সুন্দরবাবু তাঁর বিখ্যাত টাক চুলকাতে, বললেন, হুম! খুনি মড়ার ওপরে করেছে খড়গাঘাত?
নিশ্চয়!
–কিন্তু কেন?
–লোকের চোখে ধুলো দেবার জন্যে। বরেনবাবুর শবব্যবচ্ছেদ করলেই খুব সম্ভব জানা যাবে যে, আগে তাঁকে বিষপ্রয়োগ করে হত্যা করা হয়েছে। খুনি তারপর মড়ার ওপরে ছোরা মেরে লাশটাকে রাস্তায় বহন করে এনে ফেলে রেখে গিয়েছে। এখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চলছে বীভৎস সমারোহে শহরের পথে-পথে মৃতদেহের ছড়াছড়ি, পুলিশ বিশেষভাবে কোনও মৃতদেহ নিয়ে তদন্ত করে না, লাশগুলিকে গাদায় ফেলে শ্মশানে বা গোরস্থানে পাঠিয়ে দেয়, এ ক্ষেত্রেও হয়তো এর বেশি আর কিছুই হবে না। সুন্দরবাবু, এই খুনি বা খুনিরা অত্যন্ত সুচতুর, তাই
জয়ন্তের কথা শেষ হতে না হতেই খানিক তফাতে উঠল বিষম গণ্ডগোল। দলে দলে লোক চারিদিকে প্রাণপণে ছুটোছুটি করে পালাতে লাগল পাগলের মতো। আবার আর একদল লোক লাঠি ও অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আস্ফালন করতে করতে বেগে ধাবমান হল একদিকে।
সুন্দরবাবু তার রিভলভার বার করে বললেন, এসো জয়ন্ত, এসো মানিক, ব্যাপারটা কী দেখা যাক! এই সেপাইরা, তোমরাও এসো।
কিন্তু খানিক দূর অগ্রসর হয়েই দেখা গেল, ব্যাপারটা কিছুই নয়। দুটো ষাঁড় লড়াই করছে, তাই দেখে কয়েকজন ছুটে নিরাপদ ব্যবধানে সরে আসবার চেষ্টা করেছে, এবং সঙ্গে সঙ্গে রাজপথের বিপুল জনতা অকারণ আতঙ্কে অভিভূত হয়ে সৃষ্টি করেছে এই মিথ্যা বিভীষিকা।
জয়ন্ত, মানিক ও সুন্দরবাবু আবার ফিরে এলেন যথাস্থানে।
মানিক সবিস্ময়ে বলল, একী! বরেনবাবুর মৃতদেহ কোথায়?
জয়ন্ত তিক্ত হাসি হেসে বললে, তোমার প্রশ্নের উত্তর খুব সোজা।
খুনিরা এইখানেই হাজির ছিল, তাদের হিসাব ভুল হয়েছে দেখে প্রথম সুযোগেই লাশ তারা সরিয়ে ফেলেছে।
.
তিন। জিপ গাড়ি
সুন্দরবাবু হতভম্বের মতো বললেন, দুমিনিট পিছু ফিরতে না ফিরতেই সদর রাস্তা থেকে লাশ লোপাট। এমন আজব ব্যাপার আমি তো আর কখনও দেখিনি বাবা!
মানিক বললে, আমরা যখন বরেনবাবুর মৃতদেহের কাছে দাঁড়িয়ে কথা কইছিলুম, তখন সেখানে বেশ একটি ছোটখাটো জনতার সৃষ্টি হয়েছিল। লাশ যারা সরিয়েছে তারা সেই জনতার ভিতরেই ছিল বলে সন্দেহ হচ্ছে।
জয়ন্ত বললে সন্দেহ নয় মানিক, এইটেই হয়েছে সত্য। আচ্ছা, তুমি কি সেই ভিড়টা লক্ষ করেছিলে?
না। বন্ধুর মৃতদেহ দেখে আমি এতটা অভিভূত হয়েছিলুম যে অন্য কিছু লক্ষ করবার মতো মনের অবস্থা ছিল না।
আমি কিন্তু লক্ষ করেছিলুম। ভিড়ের ভিতরে ছিল তিনজন কালো চশমা পরা লোক।
সুন্দরবাবু বললেন, আরে হুম! কালো চশমা-পরা লোক দেখলেই সন্দেহ করতে হবে, এমন কথার কোনওই মানে হয় না। এই তো আমি এখন কালো চশমা পরে আছি। কিন্তু তুমি কি বলতে চাও আমি হচ্ছি সন্দেহজনক ব্যক্তি!
