পাঁচদিন পরে আবার এক পার্সেল এসে হাজির। তার মধ্যে রয়েছে স্ত্রীলোকের ডান হাত থেকে কেটে নেওয়া একটি মধ্যমাঙ্গুলি! আঙুলে আবার একটি বিয়ের আংটি!
বড়সাহেব তো হতভম্ব! এ কী ভয়ানক কাণ্ড! পুলিশের বড়সাহেব হয়ে জীবনে তিনি অনেক ভীষণ ব্যাপার দেখেছেন, কিন্তু এমন ভয়াবহ ব্যাপার তাঁর কল্পনারও অতীত! সাধারণ হত্যাকারী চুপি-চুপি খুন করে মানে-মানে কোনওরকমে পালিয়ে যেতে পারলেই বাঁচে! কিন্তু এই পার্সেল দুটো যে পাঠিয়েছে, সে এতবড় অসমসাহসী যে, নিজের পৈশাচিক কাণ্ডের নমুনা বারবার পুলিশের বড়সাহেবের গোচরে আনতেও সঙ্কুচিত নয়।
সাধারণ খবরের কাগজের মোড়ক, সাধারণ সিগারেটের প্যাকেট এবং পার্সেলের উপরের ঠিকানাও লেখা একটি নতুন টাইপরাইটারের সাহায্যে। ডাকঘরের ছাপও ভিয়েনা শহরের।
ভিয়েনা শহরে কলকাতার চেয়েও বেশি লোক বাস করে, তার জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে আঠারো লক্ষ। এতবড় শহরের লক্ষ লক্ষ বাসিন্দার ভিতর থেকে কোন শয়তান যে পুলিশের বড়সাহেবের সঙ্গে এই বীভৎস কৌতুক করছে, তা অনুমান করবার কোনও সূত্রই পার্সেলের ভিতর থেকে পাওয়া যায় না। অথচ এই পাপিষ্ঠকে তাড়াতাড়ি ধরতে না পারলে পুলিশের নিন্দার আর সীমা থাকবে না।
আর কোনও উপায় না দেখে বড়সাহেব তখনই ইউনিভার্সিটির একজন পরিচিত প্রফেসরের কাছে ছুটে গেলেন।
প্রফেসর তার বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাগারে বসে সমস্ত ঘটনা শুনে বললেন, আঙুল দুটো দেখি!
বড়সাহেব মোড়ক, সিগারেটের প্যাকেট, কাটা-আঙুল দুটো ও আংটি বার করে টেবিলের উপরে রাখলেন।
খানিকক্ষণ মন দিয়ে পরীক্ষা করবার পর প্রফেসর বললেন, হুঁ, আঙুলের অবস্থা দেখে বেশ বোঝা যাচ্ছে, তর্জনীর পর যখন মধ্যমাঙ্গুলি কেটে নেওয়া হয়, হতভাগ্য স্ত্রীলোকটি তখনও জ্যান্ত ছিল। মড়ার দেহ থেকে কাটা আঙুল এরকম হয় না। হয়তো এখনও সে জ্যান্ত আছে! একটি জীবন্ত মেয়ের দুই হাত থেকে দুটো আঙুল কেটে নেওয়া হয়েছে, তাকে তিলে তিলে যন্ত্রণা দিয়ে খুন করা হচ্ছে।
বড়সাহেব শিউরে উঠে বললেন, ভয়ানক প্রফেসর! ভয়ানক! আপনি তাড়াতাড়ি পরীক্ষা করুন, হয়তো অভাগিনীকে এখনও আমরা বাঁচাতে পারি!
প্রফেসর আঙুলের দিকে দৃষ্টি বদ্ধ করে বললেন, আঙুল দুটো দেখে বলা যায়, এ কোনও সাধারণ ছোটলোকের মেয়ের আঙুল নয়। তারপর আঙুল দুটো যেরকম সূক্ষ্মভাবে কাটা হয়েছে, তা দেখে মনে হয়–
মনে হয়, শবব্যবচ্ছেদ করতে হত্যাকারী খুব অভ্যস্ত, আর ব্যবচ্ছেদ করবার অস্ত্রশস্ত্র তার কাছেই আছে। বড়সাহেব, আমার বিশ্বাস, হত্যাকারী হয় সাধারণ ডাক্তার নয় অস্ত্র চিকিৎসক, নয় সে শবব্যবচ্ছেদাগারে কাজ করে। কারণ, অব্যবসায়ী লোক এমন কৌশলে আঙুল কাটতে পারে না!
