জয়ন্ত বললে, মানিক, দৌড়ে গিয়ে ফায়ার ব্রিগেড-কে ফোন করে দাও।
দেখতে-দেখতে রাস্তায় জমে উঠল প্রকাণ্ড জনতা। এমন হইচই শুরু হয়ে গেল যে কান পাতা দায়। ছুটোছুটি, হুড়োহুড়ি, ঠেলাঠেলি। সকলের ইচ্ছা আরও কাছে আসে, কিন্তু আগুনের তাতে আরও কাছে আসা অসম্ভব।
ফোন করে এসে মানিক হাঁপাতে হাঁপাতে বললে, ভাই জয়ন্ত, ব্যাপার দেখে হতভম্ব হয়ে গিয়েছি, কেমন করে হল, কিছুই বুঝতে পারছি না।
–প্রথমে আমিও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছিলুম। তবে অগ্নিকাণ্ডের এক মুহূর্ত আগেই আমার সজাগ চোখ দেখেছিল একটা দৃশ্য, আর আমার সজাগ কান শুনেছিল একটা শব্দ। সঙ্গে-সঙ্গে আমিও সাবধান হতে পেরেছিলুম, নইলে এতক্ষণে আমরা কেউই প্রাণে বাঁচতুম না।
–আমি দেখতে কিছুই পাইনি। তবে একটা শব্দ শুনেছিলুম বটে।
কীরকম শব্দ?
কাচের কোনও জিনিস ভাঙার শব্দ?
–ঠিক। কিন্তু তুমি কিছুই দেখতে পাওনি, না মানিক? এতেই বোঝা যাচ্ছে, আমার সঙ্গে-সঙ্গে থেকেও তুমি এখনও পুরোপুরি গোয়েন্দা হতে পারোনি। আদর্শ গোয়েন্দার প্রধান কর্তব্য হচ্ছে, সর্বদা সর্বদিকে পঞ্চেন্দ্রিয়কে সতর্ক বা জাগ্রত রাখা। আমি কি দেখেছিলুম জানো?
বল।
অতর্কিতে একটা মূর্তি দরজার সামনে আবির্ভূত হল–সেই কালো চশমা আর খাকি পোশাক পরা মূর্তি। পরমুহূর্তে সে একটা কাচের জাগ সজোরে ঘরের ভিতরে নিক্ষেপ করলে– জাগটার মুখের কাছটা জ্বলন্ত।
জুলন্ত কাচের জাগ?
–হ্যাঁ। আচ্ছা মানিক, তুমি কোনও গন্ধ পাওনি?
–গন্ধ পাবার সময় দিলে কই? যে হাড়ভাঙা ধাক্কা মেরেছিলে।
ধাক্কা না মারলে তোমরা যে বাঁচতে না ভাই।
কিন্তু গন্ধের কথা কী বলছ?
–আমি একটা গন্ধ পেয়েছি। গ্যাসোলিনের গন্ধ।
মানিক কী জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিল, এমন সময় ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি এসে পড়ল। বরেন্দ্রবাবুর বাড়ি তখন জ্বলছে দাউদাউদাউ। শত-শত অগ্নিশিখা তখন রক্ত-সর্পের মতো সোঁ সোঁ করে ওপরে উঠে যাচ্ছে, যেন আকাশকে ছোবল মারবার জন্যে।
জয়ন্ত ডাকলে, সুন্দরবাবু!
–হুম!
এখন আপনার অবস্থা কেমন?
–প্রায় মারাত্মক। কোনওক্রমে উঠে দাঁড়িয়েছি বটে, কিন্তু শরীরে আর পদার্থ নেই। একটিমাত্র দিনে দুই-দুইবার প্রচণ্ড আছাড় খাওয়া। এই বয়সে হজম করতে পারব কেন ভায়া?
–এ বাড়ির ভিতর থেকে কোনওরকম সূত্র আবিষ্কারের সম্ভাবনা নেই–অগ্নিদেব সমস্তই নিশ্চিহ্ন না করে ছাড়বেন না। ফায়ার ব্রিগেডের কাজের অসুবিধে হবে, আমরা খানিক তফাতে গিয়ে দাঁড়ালেই ভালো হয়।
ভিড় ঠেলে তারা অগ্রসর হল।
সুন্দরবাবু বললেন, কাচের জ্বলন্ত জাগ, গ্যাসোলিন, এ সব কী বলছ জয়ন্ত, আমি যে কিছুই বুঝতে পারছি না!
