শুনতে পাচ্ছ না সুতীব্র আর্তধ্বনি? শুনতে পাচ্ছ না ঘন ঘন বন্দুক ও বোমার ভয়াল গর্জন এবং পলাতকদের অতি দ্রুত পদশব্দ?
হ্যাঁ, কলকাতা শহর হঠাৎ পাগলা হয়ে গিয়েছে এবং অরণ্যচারী ব্যাঘ্র ও সিংহের নৃশংস আত্মা এসে আজ দখল করেছে নগরবাসী মানুষদের বক্ষ।
অধিকতর ভয়াবহ রাত্রি নেমে এল শহরের ভিতরে, দিকে দিকে দুলিয়ে দিয়ে গাঢ় অন্ধকারের যবনিকা। পথে-পথে গ্যাসপোস্টগুলোর আলোকচক্ষু আজ অন্ধ, ট্রাম, বাস ও ট্যাক্সির চলাচল বন্ধ, একেবারে বোবা ফিরিওয়ালাদের কণ্ঠ, দোকানদাররা দোকানের ঝপ তুলে দিয়ে পলায়ন করেছে, সাধারণ পথিকরা আত্মগোপন করেছে আপন আপন ঘর-বাড়ির অন্তরালে এবং প্রত্যেক বাড়ির সদর দরজা ভিতর থেকে অর্গলবদ্ধ। কিন্তু তবু মৌন হল না কলকাতার মুখর পাগলামি, রাত্রির অন্ধকারকে দীর্ণ-বিদীর্ণ করে চতুর্দিক থেকে জেগে উঠছে তার প্রচণ্ড ধ্বনি ও প্রতিধ্বনি। রাজপথ যেখানে জনশূন্য সেখানেও সেই সব বন্য চিৎকার শোনা যাচ্ছে, বদ্ধদ্বার বাড়িগুলোর ছাদের থেকে। মানুষদের সঙ্গে সঙ্গে উন্মত্ত হয়ে চিৎকার করছে হাজার হাজার শঙ্খও।
জয় হিন্দ! বন্দেমাতরম্! আল্লা হো আকবর!
মানিক বললে, জয়ন্ত আজ রাত্রে দেখছি ঘুমের দফা গয়া।
জয়ন্ত বললে, সে কথা আর বলতে। কিন্তু হিন্দুরা কী নির্বোধ!
-কেন?
তারা বন্দেমাতরম্ বলে চিৎকার করছে। কিন্তু বন্দেমাতরম্ কি নরহত্যার, ভ্রাতৃহত্যার মন্ত্র?
–মুসলমানদের সম্বন্ধেও তুমি ওই প্রশ্ন করতে পারো। আল্লা হো আকবর বলতে কি বোঝায় হিন্দুর মুণ্ডচ্ছেদ করা?
–ঠিক বলেছ মানিক। আজ একসঙ্গে হিন্দু আর মুসলমানের মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে।
হুঁ। আজ সারারাত জেগে এই সব চিৎকার শুনলে সকালে আমাদেরও মাথা হয়তো ঠিক থাকবে না।
–তাহলে দুই কানে তুলো গোঁজবার চেষ্টা করব।
না, ঠাট্টা নয় জয়ন্ত। এসো, জানলাগুলো বন্ধ করে শুয়ে পড়া যাক। তারপর সকালে উঠে দেখা যাবে, পথঘাটের অবস্থা কীরকম।
জয়ন্ত ও মানিক সকালবেলায় যখন বাড়ির বাইরে গিয়ে দাঁড়াল, তখন রাত্রের সেই ভয়ঙ্কর ও পৈশাচিক গণ্ডগোল বোধ করি শ্রান্ত হয়ে এসেছে। মাঝে-মাঝে দু-চারজন এখনও জয় হিন্দ প্রভৃতি বলবার চেষ্টা করছে বটে, কিন্তু কণ্ঠস্বরগুলো যথেষ্ট কাহিল হয়ে পড়েছে। বলে মনে হচ্ছে। তবে তরুণ সূর্য্যের সোনালি হাসির ভিতরেও চারিদিকে বিরাজ করছে কেমন একটা থমথমে অপার্থিব ভাব।
আগে প্রতিদিনই যারা নরহত্যা করবার ব্রত নিয়ে জনবহুল পথে-পথে দিগবিদিক জ্ঞানহারার মতো ছুটোছুটি করে বেড়াত, সেই ট্রাম-বাস-ট্যাক্সির দল এখনও সাহস সঞ্চয় করে আত্মপ্রকাশ করতে পারেনি। যে দু-একখানা মোটর দেখা যাচ্ছে, তা হয় ডাক্তার-মার্কার আশ্রয় নিয়েছে, নয় বহন করছে পুলিশের লালপাগড়িওয়ালাদের।
জায়গায়-জায়গায় দেখা যাচ্ছে ছোট-বড় জনতা। সেখানে সবাই কথা কইছে উত্তেজিতভাবে এবং অনেকেরই হাতে রয়েছে ছোরা, ভোজালি, লোহার ডান্ডা, পাইপ বা শিক্ এবং এমন সব পলকা লাঠি বা বাঁখারি,–একটা বিড়াল মারতে গেলেও যা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যেতে পারে।
মাঝে-মাঝে হঠাৎ দলে-দলে লোক উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটতে শুরু করছে উর্ধ্বশ্বাসে।
মানিক একটা ছুটন্ত লোকের হাত ধরে ফেলে শুধোলে, আরে মশাই, ব্যাপার কী?
