–না, ঠিক একলা নয়। ঠিকে ঝি আর পাঁচক কাজকর্ম সেরে চলে যেত, বাড়িতে সর্বদাই থাকত নিধিরাম। সে বরেনবাবুর পুরোনো বেয়ারা। খুব বিশ্বাসী।
বরেনবাবু কি বেশ বড় জমিদার? –
-খুব বড় নন, খুব ছোটও নন, মাঝারি।
তাঁর আয় কত জানো?
–ঠিক জানি না। তবে লোকের মুখে শুনেছি, তার মাসিক আয় বোধহয় হাজার ছয় টাকার কম ছিল না।
জয়ন্ত মিনিটখানেক একেবারে চুপ। তারপর বললে, আচ্ছা, বরেনবাবুর সম্বন্ধে বাকি কথা পরে জানলেও চলবে। আপাতত আর সময় নষ্ট করে লাভ নেই, আমাকে বরেনবাবুর বাড়িতে নিয়ে চলো। সুন্দরবাবু আমাদের সঙ্গে আসবেন নাকি?
সুন্দরবাবু নাচারভাবে বললেন, আছাড় খেয়ে বেদম হয়ে পড়েছি। এটা আমার মামলা নয়, যাবার খুব ইচ্ছা নেই। তবে তুমি যখন বলছ–
সকলে পা চালিয়ে দিলে। সেখান থেকে চন্দ্রকান্ত রোড বেশি দুর নয়—
বরেনবাবুর নবনির্মিত অসম্পূর্ণ বাড়ি। একতলার কোনও কাজ বাকি নেই–এমনকী শার্সি-খড়খড়িতে রং পর্যন্ত লাগানো হয়েছে। দ্বিতলে ইট-চুন-সুরকির কাজ শেষ হয়েছে বটে, তবে রঙের মিস্ত্রি এখনও সেখানে হস্তাপণ করেনি। কিন্তু ত্রিতলের অধিকাংশ কাজই অসমাপ্ত। বাড়ির সুমুখে নীচে থেকে ত্রিতল পর্যন্ত দাঁড় করানো রয়েছে বাঁশের ভারা।
সমস্তটার ওপরে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে জয়ন্ত বললে, দেখছি বাড়িখানা এখনও অরক্ষিত অবস্থায় আছে। ওই ভারা বেয়ে বাইরের যে-কোনও লোক বাড়ির ভিতরে ঢুকতে পারে। এমন বাড়িতে বাস করা উচিত নয়।
সদর দরজার কাছে দাঁড়িয়ে মানিক হাঁকলে, নিধিরাম। অনিধিরাম!
একজন মাঝবয়সি লোক বাইরে এসে দাঁড়াল। রং প্রায় কালো, হৃষ্টপুষ্ট গড়ন, খালি গা খালি পা। কিন্তু তার মুখের ভাব দুশ্চিন্তাগ্রস্ত।
মানিককে দেখেই সে ব্যগ্রভাবে বললে, মানিকবাবু এসেছেন? আপনি বলতে পারেন, আমাদের বাবু কোথায় আছেন?
মানিক বললে, ব্যস্ত হোয়ো না নিধিরাম, সব কথা পরে বলছি। আগে তুমি সব কথা বলো দেখি।
নিধিরাম প্রথমে পাহারাওলাদের দিকে সন্দেহপূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে। তারপর বললে, কাল রাত দশটার পর খাওয়া-দাওয়া সেরে বাবু তার ঘরের ভিতরে শুতে যান, আমিও খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়ি। তারপর আজ ভোরে উঠে এসে দেখি, বাবুর ঘরের দরজা খোলা, বাবুও ঘরের ভিতরে নেই। বাবু তো বেলা আটটার আগে বিছানা ছেড়ে ওঠেন না, আজ এত সকালে তার ঘুম ভেঙেছে দেখে অবাক হয়ে গেলুম। সদর দরজাটাও ভোলা দেখে বুঝলুম, নিশ্চয়ই তিনি বাড়ির বাইরে বেরিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু মানিকবাবু, এখন বেলা বারোটা বেজে গিয়েছে, এখনও বাবু বাড়িতে ফিরে আসেননি। আপনি কি বাবুর খবর জানেন? আপনার সঙ্গে পুলিশ কেন? বাবু কি কোনও বিপদে পড়েছেন?
