–কিন্তু কেমন করে?
–ট্যাক্সির ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করুন।
–এই উল্লুক ড্রাইভার।
–হুজুর!
–আর হুজুর বলে আদিখ্যেতা করতে হবে না। সোজা জবাব দে। তোর বাবু বেটা গেল কোথায়?
–ও রাস্তা থেকে মোড় ফিরতেই বাবু আমার দিকে তিনখানা দশ টাকার নোট ছুঁড়ে দিয়ে লাফিয়ে পড়ে বললেন, ভাড়া আর বকশিশ। জোরসে গাড়ি চালাও, থেমো না।
–আর তুমিও অমনি তার হুকুমে ভোঁ দৌড় মারলে?
দু-তিন টাকার জায়গায় ত্রিশ টাকা পেলে কে না কথা শোনে হুজুর? কিন্তু আমার লাভের গুড় পিঁপড়ের খেয়েছে, আপনারা আমার টায়ার ফাটিয়ে দিয়েছেন।
–বেশ করেছি, খুব করেছি। এখনও তোর মাথা ফাটাইনি, এই তোর ভাগ্যি!
–আমার মাথা ফাটাবেন কেন হুজুর?
–ডাঙায় এসে তুই নৌকা ডুবিয়ে দিলি বলে।
–আমি? আমি কিছুই জানি না হুজুর, ও বাবুকে এর আগে কখনও চোখেও দেখিনি।
–বেশ, থানায় গিয়ে ও কথা বলিস।
–আমি কেন থানায় যাব?
–সুন্দরবাবু জবাব দিলেন না। তখন গাড়ি ঘিরে ভিড় করে দাঁড়িয়েছিল অনেক কৌতূহলী লোক। একজন পাহারাওয়ালাও ছিল। সুন্দরবাবু তারই হাতে সপে দিলেন ট্যাক্সিওয়ালাকে।
সুন্দরবাবু বললেন, আমার কী মনে হচ্ছে জানো? খুনি আমাদের জয়ন্তের চেয়েও চালাক।
–খুনি, জয়ন্তের চেয়েও চালাক কিনা জানি না, কিন্তু আপনার চেয়ে যে চালাক, সে বিষয়ে আর একটুও সন্দেহ নেই।
যা মুখে আসে বলো বাবা, বলো। তোমার কাছে আমি ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো ছাড়া তো আর কিছুই নই।
–যা বললুম, সত্য।
–প্রমাণ দাও।
–যা স্বপ্ৰকাশ, তার জন্যে প্রমাণের দরকার নেই।
–মানে?
দুপুর রৌদ্রেও আকাশে সূর্য আছে কিনা জানবার জন্যে কেউ প্রমাণের খোঁজ করে না।
সুন্দরবাবু ক্রোধকম্পিত কণ্ঠে বললেন, আরে রেখে দাও তোমার বাগাড়ম্বর, আমি খুনির মতো চালাক না হতে পারি, কিন্তু তোমার মতো নিরেট গর্দভ নই।
জয়ন্ত নিজের মনে কী চিন্তা করছিল। হঠাৎ সে প্রশ্ন করলে, মানিক, তোমার কি বিশ্বাস, আমরা নতুন কোনও সূত্র পাইনি।
তাই তো আমার ধারণা।
–তোমার ধারণা ভ্রান্ত।
–কেন?
–বুঝিয়ে দিচ্ছি। তার আগে বলো দেখি, অন্নপূর্ণাদেবী বরেনবাবুর কোন বোন?
–সধবা ছোটবোন।
তার সন্তান আছে?
না।
–তুমি বলেছিলে বরেনবাবুর মৃত্যুর পরে তাঁর ভাই নরেনবাবুই সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবেন।
হুঁ।
নরেনবাবুর সন্তানাদি কী?
–তিনি বিবাহই করেননি।
জুয়া খেলে তিনি সম্পত্তির অধিকাংশই উড়িয়ে দিয়েছেন।
–হ্যাঁ।
–তাহলে এখন তার টাকার টানাটানি।
খুব সম্ভব তাই।
–এখনও তার জুয়ার নেশা আছে?
–থাকতে পারে, আমি ঠিক জানি না। কিন্তু তুমি এসব প্রশ্ন করছ কেন?
