লরি?
–হ্যাঁ হুজুর। মড়াটা এনেছিল তারা একখানা লরির উপরেই চাপিয়ে।
-তারপর?
–তারা আবার লরির ওপরে গিয়ে উঠল। তারপর লরিখানা হুশ করে ছুটে চোখের আড়ালে চলে গেল।
–আর তুমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলে?
তা ছাড়া আর কী করব হুজুর? মানুষ তো লরির সঙ্গে ছুটতে পারে না।
লরিতে কজন লোক ছিল।
–চারজন।
তাদের আবার দেখলে চিনতে পারবে?
সবাইকে ভালো করে দেখবার সময় পাইনি। তবে যে লোকটা আমার সঙ্গে কথা কইছিল, তার চেহারা আমার মনে আছে।
–সে কীরকম দেখতে?
–খুব কালো, খুব রোগা আর খুব ঢ্যাঙা; চোখে কালো চশমা।
হুম। জয়ন্ত, শুনছ?
–শুনছি। কিন্তু শুনে কী হবে, তাকে তো ধরতে পারলুম না!
–তারপর জমাদার, তুমি ডাক্তারের সার্টিফিকেটের কথা কী বলছিলে না?
— হুজুর; এই নিন সেই সার্টিফিকেট।
জয়ন্ত বললে, সুন্দরবাবু, ও নিয়ে মাথা ঘামিয়ে আর সময় নষ্ট করবেন না। আমি হলপ করে বলতে পারি ওখানা হচ্ছে জাল সার্টিফিকেট। তার চেয়ে লাশটাকে দেখবেন চলুন, যদি কোনও সূত্র পাওয়া যায়।
শ্মশানের আঙিনার ওপরে ছিল মৃতদেহটা। মড়াটাকে পাহারা দিচ্ছিল একজন জীবন্ত লালপাগড়ি। খাটের ওপর থেকে নতুন কাপড়ের আবরণ সরিয়ে দেখা গেল একটা ভয়াবহভাবে অগ্নিদগ্ধ মানুষের বিকৃত দেহ।
সুন্দরবাবু বললেন, এখন এই লাশটাকে কী করা যায় জয়ন্ত?
–মর্গে পাঠিয়ে দিন। এর ফটো তুলে কাগজে বিজ্ঞাপন দিন; দেখুন যদি কেউ শনাক্ত করতে পারে।
–তুমি নতুন কোনও সূত্র-টুত্র আবিষ্কার করতে পারলে?
–উঁহুঁ।
–এখন কী করতে চাও?
সূত্র আবিষ্কারের জন্য অন্য কোথাও যাত্রা করতে চাই।
–সে কোথায়?
বরেনবাবুর বাড়িতে।
–সেখানকার সব সূত্র তো অগ্নিদেব গ্রাস করেছেন।
–আমি জানতে চাই, বরেনবাবুর ছোট ভাই কলকাতায় এসেছেন কিনা?
নরেন্দ্রনাথ রায়চৌধুরী?
হ্যাঁ।
–বেশ, চলো।
সকলে মোটরে গিয়ে উঠল। খানিক পরেই গাড়ি বরেনবাবুর বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তখনও সেখানে আগুন জ্বলছিল না বটে, কিন্তু সেই অসম্পূর্ণ বাড়িখানার চারিদিকেই বিরাজমান ক্রুদ্ধ অগ্নিশিখার কালো দংশনচিহ্ন।
সদর-দরজার চৌকাঠের ওপরে ম্রিয়মান মুখে উবুড় হয়ে বসেছিল বরেনবাবুর প্রিয় ভৃত্য।
মানিক শুধোলে, কী হে, তোমাদের ছোটবাবু খবর পেয়ে দেশ থেকে এসেছেন?
–আজ্ঞে হ্যাঁ, আজ সকালেই এসেছেন।
–আর কে এসেছেন?
–আর কেউ না। খবর শুনে গিন্নিমা পাগলের মতো হয়ে গিয়েছেন। তিনি আসতে পারেননি।
–আমরা নরেনবাবুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।
–তিনি তো এখানে নেই।
–তবে কোথায় আছেন?
