তখনও সেখানে কয়েকজন লোক দাঁড়িয়েছিল। দু-চার জনকে জিজ্ঞাসা করতেই জানা গেল যে ষাঁড়ের লড়াইয়ের জন্যে রাজপথে যখন মিথ্যা আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছিল, সেই সময়ে হঠাৎ একখানা জিপগাড়ি এসে মৃতদেহটা তুলে নিয়ে চলে গিয়েছে। খবরটা যে দিলে, সেই রাস্তার ধারে তার একখানা পানের দোকান আছে।
সুন্দরবাবু বললেন, তুমি কীরকম লোক হে বাপু? ও-সব দেখেও চুপ করে রইলে?
দোকানদার বললে, কেমন করে বুঝব হুজুর? আমি ভেবেছিলুম তারা সেপাই।
–তাদের পরনে সেপাইয়ের পোশাক ছিল?
–হ্যাঁ হুজুর!
তারা কজন ছিল?
–তিনজন।
জয়ন্ত শুধোলে, তাদের চোখে কি কালো চশমা ছিল?
–হ্যাঁ হুজুর।
একটা লোক খুব ঢ্যাঙা আর খুব রোগা?
আজ্ঞে হ্যাঁ। আর তার মাথায় ছিল ঝাঁকড়া চুল।
জয়ন্ত ও মানিক অর্থপূর্ণ দৃষ্টি বিনিময় করলে।
সুন্দরবাবু বললেন, তুমি জিপগাড়িখানার নম্বর দেখেছ? দেখোনি? তুমি হচ্ছ একটি আস্ত গাধা।
–আজ্ঞে, আমি ইংরেজি পড়তে পারি না।
–পারো না, তাহলে তুমি যে-সে গাধা নও, একটি আস্ত মুখ্যু গাধা।
লোকটি হাতজোড় করে বললে, আজ্ঞে, হুজুর যা বলেন।
জয়ন্ত বললে, জিপগাড়িখানা কোন দিকে গিয়েছে সেটা বলতে পারবে তো।
–আজ্ঞে, সামনের ওই রাস্তা ধরে।
–মানিক, ওটা তো গঙ্গায় যাবার রাস্তা।
হ্যাঁ।
–তা হলে আমার বিশ্বাস লাশটা তারা গঙ্গাজলে বিসর্জন দেবে। শিগগির চলো।
–কোথায়?
–গঙ্গার ধারে।
সুন্দরবাবু বললেন, জয়ন্ত, তুমি কি মনে কর আমার হাতে আত্মসমর্পণ করবার জন্যে তারা এখনও গঙ্গার ধারে বসে আছে?
বসে থাক না থাক, ওদিকে একবার যেতে দোষটা কী?
মানিক অঙ্গুলিনির্দেশ করে বললে, জয়ন্ত, জয়ন্ত। গঙ্গার দিক থেকে একখানা জিপগাড়ি খুব বেগে এই দিকেই আসছে না?
হুঁ! আরে আরে, গাড়ির ভিতরে বসে আছে যে আমাদের সেই কালো-চশমা পরা বন্ধু লোকেরাই। বাহবা কি বাহবা!
.
