খুব সম্ভব সেটা কোনও বাগানবাড়ি। চারিদিকে প্রাচীর, ফটকের রেলিংয়ের ভিতর দিয়ে ঝাপসা ঝাপসা দেখা যাচ্ছে, গাছপালার মাঝখানে একখানা বড় একতলা বাড়ি। কিন্তু ফটকে বাহির থেকে তালা দেওয়া। বাড়ির কোনও দরজা জানালার ফাঁক দিয়েও চোখে পড়ে না এতটুকু আলোর রেখা।
জয়ন্ত বললে, দেখে মনে হচ্ছে বাড়িখানা খালি। এখনও তো দশটা বাজতে অনেক দেরি, আপাতত আমাদের কী করা উচিত, মানিক?
–হয় পাঁচিল টপকে ভিতরে যাওয়া, নয় রাস্তার ওপাশের গাছে চড়ে ওপর থেকে চারিদিকে নজর রাখা।
–উত্তম। আমরা শোষোক্ত উপায়ই অবলম্বন করব। এসো ভায়া, খানিকক্ষণ শাখামৃগের ভূমিকায় অভিনয় করা যাক। খানিকক্ষণ কাটল, দ্রুতবেগে অস্ত যাবার চেষ্টা করছে আজকের অনতি-উজ্জ্বল চাঁদ।
জয়ন্ত বললে, বাঁদরগুলো আমাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতালে না বটে, কিন্তু মশার দল কেমন সানন্দে ব্যান্ড বাজিয়ে আমাদের সাদর অভ্যর্থনা জানাচ্ছে দ্যাখো।
মানিক নিজের ওপরে ঘন ঘন চপেটাঘাত করে মশকদের অভ্যর্থনার উত্তর দিতে দিতে বললে, এ-সময়ে সুন্দরবাবুর অভাব অনুভব করছি। এখানে তিনি এখন থাকলে এই সব অনাহুত মশকের উদ্দেশে যেসব চোখা চোখা বচন ঝাড়তেন, কোনও অভিধানেই তা খুঁজে পাওয়া যেত না।
আরও কিছুক্ষণ গেল। নিচের রাস্তা দিয়ে মাঝে-মাঝে লোকজন যাচ্ছে বটে, কিন্তু তাদের কেউ সেই দশ নম্বরের বাগানের দিকে ফিরেও তাকালে না। বেজে গেল রাত দশটা, চাঁদ গেল অস্ত। পৃথিবীর নাট্যশালায় নিরন্ধ্র অন্ধকারের প্রবেশ।
জয়ন্ত বললে, অন্ধকার আজ আমাদের চোখ অন্ধ করতে পারবে না। বাগানবাড়ির ফটকের পাশেই একটা সরকারি আলো রয়েছে। আমাদের ফাঁকি দিয়ে কারুর পক্ষেই ফটকের ভিতরে ঢোকা সম্ভব হবে না।
মানিক বললে, কিন্তু কেউ কি আজ ওই ফটক খুলতে আসবে? আমার মনে হয় বিজয়ের দুর্ঘটনার জন্যে আজ ওদের আড্ডা আর বসবে না।
–তা অসম্ভব নয়। তবু আরও কিছুক্ষণ পাহারা দেওয়া যাক।
রাত এগারোটা বাজল।
মানিক বললে, ভাই জয়ন্ত, আর নয়। খামোকা মশাদের রক্ত-তৃষ্ণা নিবারণ করে লাভ নেই। পুনর্বার ভূমিষ্ঠ হওয়া যাক।
–তথাস্তু, কিন্তু বাগানের ভিতরটায় একবার চোখ না বুলিয়ে এ স্থান আমি ত্যাগ করব না। গাছ থেকে নামতে-নামতে বললে জয়ন্ত।
রাস্তায় আর পথিকদের পদশব্দ নেই। বোবা ও অন্ধরাতে কালো চাদরে গা-ঢাকা দিয়ে শব্দ সৃষ্টি করছে খালি পাচার দল। বাদুড়দের ডানা-নাড়াও শোনা যাচ্ছে মাঝে-মাঝে।
জয়ন্ত ও মানিক হাজির হল প্রাচীরের ওপারে, বাগানের ভিতরে।
