মানিক বললে, না না, আমি কালকের রাতের কথাই বলছি।
সুন্দরবাবু হতভম্বের মতন বললেন, মানিক কী বলতে চায় জয়ন্ত? কাল রাতে আমি তো শয্যাশায়ী ছিলুম, গায়ের ব্যথা কমাবার জন্যে স্ত্রীকে বার বার ওষুধ মালিশ করে দিতে হয়েছিল।
জয়ন্ত হাসতে-হাসতে বললে, হ্যাঁ সুন্দরবাবু, কাল রাত্রে আমরা প্রাণে বেঁচেছি কেবল আপনার জন্যেই। তা সে কথা পরে হলেও চলবে, আগে আপনি চা খান, চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
–হোক গে চা ঠান্ডা। তোমাদের আজব কথা শুনে এদিকে যে আমার মাথা গরম হয়ে উঠেছে। কাল রাত্রে আমি তোমাদের প্রাণ বাঁচাবার কোনও চেষ্টাই করিনি।
মানিক গদগদকণ্ঠে বললে, আহা, আমাদের সুন্দরবাবু কী বিনয়ী!
বিনয়ের নিকুচি করেছে। আমি হলপ করে বলতে পারি, কাল সন্ধ্যা থেকে আজ সকাল পর্যন্ত বিছানা ছেড়ে একবারও নামিনি।
সুন্দরবাবু, ভয়েভয়ে একটা কথা বলব?
কথা আবার কী?
–আপনি সোমনাবুলিস্ট নন তো?
–মানে?
আপনার নিদ্রাভ্রমণের ব্যাধি নেই তো?
–ও ব্যাধি শত্রুর হোক। তোমার হলেও আমি দুঃখিত হব না।
–আমি কি আপনার শত্রু?
–মাঝে-মাঝে আমার সেই সন্দেহই হয়।
–আচ্ছা সুন্দরবাবু, আপনি কি বলতে চান, কাল রাতে বেহালার এক বাগানবাড়িতে আপনারা পাহারা দিতে যাননি?
–অসম্ভব মিথ্যা কথা!
–সেই বাগানে একদল লোকের হাতে আমরা হয়েছিলুম বন্দি। আপনিই আমাদের উদ্ধার করে এনেছেন।
–আরব্য উপন্যাসের যে-কোনও গল্প এর চেয়ে সত্য। তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে মানিক।
–জয়ন্ত আমার সাক্ষী।
–শুঁড়ির সাক্ষী মাতাল।
জয়ন্ত হো হো করে হেসে উঠে বললে, রাগ করবেন না সুন্দরবাবু। আসুন, এই চেয়ারে এসে বসুন। এই নিন স্যান্ডউইচ, এই নিন নিমকি, ডিম, কেক। এইবারে খেতে-খেতে চুপ করে আমার কথা শুনুন। মানিক একেবারে অমূলক কথা বলছে না।
সুন্দরবাবু খাবারের থালার দিকে হাত বাড়িয়েছিলেন, কিন্তু আবার হাতখানা টেনে নিয়ে ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠলেন, তোমারও মতে মানিক সত্য কথাই বলছে? তাহলে এই রইল তোমার চায়ের পেয়ালা, এই রইল স্যান্ডউইচ আর যত কিছু ঘোড়ার ডিম। হুম! এই পাগলাগারদ ছেড়ে আমি এখন থানায় পলায়ন করতে চাই!
–আরে শুনুন মশাই, শুনুন। আপনি ঘটনাস্থলে স্বশরীরে হাজির থেকে আমাদের বাঁচাননি বটে, কিন্তু আমরা প্রাণে বেঁচেছি আপনারই নামের জোরে!
বটে! তাই নাকি? সুন্দরবাবু আবার বাহুবিস্তার করলেন, তারপর একখানা গোটা স্যান্ডউইচ বদনবিবরে নিক্ষেপ করে বললেন, আচ্ছা, তাহলে, তোমাদের কাহিনি শুনতে আমি নারাজ নই; বলো!