জানি না মশাই, জানি না।
তবে এত ছুটছেন কেন?
সবাই ছুটছে বলেই ছুটছি। ইচ্ছা করলে আপনিও ছুটতে পারেন।
না, আমার সে ইচ্ছা নেই। আপনিই ছুটুন। যত পারেন ছুটুন–প্রাণপণে ছুটুন!
মানিক হাত ছেড়ে দিলে। লোকটি আবার ছুটতে শুরু করলে।
জয়ন্ত হাসলে, মানিকও হাসলে বটে, কিন্তু তাদের সে হাসির মধ্যে নেই কিছুমাত্র কৌতুকের আবেগ। রাজপথ হয়ে উঠেছে আজ ভীষণ। তার দিকে তাকালেও শিউরে ওঠে অন্তরাত্মা।
রাজপথ হয়েছে আজ অসংখ্য মানুষের অন্তিমশয্যা। মৃতদেহ, মৃতদেহ আর মৃতদেহ। কোথাও একজন কি দুজন এবং কোথাও বা চার-পাঁচজন মানুষের মৃতদেহ। কোথাও বা রাশি রাশি মৃতদেহের ওপরে মৃতদেহ পড়ে গঠন করেছে বীভৎস স্কুপের পর স্তূপ। প্রত্যেকেরই নিশ্চেষ্ট দেহের ভঙ্গি একান্ত অস্বাভাবিক, প্রত্যেক দেহই রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত। দেহহীন মুণ্ড এবং মুণ্ডহীন দেহেরও অভাব নেই। কাটা পা আর হাতও পড়ে রয়েছে এখানে-ওখানে। সর্বত্র রক্তের ছড়াছড়ি রক্তধারায় পথ হয়েছে পিচ্ছিল, কর্দমাক্ত। সেসব ভয়ানক দৃশ্য অসহনীয়। যেটুকু বললুম তাই যথেষ্ট, আরও বেশি বর্ণনা করে লাভ নেই। মানুষের প্রতি মানুষ যে কত নিষ্ঠুর হতে পারে, কলকাতার রাজপথে পাওয়া যায় তারই জ্বলন্ত প্রমাণ।
হঠাৎ মানিক সচকিত কণ্ঠে বলে উঠল, জয়ন্ত দাঁড়াও!
কী হয়েছে মানিক?
–এখানে একটি দেহ পড়ে রয়েছে। বরেনবাবুর মৃতদেহ। ইনি আমার পরিচিত। বন্ধু বললেও চলে।
–কে বরেনবাবু?
বরেন্দ্রসুন্দর রায়চৌধুরী। আমার কাছে তুমিও এর নাম শুনেছ।
বরেন্দ্রসুন্দর রায়চৌধুরী। আনন্দপুরের জমিদার?
–হ্যাঁ।
জয়ন্ত এগিয়ে এসে দাঁড়াল।
একটি পরমসুন্দর মানুষের সুগঠিত দেহ। মুখ-চোখ সুশ্রী, বর্ণ গৌর। দেখলেই বোঝা যায়, সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি! দেহের ভঙ্গি স্বাভাবিক। প্রথম দৃষ্টিতে মনে হয়, ভদ্রলোক যেন ঘুমিয়ে আছেন নিশ্চিন্ত আরামে। কিন্তু তার বুকের ওপর রয়েছে একটা কুৎসিত ক্ষতচিহ্ন।
