জয়ন্ত দেহের পাশে বসে পড়ল। তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ ধরে পরীক্ষা করলে ক্ষতচিহ্নটা। তারপর গম্ভীর স্বরে বললে, মানিক, আমার বিশ্বাস, এই ভদ্রলোক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামায় মারা পড়েননি। এ হচ্ছে সাধারণ হত্যাকাণ্ড। কেউ একে অন্য জায়গায় খুন করে পুলিশকে ঠকাবার জন্যে এখানে এনে ফেলে রেখে গেছে।
.
দুই । মড়ার ওপরে খড়্গাঘাত
বরেনবাবুর মৃতদেহ নিয়ে আরও ভালো করে পরীক্ষায় নিযুক্ত হল জয়ন্ত।
হঠাৎ পিছন থেকে উৎসাহিত কণ্ঠে শোনা গেল, আরে হুম! মানিক নাকি?
ইন্সপেক্টর সুন্দরবাবুর কণ্ঠস্বর। ফিরে দাঁড়িয়ে মানিক বললে, এত সকালে সুন্দরবাবু রাস্তায় যে? প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছেন বুঝি?
সুন্দরবাবু এগিয়ে আসতে-আসতে বললেন, হেঁঃ, প্রাতঃভ্রমণেই বেরিয়েছি বটে। পুলিশের চাকরি নিয়ে আমরা কি আর মনুষ্য-পদবাচ্য আছি! আমরা শকুনি হে, শকুনি! যেখানে মড়া, সেইখানেই আমরা। রাজপথ হয়েছে আজ মড়কের বিছানা, আমরা কি এখানে না এসে থাকতে পারি? আরে কে ও, জয়ন্ত যে! তোমার সামনে একটা মড়া! বাপ, তুমি তো আর পুলিশে চাকরি করো না, তবে শখ করে মড়া ঘাঁটতে বেরিয়েছ কেন?
জয়ন্ত জবাব দিলে না, মুখও তুললে না।
মানিক বললে, সুন্দরবাবু, এই মৃতদেহটি আমার এক বন্ধুর। ইনি আনন্দপুরের জমিদার, নাম বরেন্দ্রসুন্দর রায়চৌধুরী।
–শুনে দুঃখিত হলুম। কিন্তু উপায় কী আর আছে ভাই? দেশে সাংঘাতিক ভ্রাতৃঘাতী হানাহানি বেঁধেছে, তোমার-আমার কত বন্ধুকেই যে আত্মদান করতে হবে তা কে জানে?
মানিক বললে, না সুন্দরবাবু, জয়ন্ত বলছে বরেন্দ্রবাবু সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামায় মারা পড়েননি।
–বটে, বটে। জয়ন্ত এমন কথা বলছে কেন?
–তার মতে কেউ এঁকে অন্য জায়গায় খুন করে এখানে এনে ফেলে রেখে গিয়েছে।
খুনির এতটা পরিশ্রম করবার কারণ কি?
–খুনি পুলিশকে ঠকাতে চায়। ব্যাপারটা সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ড বলে চালিয়ে দিতে পারলে পুলিশ জোর-তদন্ত না করতেও পারে।
লাশের গায়ে কি খুনির মনের কথা লেখা আছে?
–আমি জানি না। জয়ন্তকে জিজ্ঞাসা করুন।
কী হে জয়ন্ত, তুমি মিশরের মমির মতো চুপ মেরে আছ কেন? মানিকের কথা কি সত্য?
জয়ন্ত উঠে দাঁড়িয়ে বললে, হ্যাঁ।
–এই ভদ্রলোক এখানে মারা পড়েননি?
–না।
–কেমন করে জানলে?
