সেই জাহাজে যিনি ছিলেন প্রধান, তার নাম হচ্ছে চন্দ্রসেন। তিনি কেবল সাহসী যোদ্ধাই ছিলেন না। নানা শাস্ত্রে তাঁর পাণ্ডিত্য ছিল অসাধারণ। বৈজ্ঞানিক রহস্য নিয়ে সর্বদাই আলোচনা করতেন। এমন সব ব্যাপার তিনি জানতেন, তোমাদের এখনকার বড় বড় পণ্ডিতও যার কোনওই খবর রাখেন না।
মানুষের দেহ আর মনকে উন্নত করে তাকে সর্বাঙ্গসুন্দর করে তোলবার এক গুপ্ত পদ্ধতি তিনি আবিষ্কার করেছিলেন। সে-পদ্ধতি এখানে ব্যাখ্যা করলেও তুমি বুঝতে পারবে না, তা বড়ই জটিল। সে-রহস্য জানবার জন্যে যদি তোমার কৌতূহল হয়, তাহলে এখানকার জাদুঘরে গিয়ে দ্যাখো।
জাহাজে যেসব সঙ্গীরা ছিল, চন্দ্রসেন তাদের নিয়েই নিজের পদ্ধতিটিকে পরীক্ষা করতে লাগলেন। সেই পরীক্ষার ফলেই আমাদের সৃষ্টি হয়েছে।
সুতরাং বুঝতেই পারছ, আমরা একসময়ে ছিলুম তোমাদেরই মতন বাঙালি এবং সেকেলে মানুষ। কিন্তু আমরা এখন তোমাদের মতন অক্ষম আর অসম্পূর্ণ মানুষ নই। আমাদের মন দেহের চাকর নয়, আমাদের মন দেহের প্রভু! আমাদের দেহে একখানাও হাড় নেই, কারণ তা অনাবশ্যক। এই দেহ নিয়ে আমরা যা খুশি করতে পারি,কমলা বোধহয় তার দু-একটা দৃষ্টান্ত তোমাকে না দেখিয়ে ছাড়েনি? তোমাদের মতন আমাদের brain অর্থাৎ মগজ, খুলির ভিতরে চেপটে বন্দি হয়ে থাকে না। সে সম্পূর্ণ স্বাধীন। তাই দেহের ওপরে আমাদের অবাধ অধিকার। আমার এই একখানা মুখকে আমি কতরকম করতে পারি–দ্যাখো! (এই বলে পণ্ডিতমশাই কতগুলো এমন ভীষণ ভীষণ নমুনা দেখালেন যে, আমার সর্বাঙ্গ ছমছম করতে লাগল!) যখন যতগুলো দরকার, তখন ততগুলো হাত আর পা আমরা সৃষ্টি করতে পারি! (এই বলে পণ্ডিতমশাই আমার বিস্মিত চোখের সামনে দুকুড়ি হাত-পা বার করে নেড়েচেড়ে দেখালেন!) আমি তোমার মতন ধীরে ধীরে হাঁটতেও পারি, আবার দরকার হলে দৌড়ে মোটরগাড়িকেও হারাতে পারি। আমি কতকাল বাঁচব, সেটাও আমার নিজের ইচ্ছার ওপরে নির্ভর করে।
রাবণ রাজা থাকতেন লঙ্কাদ্বীপে–অর্থাৎ সিংহলে। তার দশ মুণ্ড আর বিশখানা হাত ছিল। আবার দরকার হলে তিনি সাধারণ মানুষের রূপ ধারণ করতে পারতেন। রাবণ রাজার ভাই কুম্ভকর্ণের দেহ ছিল তালগাছের চেয়েও উঁচু। এসব হচ্ছে দেহের ওপরে মনের প্রভুত্বের দৃষ্টান্ত। তোমরা হচ্ছ সাধারণ মানুষ। তাই এসব ব্যাপারকে গাঁজাখুরি বলে উড়িয়ে দাও। কিন্তু এ হচ্ছে তোমাদেরই বোকামি। রামায়ণ ও মহাভারত যাঁদের লেখা, তারা কোনওকালে গাঁজা খেতেন বলে প্রমাণ নেই।
খুব সম্ভব রাবণ রাজার দেশে গিয়েছিলেন বলেই চন্দ্রসেন সর্বাঙ্গসম্পূর্ণ মানুষ সৃষ্টি করবার গুপ্ত পদ্ধতিটা আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন। তখনও সিংহলের কোনও কোনও পণ্ডিত হয়তো ওই গুপ্ত পদ্ধতি নিয়ে নাড়াচাড়া করতেন। এ-পদ্ধতি এখন খালি আমরাই জানি। তুমি যদি আমাদের সঙ্গে কিছু কাল থাকো, তাহলে তুমিও হয়তো অনেক নতুন জ্ঞান অর্জন করতে পারবে!