বড়সাহেব এতক্ষণ পরে একটা বড় সুত্র পেয়ে উৎসাহিত হয়ে উঠলেন।
প্রফেসর বললেন, এভাবে যন্ত্রণা দিয়ে যে নরহত্যা করে, সে নিশ্চয়ই নিষ্ঠুরতার ভক্ত। আংটিতে ওই সুতোটা বাঁধা কেন?
বড়সাহেব হাস্য করে বললেন, প্রফেসর, ম্যাগ্নিফাইং গ্লাস দিয়ে ও-সুতোটা অত মন দিয়ে দেখবার দরকার নেই। হাত দিয়ে না ছুঁয়ে আংটিটা তুলব বলে আমিই ওই সুতো বেঁধেছি।
প্রফেসর অতসীকাচের ভিতর দিয়ে রঙিন সুতোটা দেখতে দেখতে বললেন, সুতো আপনি বাঁধতে পারেন, কিন্তু সুতোর যে অংশ আংটির গায়ে বাঁধা ছিল, সেখানটা এমন বে-রঙা হয়ে গেছে কেন? আচ্ছা, দেখা যাক!
খানিকক্ষণ সুতোটা নিয়ে রাসায়নিক পরীক্ষা করে প্রফেসর বললেন, সুতোর ভিতরে indigotin disulphonic অ্যাসিড রয়েছে।
বড়সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন, ও অ্যাসিড তো আমার ছিল না! কী কী কাজে ওই অ্যাসিড ব্যবহার করা হয়?
প্রফেসর বললেন, উপস্থিত ক্ষেত্রে হয়তো উল্কি তোলবার জন্যই ওই অ্যাসিড ব্যবহার করা হয়েছে। হু, যা ভেবেছি তাই! এই দেখুন, কাটা মধ্যমাঙ্গুলির উপর থেকে উল্কি তোলবার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু অ্যাসিডে চামড়া ক্ষয়ে গেলেও, দাগ দেখে বোঝা যায়, আঙুলে উল্কিতে আঁকা ছিল একটা ছোট্ট সাপ!
বড়সাহেব বললেন, ছোট্ট সাপ!
হাঁ বড়সাহেব! হত্যাকারী বোধহয় কোনও স্ত্রীলোকের হাতে জোর করে একটা সাপ এঁকে দিয়েছিল! সে বোধহয় বলতে চেয়েছিল, তুমি কালসাপিনির মতো দুষ্ট, তাই তোমার আঙুলে এই ছাপ দেগে দিলুম! কিন্তু তারপরও স্ত্রীলোকটি বোধহয় তাকে পুলিশের ভয় দেখায়। হত্যাকারী তখন হয়তো বলে, তুমি আমাকে পুলিশের ভয় দেখাচ্ছ? বেশ, তাহলে পুলিশের কাছে যে আঙুল দিয়ে আমাকে দেখিয়ে দেবে, তোমার সেই আঙুলই কেটে নিয়ে পুলিশের কাছে আমি উপহার পাঠাব। কিন্তু আঙুলটা পাঠাবার সময়ে সাবধানী হত্যাকারী উল্কিটা তুলে ফেলবার চেষ্টা করেছিল।
বড়সাহেব বললেন, প্রফেসর, এইবারে আপনি কবির মতো কল্পনার আশ্রয় নিয়েছেন। এসব স্বাভাবিক কথা নয়।
প্রফেসর হেসে বললেন, হ্যাঁ, আমার এ অনুমান মিথ্যা হতেও পারে। কিন্তু মনে রাখবেন, আমরা কোনও স্বাভাবিক হত্যাকারীর কীর্তি নিয়ে আলোচনা করছি না; কিন্তু সেকথা এখন থাক, আপনাকে আসল পথ তো আমি দেখিয়ে দিয়েছি। আপনি অস্ত্র-চিকিৎসকদের মধ্যেই হয়তো হত্যাকারীর সন্ধান পাবেন।
পুলিশের বড়সাহেবের হুকুমে তখনি দলে দলে ডিটেকটিভ ও গুপ্তচর, ভিয়েনার বিভিন্ন শবব্যবচ্ছেদাগারে ও অস্ত্র-চিকিৎসকদের বাড়ির দিকে ছুটল এবং প্রত্যেক ডাক্তারের গতিবিধির উপর তীক্ষ্ণদৃষ্টি রাখা হল। ভিয়েনার বিরাট জনসমুদ্রের মধ্যে পুলিশ এতক্ষণ পরে একটা যেন দ্বীপের মতো ঠাই খুঁজে পেলে, গোয়েন্দাদের আর দিশেহারার মতো হাবুডুবু খেতে হল না! এই খোঁজাখুঁজির ফলে কয়েকজন অসাধু ডাক্তার ধরা পড়ল বটে, কিন্তু আসল অপরাধী তখনও নিরুদ্দেশ হয়েই রইল।