চার। অগ্নিশিখার নাচ
সুন্দরবাবু চারজন পাহারাওয়ালা নিয়ে পথরোধ করে দাঁড়ালেন। এগিয়ে গেল জয়ন্ত ও মানিক।
জিপগাড়িখানা কোনওরকম ইতস্তত না করেই ছুটে আসতে লাগল। গাড়ির আরোহীদের মধ্যেও কোনওরকম চাঞ্চল্য দেখা গেল না। নির্ভয়ে তারা বসে আছে পাথরের মূর্তির মতো।তাদের ভাব দেখলে মনে হয়, পথজোড়া এই জনতা যেন তাদের দৃষ্টিগোচরই হয়নি।
গাড়ি খুব কাছে এসে পড়তেই, সুন্দরবাবু দুই বাহু শূন্যে তুলে হুকুমের স্বরে বললেন, গাড়ি থামাও। গাড়ি থামাও।
কোনওরকম জানান না দিয়েই গাড়ির গতি বেড়ে গেল আচম্বিতে। পাঞ্জাব মেলের ইঞ্জিনকে হার মানিয়ে গাড়িখানা এমন অপ্রত্যাশিতভাবে ভোঁ-দৌড় মারলে যে সুন্দরবাবু প্রাণ বাঁচাবার জন্যে পিছনদিকে মস্ত এক লম্ফ ত্যাগ করে নিজের বিপুল উঁড়ির ভারে টাল খেয়ে দড়াম করে হলেন প্রপাত ধরণীতলে। জয়ন্ত, মানিক ও অন্যান্য লোকেরাও কোনও-গতিকে গাড়িচাপা পড়তে-পড়তে বেঁচে গেল এ যাত্রা।
চোখের পলক ফেলতে না ফেলতে রিভলভার বার করে জয়ন্ত ফিরে দাঁড়াল এবং সেই উল্কাগতিতে ধাবমান জিপগাড়ি টায়ার লক্ষ্য করে বারকয়েক গুলি ছুড়লে।
কিন্তু জিপখানা এর মধ্যেই রিভলভারের নাগালের বাইরে গিয়ে পড়েছে, এবং পরমুহূর্তেই মোড় ফিরে চলে গেল একেবারে চোখের আড়ালে।
মানিক বললে, আমি কিন্তু গাড়িটার নম্বর দেখে নিয়েছি।
জয়ন্ত বললে, নম্বর হয়তো কোনও কাজেই লাগবে না। খুব সম্ভব ওরা আসল নম্বর ব্যবহার করেনি।
সুন্দরবাবু তখন উঠে পথের উপরেই দুই পা ছড়িয়ে বসে আছেন। কাতর মুখে তিনি মাথার পিছন দিকটায় হাত বুলিয়ে হাতখানা চোখের সামনে ধরে করুণ স্বরে বললেন, ভেবেছিলাম মাথাটা ফেটে গিয়েছে, এখন দেখছি ফাটেওনি, রক্তও পড়ছে না! হুম!
মানিক বললে, সুন্দরবাবু আপনার পক্ষে মাথার চেয়ে প্রয়োজনীয় হচ্ছে, আপনার স্ফীতোদরটি। মাথা ফাটলেও আপনি পটল তুলবেন না, কিন্তু ভুড়ি ফেঁসে গেলে একেবারেই সর্বনাশ! দেখুন দেখুন, সর্বাগ্রে ভুড়িটা পরীক্ষা করে দেখুন।
চেষ্টা করে রাগ সামলে সুন্দরবাবু বললেন, থামো হে ফাজিল, থামো! আমার ভুড়ির ভাবনা ভেবে তোমাকে আর মস্তক ব্যথিত করতে হবে না। নিজের চরকায় তেল দাও।
মানিক বললে, চরকা? আমার চরকা নেই। আমি গান্ধিজিকে মানি বটে, কিন্তু তার চরকা মানি না।
হুম তা মানবে কেন? তোমরা আজকালকার ছেলেরা যে কমিউনিস্ট!
কমিউনিস্ট কাদের বলে সুন্দরবাবু? আমাদের নেতাদের বক্তৃতা শুনলে সন্দেহ হয়, আগেকার টেররিস্টরাই এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে কমিউনিস্ট। এ কথা কি সত্য!
–যাও ছোকরা যাও! মরছি নিজের গায়ের ব্যথায়, এখন উনি এলেন কিনা রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতে। বলতে-বলতে উঠে দাঁড়ালেন সুন্দরবাবু।
জয়ন্ত বললে, মানিক বাজে কথা ছাড়ো! আমার কথার জবাব দাও। তুমি বরেনবাবুর বাড়ি চেনো?
নিশ্চয় চিনি, তিনি যে আমার বন্ধু। চন্দ্রকান্ত রোডে জায়গা কিনে তিনি নতুন একখানা বাড়ি তৈরি করছিলেন। বাড়িখানার কেবল একতলাই বাসযোগ্য হয়েছে। যুদ্ধের বাজারে মালপত্র দুষ্প্রাপ্য হওয়াতে দোতলা আর তেতলা এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। বরেনবাবু আপাতত একতলাতেই বাস করতেন।
তার পরিবারবর্গ আছেন?
–আছেন বইকী! কিন্তু অসম্পূর্ণ বাড়িতে স্থানাভাব বলে তারা এখন দেশে আছেন।
–তাহলে কলকাতার এই বাড়িতে বরেনবাবু একাই থাকতেন।
