তারপর একদিন একটি যুবক অস্ত্র-চিকিৎসক পুলিশের বড়সাহেবের কাছে এসে যা বললে তা হচ্ছে এই :
আসল অপরাধী কে তা আমি জানি না বটে, কিন্তু আমার মনে একটা সন্দেহের উদয় হয়েছে।
কিছুদিন আগে আমাদের হাসপাতালে, আনা উইস্ নামে একটি মেয়ে-ডাক্তার কাজ করতে আসে। আনা যত রোগী দেখত, তাদের সকলকেই বলত, ডা. স্মিটজ-এর কাছে গিয়ে অস্ত্র-চিকিৎসা করতে। অথচ ডা. স্মিটজ আমাদের হাসপাতালের দলভুক্ত নন। পরে জানা যায়, ডা. স্মিটজের সঙ্গে আনার বিয়ের কথা চলছে।
তারপর ডাক্তার-মহলে কানাঘুষায় শোনা গেল, ডাঃ স্মিটজ নাকি একই রোগীর উপরে অকারণে বারবার অস্ত্র-প্রয়োগ করে ডবল তে-ডবল ফি আদায় করেন। যেন তিনি খুব সহজেই তাড়াতাড়ি বড়লোক হয়ে উঠতে চান!
কিছুদিন পরে শুনলুম, আনার সঙ্গে ডা. স্মিটজের বিয়ের সম্পর্ক ভেঙে গেছে, তিনি বার্থা নামে আর-একটি মেয়ে-ডাক্তারকে বিয়ে করতে চান।
দিন কয়েক হল, আনা আমাদের হাসপাতালের কাজ ছেড়ে দিয়ে চলে গিয়েছে। ডাঃ স্মিও এখন শহরের বাইরে গিয়েছেন, আর বার্থারও কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
গোয়েন্দারা এইবারে ডা. স্মিজের সন্ধান করতে লাগল।
স্মিটজের এক পরিচিত রোগী খবর দিলে, যে ডাক্তারকে সামার্লিং-এর ট্রেন ধরতে দেখেছে। সামার্লিং হচ্ছে, অস্ট্রিয়ায়ই একটি পাহাড়ে জায়গা, লোকে সেখানে হাওয়া বদলাতে যায়।
.
পাহাড়ের কোন নির্জন স্থানে একটি বাড়ি। গোয়েন্দারা সেইখানেই ডাঃ স্মিটজকে আবিষ্কার করলে।
তখন অনেক রাত হয়েছে, স্তব্ধতা ভেদ করে সশব্দে বইছে কনকনে ঠান্ডা বাতাস। অন্ধকার আকাশে একটা তারা পর্যন্ত উঁকি মারছে না। গোয়েন্দারা চুপি-চুপি বাড়ির দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই সভয়ে শুনতে পেলে, মৌন রাত্রি হঠাৎ কেঁপে উঠল স্ত্রী কণ্ঠের তীব্র ও তীক্ষ্ণ আর্তনাদে! কে যেন বিষম যন্ত্রণায় চেঁচিয়ে উঠেই আবার থেমে পড়ল।
আধ-অন্ধকারে একটা প্রকাণ্ড লম্বা-চওড়া মূর্তি আস্তে-আস্তে সদর দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল–তার পিছনে পিছনে একটি স্ত্রীলোক।
একজন ডিটেকটিভ তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে গম্ভীর স্বরে বললে, ডাক্তার, তুমি আমাদের বন্দি।
ডাক্তার এক লাফে পিছিয়ে গিয়ে বাড়ির দরজা আবার বন্ধ করবার চেষ্টা করলে, কিন্তু তার আগেই গোয়েন্দারা তাকে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেললে। তখন আরম্ভ হল বিষম এক ধস্তাধস্তি। কিন্তু সেই বিপুলবপু মহা-বলিষ্ঠ ডাক্তারকে কাবু করা সহজ নয় দেখে, একজন গোয়েন্দা রিভলভারের বাঁট দিয়ে এত জোরে তার মাথায় আঘাত করলে যে, সে তখনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। তার সঙ্গিনী স্ত্রীলোকটিও ধরা পড়ল। সে হচ্ছে, বার্থা। ডাক্তারের নতুন বউ।
