–আত্মপরিচয় দেবার ইচ্ছা আমার নেই।
–তাহলে তোমার প্রশ্নও হয়ে রইল উত্তরহীন।
তবে কি তুমি এখানে এসেছিলে কেবলমাত্র নির্মল বায়ু ভক্ষণ করতে?
–তাও না।
তবে?
সত্য কথা বলব?
–হ্যাঁ। আমি নিজে প্রায়ই সত্য কথা বলি না, কিন্তু আমি সত্য কথা শুনতে ভালোবাসি।
–তোমার কথাগুলো রবি ঠাকুরের কবিতার মতো নয়।
–মানে?
–তুমি ভারি স্পষ্ট ভাষায় কথা কইছ।
–হ্যাঁ, আমি স্পষ্ট কথা বলতে চাই, আর শুনতে চাই।
সাধু, সাধু!
–আবার ব্যঙ্গ? বলো কেন তুমি এখানে এসেছিলে?
–তোমার প্রশ্ন যে আর একটা নতুন হুকুমের মতন শোনাচ্ছে?
–হ্যাঁ, তাই। কেন এখানে এসেছিলে?
যদি না বলি?
বধ করব!
–যদি বলি?
–তাহলেও তোমরা বাঁচবে না।
–হরে দরে সেই হাঁটু জল?
–হাঁটু জল নয় বাবা, গভীর জল!
বুঝলুম না।
–তোমাদের হাত-পা বেঁধে, থলেয় পুরে এই বাগানের পুকুরে গভীর জলে নিক্ষেপ করব।
–খাসা। মৃত্যুটা রোমান্টিক হবে বলে মনে হচ্ছে।
–শোনো মহা-গোয়েন্দা জয়ন্ত!
কী হুকুম জনাব?
–তোমরা এখানে কেন এসেছিলে আমার মুখেই শুনবে?
জনাব হাত গুনতে জানেন?
–ওরে হাঁদারাম, আমি হাত গুনতে জানি না। আমি জানি দুইয়ের সঙ্গে দুই যোগ করলে চার ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না।
–অপূর্ব আবিষ্কার।
–আবিষ্কার নয়রে, সহজ সত্য।
সত্য কোনও দিনই সহজ নয়।
–তাই নাকি?
–হ্যাঁ। সত্য সহজ হলে খ্রিস্টদেবকে ক্রুসে বিদ্ধ হয়ে প্রাণ দিতে হত না।
–তুমি খালি মহা-গোয়েন্দা নও, মহা-দার্শনিকও।
দর্শন–অর্থাৎ ভালো করে দর্শন করাই হচ্ছে গোয়েন্দার প্রধান আর প্রথম কর্তব্য।
–তাহলে শোনো। আজ সকালে তোমার চর্মচক্ষু যা দর্শন করেছিল, তা ঠিক নয়।
কথাটা ভালো করে বুঝিয়ে দাও।
তুমি একখানা চিঠি পড়ে এখানে এসেছ তো?
হ্যাঁ।
–সেই চিঠিতে বিজয় নামে কোনও ব্যক্তিকে এই বাগানবাড়িতে আসতে বলা হয়েছিল?
হুঁ।
–সেই চিঠিখানা লিখেছিলুম আমিই।
তারপর?
–কিন্তু বিজয় নামধারী কোনও ব্যক্তিকেই আমি চিনি না।
বটে!
–ওই চিঠির বিজয় হচ্ছে কাল্পনিক ব্যক্তি।
–এতখানি কল্পনাশক্তি প্রয়োগের কারণ কী?
–আমি তোমাকে ভুলিয়ে এখানে আনতে চেয়েছিলুম।
ভুলিয়ে?