জয়ন্ত বললে, প্রথমত ইনি যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মারা পড়েননি, খুব সহজেই সে সন্দেহ হয়। ইনি হিন্দু আর এটা হচ্ছে একেবারে হিন্দু পাড়া। এখানে হঠাৎ কোনও মুসলমান এসে একে হত্যা করতে পারে না। অন্য কোথাও খুন করে মুসলমানরা যে হিন্দু পাড়ায় এসে লাশ ফেলে যেতে সাহস করবে, তাও মনে হয় না। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় রাস্তায় রাস্তায় কেউ যদি মারা যায়, তাকে নিয়ে বেশি মাথা ঘামাবার দরকার হয় না।
–এ কথা মানি।
–তারপর শুনুন। আমি মৃতদেহ ভালো করে পরীক্ষা করেছি। বাঁ-দিকের দ্বিতীয় আর তৃতীয় পাঁজরার মাঝখানে কেউ ছোরা দিয়ে আঘাত করেছে। ছোরা প্রবেশ করেছে স্টার্নাম বা বুকাস্থির খুব কাছেই। ওই রকম আঘাতে মৃত্যু হয় প্রায় মুহূর্তের মধ্যেই। কিন্তু সে আঘাতে বরেন্দ্রবাবু মারা পড়েননি।
তবে? মৃতদেহে তো আর কোনও আঘাতেরই চিহ্ন দেখছি না!
–আগে আমার সব কথা শুনুন। অস্ত্রে কেবল বাঁ পাশের ফুসফুসই জখম হয়নি, দেহের দুটো প্রধান ধমনীও–পালমনারী, আর অ্যাওর্টা–আংশিকভাবে দুইভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে। অত তাড়াতাড়ি মৃত্যুর কারণ তাই-ই।
–এটা তো আত্মহত্যার মামলাও হতে পারে?
–পারে। মৃত্যু হয় যেখানে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে, আত্মঘাতীর অস্ত্র সেখানে হয় ক্ষতস্থানে, নয় তো হাতের মুঠোর মধ্যে, নয়তো দেহের আশেপাশে কোথাও পাওয়া যায়। কিন্তু এখানে কোনও অস্ত্রই দেখতে পাচ্ছি না। সুতরাং এটা আত্মহত্যার মামলা হতে পারে না।
–মৃত্যু হয়েছে রাস্তায়। যদি কোনও পথিক ছোরাখানা কুড়িয়ে নিয়ে গিয়ে থাকে?
–প্রশ্নটা যুক্তিসঙ্গত। আদালতে এমন প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু বর্তমান ক্ষেত্রে এমন প্রশ্ন ওঠবার সুযোগ নেই। কারণ বলছি। ক্ষতস্থানটা দেখুন। জীবন্ত দেহে অস্ত্রাঘাত করলে ক্ষতস্থানটা বেশি ফাঁক হয়ে যায়, কারণ সে ক্ষেত্রে জ্যান্ত চামড়া হয় সঙ্কুচিত। মৃতদেহের ত্বক সঙ্কুচিত হয় না, তাই ক্ষতস্থানের ফাঁকও বড় হতে পারে না। এই দেহটার ক্ষতস্থানের মুখ কীরকম সংকীর্ণ, দেখছেন তো? এর দ্বারা কী প্রমাণিত হয়?
সুন্দরবাবু সন্দিগ্ধভাবে বললেন, তুমি কী বলতে চাও জয়ন্ত, এই ভদ্রলোকের মৃত্যুর পর হত্যাকারী দেহের ওপরে অস্ত্রাঘাত করেছে?
–ঠিক তাই। আরও প্রমাণের অভাব নেই। জীবন্ত দেহের ক্ষতস্থান রক্তে পরিপূর্ণ হয়ে যায়, জামাকাপড়ও হয় রক্তে আরক্ত। কিন্তু এই ক্ষতটা দেখুন, এর ওপরে রক্ত জমাট হয়ে নেই। জামাকাপড়েও রক্তের দাগ নেই বললেই চলে।
–তোমার আর কিছু বলবার আছে?
আছে। বলেছি, খুনির অস্ত্র দেহের দুটি প্রধান ধমনী দুই ভাগে বিভক্ত করে দিয়েছে। জীবন্ত অবস্থায় এই দুটি নাড়ি পরিপূর্ণ হয়ে থাকে প্রবাহমান রক্তধারায়। মৃত্যুর পর এই ধমনী দুটো প্রায় রক্তশূন্য হয়ে যায়। সুতরাং বরেনবাবু বেঁচে থাকতে যদি কেউ তার বুকে অস্ত্রাঘাত করত, তাহলে যে কোটরের ভিতর ওই দুটো ধমনী আছে, তা রক্তে রক্তে পরিপূর্ণ হয়ে উঠত। কিন্তু এ ক্ষেত্রে দেখছি রক্ত আছে যৎসামান্য–যা নগণ্য বললেও চলে।