অন্ধকারে ছায়ার মতন খানিকক্ষণ এদিক-ওদিকে ঘুরে জয়ন্ত বলল, এত বড় বাগান, এত বড় বাড়ি এমন খালি পড়ে থাকা স্বাভাবিক নয়। মালির ঘর পর্যন্ত বাহির থেকে তালা বন্ধ। এ যেন কেমন কেমন মনে হচ্ছে। এসো মানিক, একবার বাড়ির ভিতরটা পরীক্ষা করা
দালান পার হয়েই সামনে যে দরজাটা পাওয়া গেল তা কুলুপ আঁটা ছিল না। জয়ন্ত ও মানিক ভিতরে প্রবেশ করে টর্চের আলোতে দেখলে, সেটা হচ্ছে হল-ঘরের মতো। বেশ সাজানো-গোছানো। বড় বড় ছবি, আর্শি, মার্বেলের টেবিল, সোফা কৌচ, শ্বেতপাথরের মূর্তি। একদিকে ঢালা-বিছানা পাতা, তার ওপরে তাকিয়ার ভিড়।
জয়ন্ত বললে, এ ঘর ব্যবহার করা হয়, দরজা পর্যন্ত খোলা, অথচ বাড়িতে মানুষ নেই। সন্দেহজনক! রিভলভার বার করো মানিক, রিভলভার বার করো! বাড়ির অন্য ঘরগুলো সাবধানে দেখতে হবে। টর্চের আলো নিবিয়ে তারা অগ্রসর হল বাইরের দিকে।
আচম্বিতে সেই অন্ধকারে কোথা থেকে কেমন করে অনেকগুলো মূর্তি বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল জয়ন্ত ও মানিকের উপরে। এত হঠাৎ এই অভাবিত ঘটনাটা ঘটল যে, তারা বাধা দেবার বা একখানা হাত তোলবার সময়টুকু পর্যন্ত পেল না।
তারপর শোনা গেল এক অর্ধ-কর্কশ এবং অর্ধ-কোমল আশ্চর্য কণ্ঠস্বর। একজন মানুষের গলা দিয়ে একসঙ্গেই কথা কইছে যেন দুইজন মানুষ।
–বেঁধে ফ্যালো, ওদের দুজনেরই হাত পিছমোড়া করে বেঁধে ফ্যালো।
কে বললে, বড় অন্ধকার যে! আলো জ্বালবো নাকি?
না, না, খবরদার! আমাদের শ্রীমুখগুলো দর্শনের সৌভাগ্য ওদের আমি দিতে রাজি নই।
একটু পরেই তো ওদের প্রাণপাখি খাঁচাছাড়া হবে। এখন আর ওদের ভয় করবার দরকার কী?
–ভয়! আমি কি ভয় পাবার ছেলে? ভয় নয় রে ভয় নয়, এ হচ্ছে সাবধানতা। জানিস তো, সাবধানের মার নেই!
জয়ন্ত ও মানিকের হাতে পড়ল কঠিন বাঁধন। কারা তাদের টর্চ আর রিভলভার কেড়ে নিলে।
সেই উদ্ভট কণ্ঠস্বর বললে, শোনো মহা-গোয়েন্দা জয়ন্ত! ঘরের ভিতরে আমরা আছি দশজন লোক, আর আমাদের চারজনের হাতে আছে গুলিভরা রিভলভার। তোমরা যদি চেঁচাবার চেষ্টা করো, তাহলে সেই চিৎকার হবে তোমাদের এ-জীবনের সর্বশেষ চিৎকার। অতএব বোবা হয়ে কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে থাকো।
.
আট । ‘দূরাগতশব্দানুকরণবিদ্যা’
অর্ধ-কর্কশ ও অর্ধ-কোমল কণ্ঠস্বর প্রশ্ন করলে, জয়ন্ত, তুমি আমাদের বন্দি করতে চাও?
জয়ন্ত বললে, তুমি হুকুম দিয়েছ আমাদের বোবা হয়ে থাকতে। তবে আবার প্রশ্ন করছ কেন?
–আচ্ছা, নতুন হুকুম দিচ্ছি, তুমি আস্তে-আস্তে কথা কইতে পারো।
কী অনুগ্রহ!
–ব্যঙ্গ রাখো? বলো, তুমি এসেছিলে আমাদের বন্দি করতে?
–তুমি যে-কোনও মহাপুরুষ তা না জেনে কেমন করে বলি তোমাকে আমি বন্দি করতে চাই কি না?