অমল, আজ আর বেশি কিছু বলব না। একদিনে বেশি কথা শুনলে তোমার অসম্পূর্ণ ছোট মগজ হয়তো গুলিয়ে যাবে। আজ এই পর্যন্ত। এসো আমার সঙ্গে!
পণ্ডিতমশাইয়ের সঙ্গে আমি পাশের ঘরে গিয়ে হাজির হলুম। সেখানে দু-খানা জলচৌকির মতন ছোট ছোট টেবিলে রাশিকৃত ফলমূল সাজানো রয়েছে। পণ্ডিত তার পিপে দেহের একদিকটা। মাটির ওপরে বসিয়ে পা তিনখানা ভিতরে ঢুকিয়ে নিয়ে বললেন, বোসো অমল, খেতে বোসো। আমরা খাওয়াদাওয়ায় বেশি সময় নষ্ট করি না। বলেই তিনি অজগর সাপের মতন মস্ত একটা হাঁ করে মিনিট দুয়েকের মধ্যে প্রায় একঝুড়ি ফল উদরস্থ করে ফেললেন। তারপর জলপান করে বললেন, ব্যাস, খাওয়া তো হল,–এইবারে ওঠো!
খাওয়া হল না ছাই হল! এঁরা খাওয়াদাওয়ায় বেশি সময় নষ্ট না করতে পারেন, কিন্তু দু-মিনিটে যারা দশজন লোকের খোরাক গপগপ করে গিলে ফেলতে পারে, তাদের আর বেশি সময়ের দরকার কী? এই চাঁদমুখো পণ্ডিতের সঙ্গে খেতে বসলে আমাকে উপোস করে মরতে হবে দেখছি! তাড়াতাড়ি করেও দু-মিনিটে আমি দুটো আপেল পার করতে পারলুম না। কী আর করি, পণ্ডিত যখন চোখ বুজে জলপান করেছিলেন, তখন আমি, গোটাকয়েক ফল টপটপ করে পকেটে পুরে ফেললুম!
পণ্ডিত মুখ মুছতে-মুছতে বললেন, বেশি খেলে মগজ ভোতা হয়ে যায়। তাই আমি নামমাত্র খাই। কিন্তু আমাদের দেশেও এমন অনেক নিরেট বোকা আছে, যারা মনে করে বেশি খেলে দেহের তেজও বেশি হয়। এদের বুদ্ধির গলায় দড়ি। ওই যে, নাম করতে করতেই ওই দলের একটি নির্বোধ আমাদের দিকেই আসছে!
ফিরে দেখি, প্রকাণ্ড একজন পিপে-মানুষ হেলেদুলে হাঁসফাস করতে করতে এদিকেই এগিয়ে আসছে। তার পিপেটা এমন ভয়ানক মোটা যে ওর মধ্যে পণ্ডিতের মতন দু-দুজন লোকের ঠাঁই হতে পারে। তার মুখখানাও সবচেয়ে বড় বারকোসের মতন। কপালে গালে বড়ির মতন বড় বড় আঁচিল আর তার ঠোঁটে এমনি ন্যাকামি মাখানো হাসি যে দেখলেই গা যেন জ্বলে যায়! লোকটাকে মোটেই আমার পছন্দ হল না!
সে এসে একবার সবিস্ময়ে আমার আপাদমস্তক দেখে নিয়ে বললে, প্রিয় পণ্ডিতমশাই, এই বুঝি সেই জীবটা? বটে! আমি এটাকেই দেখতে এসেছি।
পণ্ডিত বললেন, এই ভদ্রলোকের নাম শ্রীঅমলকুমার সেন, নিবাস বাংলাদেশ! ভোম্বল, এঁর সম্বন্ধে তুমি ওরকম ভাষায় কথা কোয়ো না!
