জয়ন্ত ভাবতে লাগল নীরবে।
প্রথমেই মুখ খুলল মানিকের। সে বললে, আমার কী সন্দেহ হচ্ছে জানো? অপরাধীর সঙ্গীরাও ছিল জনতার ভিতরে। তারাই আগুনে-পোড়া লোকটাকে নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছে দেবে বলে গাড়িতে উঠে চম্পট দিয়েছে। নইলে একটা মরো-মরো মানুষ এমনভাবে হঠাৎ উবে যেতে পারে না।
জয়ন্ত বললে, আমারও মনে হচ্ছে, মানিকের অনুমান সত্য! সুন্দরবাবু, যারা বরেনবাবুকে খুন করেছে, তারা সাধারণ অপরাধী নয়। এমন করে বার বার আমাদের চোখে ধুলো দেবার শক্তি যার-তার হয় না। এ মামলাটার কিনারা করতে হলে আমাদের অনেক কাঠ-খড়ই পোড়াতে হবে দেখছি।
সুন্দরবাবু বললেন, কাঠই বলো আর খড়ই বলো, আজকে আমি আর কোনওকিছুই পোড়াতে রাজি নই বাবা! আমার গোটা দেহটাই পাকা ফোঁড়ার মতন টনটন করছে, এই আমি সবেগে ধাবমান হলুম নিজের বাসার দিকে। এখন সামনে চিনের প্রাচীর থাকলেও আমার গতিরোধ করতে পারবে না।
জয়ন্ত বললে, একটু দাঁড়ান সুন্দরবাবু, একটা কথা।
–এখনও কথা? সকাল থেকে এত ঝুড়ি ঝুড়ি কথা কয়েও তোমার আশ মিটল না, আরও একটা কথা আছে? কী কথা বলো?
কলকাতার শ্মশান আছে তিনটে কাশী মিত্রের ঘাট, নিমতলা আর কেওড়াতলা।
–এটা তোমার আবিষ্কার নয়, একথা সবাই জানে।
–শুনেছেন তো, যে লোকটা আজ আগুনে পুড়েছে তার বাঁচবার সম্ভাবনা কম? যদি সে মারা পড়ে তার দেহ যে-কোনও একটা শ্মশানে নিয়ে যেতে পারে। ওই তিনটে শ্মশানে পাহারার ব্যবস্থা করলে ভালো হয়।
–হুম, দেখা যাবে। আর কোনও কথা নেই তো? আর কোনও কথাই আমি শুনব না কিন্তু!
না সুন্দরবাবু, আপাতত আমার কথা ফুরোল।
সুন্দরবাবুর প্রস্থান। জয়ন্ত ও মানিক বাড়ির পথ ধরলে।
সেইদিনেই বৈকালের পর। জয়ন্তের বাড়ির একটি ঘর।
চায়ের পেয়ালা খালি করে জয়ন্ত বলল, মানিক, এবারের মামলাটা আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।
-কেন?
কারণ প্রথমত, ঘটনাস্থল থেকে কোনও সূত্রই আবিষ্কার করার সুযোগ আমরা পাইনি। দ্বিতীয়ত, কোন উদ্দেশ্যে বরেনবাবুকে খুন করা হয়েছে? তুমি কি তার কোনও শত্রুর কথা জানো?
না।
উদ্দেশ্যহীন হত্যা করে কেবল পাগল।
–কিন্তু আজ আমরা যাদের পাল্লায় পড়েছিলুম, তারা যে পাগল নয়, সে পরিচয় পেয়েছি পদে-পদে।
না, পাগল নয়। তারা অতি সুচতুর ব্যক্তি। কিন্তু কেন তারা বরেনবাবুকে খুন করল?
–আমি কেমন করে বলব?
–তুমি বরেনবাবুর পরিবারবর্গের কথা বলছিলে। তাদের কথা আরও ভালো করে বলো।
বরেনবাবুর দুই বিবাহ। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর আবার তিনি বিবাহ করেন, তার কোনও স্ত্রীরই সন্তান হয়নি।
–মানিক, বরেনবাবুর মাসিক আয় ছিল ছয় হাজার?