জয়ন্ত এগিয়ে গিয়ে বললে, সেসব কথা পরে হবে নিধিরাম। এখন বাবুর শোবার ঘরে আমাদের নিয়ে চলো দেখি।
নিধিরাম রাস্তার ধারের একখানা ঘরের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বললে, বাড়ির ওপরটা তো এখনও তৈরি হয়নি, বাবু তাই ওই বৈঠকখানাতেই শুয়ে রাত কাটিয়ে দেন।
–বেশ, তাহলে ওই ঘরখানাই আমরা দেখতে চাই।
নিধিরামের পিছনে-পিছনে সকলে সদর দরজা দিয়ে বাড়িতে ঢুকে বৈঠকখানায় ভিতরে প্রবেশ করলে।
বেশ বড়সড় ঘর। মেঝের ওপরে কার্পেট পাতা। দিকে দিকে টেবিল, চেয়ার, সোফা কৌচ। দুটো কেতাবের আলমারি। দুদিকের দেয়ালের গায়ে দুখানা ফ্রেমে বাঁধানো বড় আয়না। ঘরের এক কোণে একখানা ক্যাম্পখাট পাতা।
জয়ন্ত শুধোলে, তোমার বাবু কি খাটেই শুতেন?
নিধিরাম বললে, আজ্ঞে হ্যাঁ।
জয়ন্ত পায়ে পায়ে এগিয়ে চলল সেই দিকে।
অকস্মাৎ সকলকে চমকে দিয়ে ঘরের ভিতর দুম করে একটা অদ্ভুত শব্দ হল এবং সঙ্গে-সঙ্গে এখানে-ওখানে দেখা গেল অভাবিত অগ্নিশিখার আরক্ত নৃত্য।
.
পাঁচ। গ্যাসোলিন
প্রথমেই দাঁড়িয়েছিল জয়ন্ত। তার পিছনে নিধিরাম এবং তার পিছনে একসঙ্গে সুন্দরবাবু ও মানিক।
বিদ্যুৎবেগে ফিরে দাঁড়িয়ে জয়ন্ত তার বলিষ্ঠ বাহুর দ্বারা প্রায় একসঙ্গেই তাদের তিনজনকে মারলে এমন প্রচণ্ড ধাক্কা যে ঘরের দরজার ভিতর দিয়ে ঠিকরে তারা হুড়মুড় করে একেবারে বাইরে গিয়ে আছাড় খেয়ে পড়ল।
পড়তে-পড়তেই মানিকের সচকিত দৃষ্টি দেখলে, তার পাশে শূন্যপথে এসে হাজির হল জয়ন্তর দেহও।
মাটিতে পড়েই জয়ন্ত ও মানিক আবার দাঁড়িয়ে উঠল চোখের নিমেষে।
বরেনবাবুর বৈঠকখানায় ভিতরটা তখন পরিণত হয়েছে একটা বিশাল চুল্লিতে। হু-হু রাঙা আগুন এবং কালো কুচকুচে ধোঁয়া ঘরের ভিতরটা একেবারে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে এবং দরজা জানলার ভিতর দিয়েও বাইরে বেরিয়ে আসছে ক্রুদ্ধ লকলকে অগ্নিশিখার পর অগ্নিশিখা, ধোঁয়াকুণ্ডলীর পর ধোঁয়াকুণ্ডলী। চারিদিকে এমনি ভীষণ উত্তাপ যে, সেই ভয়াবহ অগ্নিগৃহের বাইরে থেকেও সকলের দেহ যেন পুড়ে ঝলসে যাবার মতো।
জয়ন্ত চিৎকার করে ডাকলে, সুন্দরবাবু, সুন্দরবাবু! শিগগির বাড়ির বাইরে বেরিয়ে চলুন।
তখনও ভূতলশায়ী সুন্দরবাবু দুই একবার ওঠবার জন্যে ব্যর্থ চেষ্টা করে যন্ত্রণাবিকৃত কণ্ঠে বলে উঠলেন, কোমর ভেঙে গিয়েছে আমার কোমর ভেঙে গিয়েছে। আমি আর উঠতে পারছি না যে!
জয়ন্ত ও মানিক তখন সুন্দরবাবুকে চ্যাংদোলা করে বাড়ির বাইরে নিয়ে এল। নিধিরাম এর মধ্যেই পালিয়ে রাস্তায় গিয়ে হাজির হয়েছিল।