বাড়ির ভিতরের একটা ঘরে, অস্ত্রোপচারের টেবিলের উপরে পাওয়া গেল হতভাগিনী আনাকে অর্ধ-অচেতন অবস্থায়। তার দুই হাতে ব্যান্ডেজ বাঁধা, ইথারের গন্ধে ঘর পরিপূর্ণ।
কয়েক ঘণ্টা পরে আনা বললে, হ্যাঁ, ডা. স্মিটজ আমাকে বিয়ে করবেন বলে আমি তার কাছে গিয়ে অস্ত্র-চিকিৎসা করবার জন্যে রোগীদের পরামর্শ দিতুম। একই রোগীর দেহে অকারণে বারবার অস্ত্র চালিয়ে ডাক্তার অন্যায়রূপে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করতেন।
তারপর ডাক্তার আমাকে ছেড়ে, বার্থাকে বিয়ে করতে চান। সেইজন্যে আমি রাগ করে বলি, তার অন্যায় চিকিৎসার কথা পুলিশের কাছে প্রকাশ করে দেব। ডাক্তারও তখন খাপ্পা হয়ে একদিন আমাকে ধরে জোর করে আমার হাতে উল্কির এক সাপ এঁকে দেন।
তারপরেও আমি পুলিশে খবর দিতে চাই শুনে, তিনি আমার কাছে মাপ চেয়ে অনুতপ্তভাবে বললেন, আচ্ছা, আমি তোমাকেই বিয়ে করব। কিন্তু বিয়ের আগে আমি। হপ্তাখানেকের জন্যে সামার্লিং-এ হাওয়া বদলাতে যেতে চাই, তুমিও আমার সঙ্গে চলো।
আমি খুব খুশি হয়ে বোকার মতো ডাক্তারের সঙ্গে এখানে চলে আসি। তারপর আমার এই দুর্দশা হয়েছে। ডাক্তার আর বার্থা দুজনে মিলে আমার দু-হাতের দুটো আঙুল কেটে নিয়েছে। আঙুল কেটে নিয়ে ডাক্তার আমাকে বলেছে, কালসাপিনি! তোমার আঙুলে কালসাপ এঁকে দিয়েছি তবু তোমার চৈতন্য হয়নি! আচ্ছা, ধীরে-ধীরে সমস্ত হাত কেটে নিয়ে আমি তোমার বন্ধু পুলিশকেই উপহার দেব।
আপনারা না এলে এই দানব আর দানবী আমার দেহকে খণ্ড খণ্ড করে আমাকে নিশ্চয়ই হত্যা করত।
ডা. স্মিটজের আর বিচার হল না। কারণ, গোয়েন্দার রিভলভারের চোটে তার খুলি ফেটে গিয়েছিল এবং তাতেই তার মৃত্যু হয়। বার্থা গেল জেলখানায়।
ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরের বাহাদুরিটা দেখলে তো? যেন মন্ত্রশক্তি বলেই শূন্যতার ভিতর থেকে সূত্র আবিষ্কার করে অনুমানে তিনি যা-যা বলেছিলেন, তার একটা কথাও মিথ্যা হল না এবং তিনি না থাকলে পুলিশ এ মামলার কোনওই কিনারা করতে পারত না।
হত্যা হাহাকারে (উপন্যাস)
কলকাতা হঠাৎ পাগলা হয়ে গিয়েছে! এক-একজন মানুষ যে পাগল হয়ে যায় একথা তোমরা সবাই জানো। কিন্তু একটা গোটা শহর হঠাৎ পাগলা হয়ে গিয়েছে শুনলে তোমাদের মনে খটকা লাগতে পারে নিশ্চয়ই।
তবু কথাটা সত্য। ওই শোনো। হাজার-হাজার কণ্ঠে আকাশ-কাঁপানো ওই বিকট চিৎকার শোনো। জয়-হিন্দ! বন্দে মাতরম্! আল্লা হো আকবর!
ওই দ্যাখো। নিকটে, সুদূরে বাড়ির পর বাড়ি জুড়ে দাউ দাউ করে জ্বলছে সমুজ্জ্বল রক্তের মতো রাঙা টকটকে অগ্নিশিখার পর অগ্নিশিখা এবং অতিকায় কৃষ্ণ অজগরের মতো ধূম্রকুণ্ডলীর পর ধূম্রকুণ্ডলী সারে-সারে ওপরে উঠে যাচ্ছে যেন ছোবল মারবে বিপুল শূন্যের বুকে।