হ্যাঁ।
–অর্থাৎ বাৎসরিক বাহাত্তর হাজার টাকা। বড় সামান্য টাকা নয়। এর চেয়ে ঢের কম টাকার জন্যে পৃথিবীতে অনেক নরহত্যা আর রক্তপাত হয়েছে।
মানিক সচমকে বললে, তুমি কি মনে করো, সম্পত্তির লোভেই কেউ বরেনবাবুকে খুন করেছে?
–আপাতত আমি কিছুই মনে করি না। গোড়া থেকেই অন্ধের মতো যে-কোনও একটা সন্দেহের পিছনে ছুটোছুটি করা আমার স্বভাব নয়। এখন আমার মন হচ্ছে নতুন খাতার মতো, যার ওপরে সন্দেহজনক একটি লাইনও লেখা হয়নি। যাক সেকথা। বলো দেখি মানিক, বরেনবাবুর অবর্তমানে তার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে কে?
–খুব সম্ভব তার ছোট ভাই।
বরেনবাবুর আর কোনও আত্মীয় নেই?
–আছেন। দুই বোন! একজন সধবা, একজন বিধবা। তারা দুজনেই থাকেন শ্বশুরবাড়িতে।
বরেনবাবুর ছোট ভাইয়ের নাম কী?
নরেন্দ্রনাথ রায়চৌধুরী। বরেনবাবুর পৈতৃক সম্পত্তির বাকি অর্ধাংশ উত্তরাধিকার সূত্রে তিনিও পেয়েছিলেন।
নরেনবাবুর বয়স কত?
–ত্রিশের বেশি হবে না।
–স্বভাব চরিত্র?
–যতদূর জানি, আর সব দিক দিয়েই ভালোই। অত্যন্ত সরল, সজ্জন, নম্র, বিনয়ী, পরোপকারী। কিন্তু
–থামলে কেন? কিন্তু কী?
ভীষণ তার ঘোড়দৌড়ের নেশা। অধিকাংশ সম্পত্তি তিনি খুইয়েছেন ঘোড়ার পিছনেই। আগে তার নিজেরও রেসের ঘোড়া ছিল।
–আমি বরেনবাবুর সঙ্গে আলাপ করতে চাই।
–তিনি এখন দেশে আছেন।
দাদার মৃত্যুর খবর পেলেই নিশ্চয় তিনি কলকাতায় আসবেন।
–হ্যাঁ। তাঁদের দু-ভায়ের ভিতর অত্যন্ত সদ্ভাব ছিল। দুজনেই দুজনকে ভালবাসতেন।
–আজ থাক এ প্রসঙ্গ। এখন অন্য একটা দরকারি কথা শোনো।
বলো।
–যে লোকটা কাচের জুলন্ত জাগ ছুঁড়েছিল। তার ভাঙা চশমা আর চশমার খাপখানা আমার হস্তগত হয়েছে, জানো তো? চশমার খাপের ভিতরে একটুকরো চিঠি পেয়েছি, এই নাও, তুমিও পড়ে দ্যাখো।
কাগজের ভাঁজ খুলে মানিক পড়লেঃ
বিজয়, আজ রাত ১০টার সময়ে ১০ নম্বর রামবাবুর লেনে আমার সঙ্গে দেখা করতে ভুলো না।
মানিক শুধোলে, রামবাবুর লেন কোথায়?
–বেহালায়। চিঠির তারিখ দেখেছ? বিজয়ের আজই রামবাবুর লেনে যাবার কথা।
–চিঠি যে লিখেছে তার নাম নেই।
–নামটা আমাদেরই আজ আবিষ্কার করতে হবে। অর্থাৎ বিজয় এখন কুপোকাত, সুতরাং তার বদলে আমরা দুজনে আজ সন্ধ্যার পরেই রামবাবুর লেনে যাত্রা করব। কেমন রাজি?
–নিশ্চয়। কিন্তু হুঁশিয়ার। সঙ্গে রিভলভার আনতে ভুলো না যেন।
.
সাত । দশ নম্বর বাড়ি
সন্ধ্যা এবং রাত্রির সন্ধিক্ষণ। কৃষ্ণপক্ষের একটি রাত। প্রথম দিকে খানিকটা ভাঙা চাঁদের আলো ছিল বটে, কিন্তু তারপরেই পৃথিবী ছেয়ে গেল অন্ধকারে। জয়ন্ত কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর আবিষ্কার করলে রামবাবুর লেনের দশ নম্বরকে।
