিষে নীচে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর দন্তবিকাশ করে ন্যাকামির হাসি হেসে বললে, দেখছেন, শ্রীখোলের ভেতরে থাকার কত সুবিধে!
আমি রাগে মুখ ভার করে বললুম, আমাদের দেশে গেলে আপনিও বুঝতেন কত ধানে কত চাল! আমাদের সিঁড়ি দিয়ে নামতে হলে আপনার ভোলা ফেটে চৌচির হয়ে যেত!
ভোম্বল বললে, আপনাদের দেশে যাচ্ছে কে? অসভ্য দেশ!
আমি আর কিছু বললুম না। তার সঙ্গে বাড়ির বাহির হয়ে রাজপথের ওপরে গিয়ে। দাঁড়ালুম।
সে এক নতুন দৃশ্য! রাজপথের দু-ধারে সারি সারি বাড়ি কিন্তু কোনও বাড়ির সঙ্গেই কোনও বাড়ির গড়ন মেলে না। প্রত্যেক বাড়ির ওপর দিকটা খিলানের আকারে গড়া– আঁকাবাঁকা, কিম্ভুতকিমাকার!
কলকাতার আপিস অঞ্চল যেমন আকাশমুখো মস্ত মস্ত বাড়ি আছে, এখানেও তার অভাব নেই। কিন্তু এদেশি ঢ্যাঙা বাড়িগুলোর আমাদের চিলের ছাদের মতন ঢালু সিঁড়ির কথা ভেবে আমার বুক কাঁপতে লাগল! ওসব সিঁড়ি দিয়ে ওঠবার সময়ে এরা হয়তো যথেচ্ছভাবে বিশ-পঁচিশ খানা অসম্ভব ও ভূতুড়ে হাত-পা বার করে ওপরে উঠে যায়, কিন্তু ওসব সিঁড়ি দিয়ে ওঠা-নামা করতে গেলে গতর চূর্ণ হয়ে আমার মৃত্যু সুনিশ্চিত!
রাস্তায় আমাদের দেশের মতন গোলমালও নেই। পথ দিয়ে ধীরে ধীরে বা দ্রুতবেগে পিপের পর পিপে গড়িয়ে যাচ্ছে, খুব কম লোকই পায়ে হেঁটে চলছে! যারা পদব্রজে যাচ্ছে, তাদের প্রত্যেকেরই তিনখানা করে পা দেখে বোঝা গেল যে, ইচ্ছামতো পদবৃদ্ধি করতে পারলেও সাধারণত এরা তিনখানা পদই ব্যবহার করে।
গরুর গাড়ির চাকার মতনই বড় অনেকগুলো চক্রও রাস্তার ওপর দিয়ে বনবন করে ছুটছে! এক-একখানা চাকা আবার এত বড় যে, মাপলে আট-দশ হাতের কম চওড়া হবে না! চাকাগুলো ছুটে যাচ্ছে ঠিক মোটরগাড়ির বেগে। এমন কায়দায় তারা এঁকেবেঁকে ছোট ছোট পিপের পাশ কাটিয়ে ছুটছে যে দেখলে তারিফ করতে হয়। কিন্তু পিপেদের সঙ্গে ধাক্কা লাগলেও কোনও পক্ষ থেকেই এখানে যে আপত্তি হয় না, সে প্রমাণ পাওয়া গেল। কারণ একবার একখানা চাকা বিপরীত দিক থেকে ধাবমান একটা পিপের ওপরে উঠে আবার গড়িয়ে নেমে চলে গেল, তবু কোনও পক্ষ থেকেই কোনও গোলমাল হল না–যেন এ ব্যাপারটা এত বেশি তুচ্ছ যে, লক্ষ করবার মতনই নয়!
আমার পাশের হৃষ্টপুষ্ট জীবটি অর্থাৎ ভোম্বলদাস লকলকে জিভ দিয়ে ঠোঁটটা একবার চেটে নিয়ে বললে, কী অমলা, আমাদের দেশ দেখে তুমি যে দেখছি থ হয়ে গেলে!
অমলা! আমি খাপ্পা হয়ে বললুম, আপনি আমাকে অমলা বলে ডাকছেন যে? আমার নাম অমল।
ভোম্বল দন্তবিকাশ করে বললে, ঠাট্টা করলে চটো কেন? ও অমল আর অমলা একই কথা!
আমি বললুম, না, অমল আর অমলা একই কথা নয়! ওরকম ঠাট্টা আমি পছন্দ করি না!
ভোম্বল বললে, বাপরে তুমি তো ভারি বেরসিক কাঠগোঁয়ার হে? একটুতেই এত বেশি চটো কেন? তোমার মুখখানা এখন কীরকম দেখতে হয়েছে জানো? এইরকম! বলেই ভোম্বল তার মুখখানা বিকৃত করতে লাগল। এবং আমার চোখের সামনেই দেখতে-দেখতে তার অদ্ভুত মুখখানা অবিকল আমার মুখেরই মতন হয়ে উঠল! সে যে কী প্রাণ চমকানো ব্যাপার, ভুক্তভোগী ছাড়া আর কেউ তা বুঝবে না। আমার চোখের সুমুখেই আর একজন আমির আবির্ভাব! শেষটা আমি আর সইতে পারলুম না, বলে উঠলুম, ক্ষান্ত হন মশাই, ক্ষান্ত হন! আমি ঘাট মানছি!