মানিক ভুরু নাচিয়ে বলল, হ্যাঁ, আমি ঠিক ওই কথাই বলতে চাই।
–মানে!
পুলিশের লোক বললেই বুঝতে হবে পয়লা নম্বরের সন্দেহজনক ব্যক্তি।
সুন্দরবাবু হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠলেন, চোপরাও মানিক, চোপরাও! খামোখা টিপ্পনি কেটে আমাকে চটাবার চেষ্টা কোরো না। বাজে ফাজলামি ভালো নয়, পারো তো কাজের কথা বলো।
জয়ন্ত বললে, আমার সন্দেহের কারণ বলি শুনুন। প্রথমত, কোনও ছোট ভিড়ে একখানা কালো চশমাই যথেষ্ট। কিন্তু একসঙ্গে তিনখানা কালো চশমা কি অল্পবিস্তর অসাধারণ নয়? দ্বিতীয়ত, ওই তিনজন কালো চশমা পরা লোকেরই সাজ ছিল একরকম–খাঁটি সার্ট হাফ প্যান্ট আর বুট জুতো, দেখলেই মনে হয় যেন তারা ফৌজের সেপাই। এটাও আমি লক্ষ করেছিলুম যে, তাদের একজন হচ্ছে, অতিরিক্ত ঢ্যাঙা আর অতিরিক্ত রোগা। তার মাথার চুল বেশ লম্বা, প্রায় কাধ পর্যন্ত এসে পড়েছিল।
মানিক চমৎকৃতভাবে বললে, শবদেহ পরীক্ষা করতে করতেও তুমি এত ব্যাপার লক্ষ করেছিল? তাকে দেখলে আবার চিনতে পারবে?
–নিশ্চয়ই পারব! তুমি কি জানো না মানিক, সত্যিকার গোয়েন্দাদের থাকে সেইরকম চক্ষু ইংরেজিতে যা ক্যামেরা আই নামে বিখ্যাত? এরকম চোখে পড়ে যে কোনও দৃশ্য, তা চিরস্থায়ী হয়ে যায়।
সুন্দরবাবু বিরক্তিভরে ভূ-সঙ্কোচ করে বললেন, ওসব চোখ-টোখের কথা এখন থো করো বাপু! আমার কথা হচ্ছে, এই অদ্ভুত লাশ চুরির অর্থটা কী?
জয়ন্ত বললে–অর্থ খুবই স্পষ্ট। অপরাধীরা ভেবেছিল এই ব্যাপারটা সাম্প্রদায়িক খুনের মামলা বলে চালিয়ে দেবে। শেষ পর্যন্ত কোথাকার জল কোথায় গড়ায় তা দেখবার জন্যে তারা এখানে অপেক্ষা করছিল। তারা দেখল, আমি তাদের অতিচালাকি ধরে ফেলেছি। সুতরাং লাশ যে শবব্যবচ্ছেদাগারে পাঠানো হবে আর পুলিশ যে শবব্যবচ্ছেদাগারের রিপোর্ট পেয়ে মামলার ভার গ্রহণ করবে, এটা বুঝতেও তাদের বিলম্ব হয়নি।
–শবব্যবচ্ছেদাগারের রিপোর্টে কী থাকত?
–ঠিক কী থাকত তা আমি বলতে পারি না। তবে এটুকু নিশ্চয়ই জানা যেত যে বরেন্দ্রবাবুকে আগে বিষ খাইয়ে বা অন্য কোনও উপায়ে হত্যা করে পরে তার মৃতদেহের ওপরে অস্ত্রাঘাত করা হয়েছে।
মানিক বললে, কিন্তু একটা গোটা মৃতদেহ হজম করা তো সহজ নয়।
জয়ন্ত বললে, এই দাঙ্গার বাজারে সবই সহজ। কিন্তু আপাতত ও সব কথা থাক। এখন দেখা যাক কী উপায়ে লাশটা সরিয়ে ফেলা হয়েছে সেটা জানতে পারা যায় কি না!