–বাবুর ছোটবোনের বাড়িতে।
–অন্নপূর্ণাদেবীর বাড়িতে?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
মানিক ফিরে বললে, জয়ন্ত অন্নপূর্ণাদেবীর বাড়ি আমি চিনি। সেখানে বার দুয়েক নিমন্ত্রণ খেয়ে এসেছি।
–উত্তম। তুমিই আমাদের পথপ্রদর্শক হও! আমাদের কোথায় যেতে হবে?
বারাণসী ঘোষ স্ট্রিট।
সুন্দরবাবু গজ গজ করে বললেন, আমরা যেন স্রোতের শ্যাওলা, ক্রমাগতই ভেসে ভেসে বেড়াচ্ছি। শেষ পর্যন্ত ভাসতে-ভাসতে কোথায় গিয়ে যে ঠেকব বাবা, তা ভগবানও জানেন কি না সন্দেহ!
মানিক বললে, দুনিয়ার মালিক ভগবানের হাতে অনেক কাজ। আমরা কোথায় ঠেকব কি ঠেকব না, তা নিয়ে ভাবনার সময় তার নেই।
গাড়ি প্রবেশ করল বারাণসী ঘোষ স্ট্রিটের ভিতরে।
মানিক বললে, ওই বাড়িখানা, ওই যে সামনে একখানা ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে আছে।
অন্নপূর্ণাদেবীর বাড়ির ভিতর থেকে একজন লোক বেরিয়ে এসে ট্যাক্সির ওপরে চড়ে বসল। ট্যাক্সিখানা সচল হয়ে জয়ন্তদের গাড়ির পাশ দিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল।
আচম্বিতে জয়ন্তও নিজের গাড়ির মোড় ফিরিয়ে নিলে।
মানিক সবিস্ময়ে বললে, ওকী, কোথা যাও?
জয়ন্ত বললে, ওই ট্যাক্সির পিছনে।
–কেন হে?
–দেখতে পেলে না, সেই খুব কালো, খুব রোগা আর ঢ্যাঙা লোকটা।
.
এগারো । ঘুঘুর চাতুরি
মোটরের মোড় ফিরিয়েই জয়ন্ত দেখল, ট্যাক্সিখানা হঠাৎ ডান দিকের একটা রাস্তা ধরে সাঁত করে অদৃশ্য হয়ে গেল। জয়ন্তও সেই রাস্তা ধরলে।
ট্যাক্সির গতি তখন হয়ে উঠেছে দ্রুততর। জয়ন্তদের মোটরেরও গতি বেড়ে উঠল। দু-খানা গাড়ির সেই মারাত্মক দৌড় দেখে সচকিত পথিকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে ছড়িয়ে পড়ল দিকে দিকে।
সুন্দরবাবু উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন, হা-রে-রে-রে কালো চশমা, আজ তোকে খাপে না পুরে ছাড়ব না। বারেবারে ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান। এবার বধিব আমি তোমার পরান। হুম হুম হুম! আরও আরও জোরে জয়ন্ত, আরও জোরে।
মানিক বললে, আরও জোরে নয়। আরও জোরে গাড়ি ছোটালে ঘুঘু বধের আগেই পথের পথিক বধ হবে।
জয়ন্ত বললে, ঠিক বলেছ মানিক। খুনি ধরতে গিয়ে আমরাও মানুষ খুন করব নাকি? তার চেয়ে তুমি এক কাজ করো; ট্যাক্সিখানা রিভলভারের নাগালের বাইরে যায়নি। তুমি গুলি ছুঁড়ে ওর টায়ার ফুটো করে দাও, পারবে?
মানিক রিভলভার বার করে ঘোড়া টিপলে, একবার, দুইবার, তিনবার। তৃতীয় গুলি বিদ্ধ করলে একখানা টায়ারকে। দুম করে জাগল এক আর্তনাদ। ট্যাক্সির দৌড় বন্ধ। তার পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়ল জয়ন্তদের মোটর।
গাড়ি থেকে নেমে ট্যাক্সির হুডের তলায় মাথা চালিয়ে হতভম্ব সুন্দরবাবু বিস্মিত কণ্ঠে বলে উঠলেন, আরে এ যে ভানুমতীর খেল! কোথায় সেই বেটা কালো চশমা?
জয়ন্ত তিক্ত হাসি হেসে বললেন, আপনার ঘুঘু এবারেও ফাঁকি দিয়েছে ফাঁদকে।