–হ্যাঁ। চিঠিসুদ্ধ চশমার খাপখানা আমরা ইচ্ছে করেই সেখানে ফেলে রেখে এসেছিলুম। কারণ আমি জানতুম, চিঠিখানা তোমাদের হস্তগত হবেই।
–তোমার কথা শুনে কবি মাইকেলের ভাষায় বলতে সাধ হচ্ছে–তব বাক্যে ইচ্ছা মরিবারে। আমাকে এখন গাধা বললেও রাগ করব না।
ফাঁদে পা দিয়েছ। এখন আর আত্মলাঞ্ছনা করে লাভ নেই।
–আমার মতন গাড়লের বেঁচে থাকা উচিত নয়।
–তা তুমি বাঁচবেও না। তুমিও না, তোমার বন্ধুও না।
–কিন্তু তোমার এ আদেশ আমি শিরোধার্য করতে রাজি নই।
–দেখা যাবে। এই সঙ্গে ভুদো সুন্দর-গোয়েন্দাকেও যমালয়ের পথে পাঠাতে পারলে সুখী হতুম। তার ওপরে আমার অনেক দিনের রাগ।
–যাক, তোমার একটা পরিচয় পাওয়া গেল। সুন্দরবাবুর ওপর তোমার অনেক দিনের রাগ? তাহলে তুমি একজন পুরোনো পাপী, তোমার নাম জানা আর অসম্ভব হবে না।
মূর্খ, নাম জানবার সময় পাবে কখন? তুমি যে কালকের সূর্যোদয় পর্যন্ত দেখতে পাবে না।
–তোমার এ ধারণা ভ্রান্ত।
দু-রকম গলায় শোনা গেল একজনের অট্টহাস্য। তারপর হঠাৎ হাসি থামিয়ে সে বললে, আমার ধারণা ভ্রান্ত! মরবার ভয়ে তোর মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি রে?
–মরব না আমি, মরবে তুমি।
–আমায় কে মরবে?
সুন্দরবাবু।
–কোথায় সে?
–এইখানে, এই বাগানে।
–আমি কি প্রলাপ শুনছি?
–মোটেই নয়। ওই শোনো সুন্দরবাবুর গলা। তিনি সদলবলে তোমাদের গ্রেপ্তার করতে আসছেন।
কই, আমি কারুর গলা শুনছি না।
জয়ন্ত চিৎকার করে ডাকলে, সুন্দরবাবু, সুন্দরবাবু।
দূর থেকে সাড়া এল, যাচ্ছি ভায়া, কোনও ভয় নেই।
সুন্দরবাবু শিগগির আসুন।
আরও কাছ থেকে সাড়া এল–এই যে আমরা এসে পড়েছি।
পর মুহূর্তে দ্রুত পদশব্দ তুলে ঘরের লোকগুলো বাইরে পলায়ন করলে দারুণ আতঙ্কে।
মানিক সবিস্ময়ে বললে, সুন্দরবাবুকে তুমি কখন খবর দিলে?
অন্ধকারে মৃদু হাস্য করে জয়ন্ত বললে, কোথায় সুন্দরবাবু? তুমি কি ভুলে গিয়েছ, আমি ভেন্ট্রিলকুইজম জানি? এদেশি ভাষায় তার একটি গালভরা নাম আছে–দূরাগতশব্দানুকরণ বিদ্যা! দেখেছ তো ভায়া, যথাসময়ে সব বিদ্যাই কাজে লাগে!
.
নয়। সুন্দরবাবু নিদ্ৰাচর নন
জয়ন্তদের চায়ের আসর। তরল পানীয়ের সঙ্গে নিরেট খাবারেরও অভাব নেই, স্যান্ডউইচ নিমকি, ডিম, কেক। জয়ন্ত ও মানিক চায়ের সঙ্গে দুই টুকরো টোস্ট পেলেই তৃপ্ত হত, কিন্তু এই প্রভাতী চায়ের বৈঠকটিকে প্রত্যহই অলংকৃত করতেন সুন্দরবাবু। তার কথা স্বতন্ত্র। ভুরিভোজন ছাড়া তার অসাধারণ উদরদেশটি পুলকিত হতে চাইত না কোনওদিন।
যথাসময়ে সুন্দবাবুর প্রবেশ। এসেই তিনি বলে উঠলেন, হুম! চা-টা শুরু হয়ে গেছে দেখছি। যা কাজের ভিড়। ঘড়ির কাঁটা ধরে আসা অসম্ভব।
মানিক বললে, সাধু সুন্দরবাবু, সাধু! কাল রাতে আমাদের জন্যে অত খাটুনি খেটেও আজ সকালেই আবার কাজের ভিড়ের ভিতরে গিয়ে ঢুকে পড়েছেন? ধন্য আপনার কর্তব্যনিষ্ঠা।
সুন্দরবাবু দস্তুরমতো ভয় করতেন মানিকের মুখরতাকে। মনে-মনে সে কী নতুন দুষ্টুমির ফন্দি আঁটছে বুঝতে না পেরে তিনি বললেন, কাল রাতে আমি আবার তোমাদের জন্যে কখন খেটে মরেছি? তুমি কি সকালের কথা বলছ? হ্যাঁ, কাল সকালে আমি দু-দুবার রাম-আছাড় খেয়েছি বটে। গায়ের ব্যথা এখনও মরেনি।