–মানিক, একটু মাথা ঘামাও। ভালো করে ভেবে দ্যাখো, নরেনবাবু যে বাড়িতে এসে উঠেছেন, সেখান থেকে ওই কালো চশমাপরা রোগা আর ঢ্যাঙা লোকটা বেরিয়ে এল কেন? ও যে খুনিদের দলের লোক, তাতে আর কোনওই সন্দেহ নেই। কিন্তু ওই বাড়ির সঙ্গে ওর কীসের সম্পর্ক? ও লোকটা অন্নপূর্ণাদেবীর স্বামী নয় তো?
নিশ্চয়ই নয়! অন্নপূর্ণাদেবীর স্বামীকে আমি চিনি।
তবে কি ও লোকটা নরেনবাবুর বন্ধু?
–আমি জানি না।
–কিন্তু জানতে হবে মানিক, জানতেই হবে। সর্বাগ্রে ওইটাই জানা দরকার। আজ একটা বড় সূত্ৰ পেলুম। চলো, বরেনবাবুকে নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করে আসি। বন্ধু, মানুষ চেনা বড় কঠিন।
.
বারো । যা করেন মা কালী
পথে আসতে-আসতে সুন্দরবাবু হঠাৎ চিৎকার করে বলে উঠলেন–ঠিক, ঠিক, ঠিক।
মানিক, সচমকে বললে, কী ব্যাপার? সুন্দরবাবুর মগজের ভিতরে ঝড় উঠল নাকি?
ঝড় নয় মূর্খ, ঝড় নয়।
–তবে?
–আমি চিন্তা করছিলুম।
–চিৎকার করে কেউ চিন্তা করে নাকি?
চিৎকার করে কেউ চিন্তা করে না বটে, কিন্তু চিন্তা করবার পর লোকে অনায়াসেই চিৎকার করতে পারে।
–বেশ চিন্তামণি মশাই, আপনার মূল্যবান চিন্তাটা কী শুনি?
–এ না হয়েই যায় না।
কী না হয়ে যায় না?
–ওই নরেনবাবু–
হুঁ বলুন।
ওই নরেনবাবুটির ওপরে আমার ভীষণ সন্দেহ হচ্ছে।
-কেন?
জয়ন্ত ঠিক আন্দাজ করেছে, নরেনবাবু লোকটি বড় সহজ মানুষ নয়। খুনিদের দলের সঙ্গে যে সম্পর্ক পাতায়–
বাধা দিয়ে মানিক বললে, থামুন। আপনার চিন্তার দৌড় বুঝতে পেরেছি। আপনার চিন্তাকে অত বেশি দৌড়াদৌড়ি করতে দেবেন না, হোঁচট খেয়ে শেষটা সে খোঁড়া হয়ে যেতে পারে।
বাক্যবাণ ছোড়বার জন্যে তুমিও অত বেশি জিভ নেড়ো না বাপু, জিভখানা শেষে খসে পড়তে পারে।
দুজনেরই মুখ বন্ধ হল। গাড়ি আবার এসে থামল অন্নপূর্ণাদেবীর বাড়ির দরজায়।
বেয়ারা মানিককে চিনত। সকলকে বৈঠকখানায় বসিয়ে নরেনবাবুকে খবর দিতে গেল।
কিছুক্ষণ পরে ঘরের ভিতরে বরেনবাবুর প্রবেশ।
সুন্দর চেহারা। একহারা, কিন্তু মাননসই দেহ, টকটকে রং, চোখ-নাক ঠোঁট যেন তুলি দিয়ে আঁকা। সূক্ষ্ম একটি গোঁফের রেখা। মুখখানি যেন সরলতার প্রতীক! কিন্তু তার ভাবভঙ্গি আজ বিষাদের দ্বারা আচ্ছন্ন।
সকলের ওপরে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে নরেন বললে, এই যে মানিকবাবু নমস্কার। এঁরা কারা?
জয়ন্ত ও সুন্দরবাবুর পরিচয় দিলে মানিক। নরেনের দুই ভুরু সঙ্কুচিত হল। সে বললে, আমার মন আজ ভালো নয়, বেশিক্ষণ কথা কইতে পারব না, এজন্যে অপরাধ নেবেন না।
জয়ন্ত এতক্ষণ দেওয়ালের একখানা বড় আয়নার ভিতরে প্রতিবিম্বিত নরেনের মূর্তির দিকে তাকিয়ে ছিল তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে। সে ফিরে বললে, আজ আপনাকে বেশিক্ষণ কষ্ট দেব না। আপনার কাছে এসেছি কেবল একটি কথা জানবার জন্যে।