জয়ন্তের কাহিনি শুনতে-শুনতে সুন্দরবাবুর দুই চক্ষু ক্রমেই বিস্ফারিত হয়ে উঠতে লাগল। তারপর তিনি আহার্য গ্রহণ করতেও ভুলে গেলেন, মুখব্যাদান করে অবাক হয়ে কেবল গল্পই শুনতে লাগলেন। তারপর জয়ন্তের গল্প ফুরুল এবং শুরু হল সুন্দরবাবুর হো-হো-হো-হো হাসির ঘটা। দুই হাতে ভুড়ি চেপে ধরেও তিনি মিনিট-তিনেকের আগে দমন করতে পারলেন না সেই সর্বনেশে হাসির বিষম ধাক্কা।
অনেক কষ্টে আত্মস্থ করে সুন্দরবাবু বললেন, জয়ন্ত আমি স্বীকার করছি তুমি একটি জিনিয়াস। একেই বলে শূন্যহাতে কড়ি খেলা! তোমার প্রত্যুৎপন্নমতি হচ্ছে বিস্ময়কর। কিন্তু বড়ই দুর্ভাগ্যের বিষয় ভায়া, অপরাধীদের পালের গোদাকে একবারও তুমি দেখতে পেলে না।
–সে জন্যে দায়ী অন্ধকার।
কী বললে? লোকটার গলার আওয়াজ আধা কর্কশ আধা-কোমল?
–হ্যাঁ। শুনলে মনে হয়, একজন মানুষ যেন দুজনের গলায় কথা কইছে। এ-রকম কণ্ঠস্বর আমি জীবনে আর কখনও শুনিনি। আপনি শুনেছেন।
কই, মনে পড়ছে না তো!
–ভালো করে মনে করে দেখুন। সে আপনাকে চেনে। আপনার ওপরে তার ভারী আক্রোশ। আমার দৃঢ় বিশ্বাস সে হচ্ছে পুরাতন পাপী, কখনও না কখনও আপনার পাল্লায় গিয়ে পড়েছিল, আর আপনার কাছ থেকে জামাইআদর সে পায়নি।
সুন্দরবাবু স্মৃতি-সাগরে নিজের মনকে ডুবিয়ে দিয়ে খানিকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। কিন্তু তার মন স্মৃতি-সাগর আলোড়িত করেও নতুন কোনও তথ্য সংগ্রহ করতে পারলেন না।
জয়ন্ত বললে, বেশ, তাহলে আর এক কাজ করবেন। সেই বাগানবাড়িখানার আশেপাশে পুলিশের গুপ্তচর মোতায়েন রাখবেন।
–বেশ, পাহারার ব্যবস্থা করব।
হঠাৎ বেজে উঠল টেলিফোনের ঘণ্টা। জয়ন্ত ফোন ধরে বললে, হ্যালো!
মিনিটখানেক পরে ফোন ছেড়ে দিয়ে জয়ন্ত তাড়াতাড়ি হাত বাড়িয়ে পাশের দেয়াল আলনা থেকে জামাটা টেনে নিয়ে বলল, সুন্দরবাবু, উত্তিষ্ঠত! জাগ্রত! নিমতলার শ্মশানে এইমাত্র একটা আগুনে পোড়া মৃতদেহ এসেছে। চলো মানিক, জলদি।
.
দশ । কালো, রোগা, ঢ্যাঙা
নিমতলার শ্মশান। সুন্দরবাবুর সঙ্গে জয়ন্ত ও মানিক মোটর থেকে নেমে পড়ল। কিন্তু আবার ব্যর্থতা। একটা পুড়ে-মরা মানুষের লাশ পাওয়া গেল বটে, কিন্তু সেই মৃতদেহটা নিয়ে যারা এখানে এসেছিল, তাদের কোনওই পাত্তা পাওয়া গেল না।
পুলিশের যে জমাদারকে শ্মশানের ওপরে নজর রাখবার জন্যে নিযুক্ত করা হয়েছিল তার দিকে ফিরে সুন্দরবাবু বললেন, তুমি কি বাপু সাক্ষীগোপালের মতো হাঁ করে তাকিয়ে বসে গঙ্গার ঢেউ গুনছিলে?
জমাদার বললে, আমার কোনও দোষ নেই হুজুর। লাশ তো আমিই আটকেছিলুম।
–যারা লাশ এনেছিল তাদের আটকালে না কেন?
–তারা ডাক্তারের সার্টিফিকেট দেখালে। আমি বললুম, ওতেও চলবে না। থানার বড়বাবু এসে যদি হুকুম দেন, তবেই তোমরা লাশ পোড়াতে পারবে। তাদের একজন বললে, বেশ, লাশ এখানেই রইল, আমরা লরিতে বসে তোমাদের বাবুর জন্যে অপেক্ষা করছি।