আমরা সাংঘাতিক শত্রুর পাল্লায় পড়েছি, তারা পদে পদে আমাদের অনুসরণ করছে। আসল ঘটনাস্থলে আমাদের আবির্ভাব দেখেই তারা কেবল ওই বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়নি, আমাদেরও পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করেছে।
কিন্তু কাচের জাগ আর গ্যাসোলিনের গুপ্ত কথাটা কী?
মনে করুন, আপনি একটা কাচের জাগের ভিতরটা গ্যাসোলিনে ভর্তি করলেন। তারপর খালি ন্যাকড়া দিয়ে জাগের মুখটা বন্ধ করলেন। ন্যাকড়ার কতক অংশ পলতের মতো বাইরে বের করে রেখে তাতেও ঢেলে দিলেন গ্যাসোলিন। তখন কাচের জাগটা পরিণত হল মারাত্মক বোমায়।
সুন্দরবাবু সবিস্ময়ে বললেন, বোমায়!
–ঠিক তাই।
তারপর?
–এ বোমা যে ব্যবহার করবে তাকেও রীতিমতো হুঁশিয়ার হয়ে থাকতে হবে। পলিতার অগ্নিসংযোগ করবার পর সময় পাওয়া যাবে মাত্র দুই সেকেন্ড। তার মধ্যে জাগটা নিক্ষেপ করতে না পারলে নিক্ষেপকারীরও বিপদের সম্ভাবনা।
–হুম! এমন বিটকেল বোমার কথা তো জীবনে কখনও শুনিনি!
–শোনা উচিত ছিল। আবিসিনিয়ার অধিবাসীরা ইতালির সঙ্গে যুদ্ধ করবার সময়ে এইরকম বোমাই ব্যবহার করত। আমি ভাবছি, আমাদের মারবার জন্যে যে লোকটা জাগ ছুঁড়েছে, তার কোনও ক্ষতি হয়েছে কিনা।
ভিড়ের ভিতরে দাঁড়িয়ে একটি ভদ্রলোক অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে জয়ন্তের কথা শুনছিলেন। তিনি এগিয়ে এসে বললেন, মশাই ঠিক অনুমান করেছেন। একটু আগে একজন কালো চশমা আর খাকি পোশাক পরা লোক পাগলের মতন ছুটতে ছুটতে পথের ওপরে বেহুশ হয়ে পড়ে যায়, তার সমস্ত পোশাকে আগুন লেগে গিয়েছিল। আমরা কয়জন মিলে তাকে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিয়েছি বটে, কিন্তু সে বাঁচবে বলে মনে হয় না। লোকটা যেখানে পড়ে গিয়েছিল সেইখান থেকে এই ভাঙা চশমা আর একখানা চশমার খাপ কুড়িয়ে পেয়েছি।
ক্ষিপ্রহস্তে জিনিস দুটো গ্রহণ করে জয়ন্ত সাগ্রহে জিজ্ঞাসা করলে, তাকে কোন হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে জানেন?
–জানি, মেয়ো।
জয়ন্ত ফিরে দাঁড়িয়ে উত্তেজিত স্বরে বললে, জাগ্রত হোন সুন্দরবাবু, জাগ্রত হোন। আর এক মিনিট দেরি নয়, এখনি মেয়ে হাসপাতলে ছুটতে হবে।
সুন্দরবাবু বললেন, বাপরে বাপ, আজ আমার সব দম বেরিয়ে যাবে দেখছি। ঘটনার পর ঘটনা–এ যে ঘটনার মহাবন্যা!
.
ছয়। রামবাবুর লেন
গঙ্গার ধারে মেয়ে হাসপাতাল। প্রবেশপথ স্ট্র্যান্ড রোডের ওপর।
জয়ন্ত হাসপাতালের ভিতরে প্রবেশ করল সদলবলে। সেখানে তাদের জন্যে অপেক্ষা করছিল নতুন বিস্ময়!
আগুনে পোড়া কোনও লোককে নিয়ে সেদিন কেউ হাসপাতালে আসেনি।
বোকার মতন মাথা চুলকোতে লাগল জয়ন্ত। কোনও হদিস খুঁজে না পেয়ে আর সকলেও অবাক।
