চারিদিকে দৃষ্টি রেখে ঠান্ডা মাথায় ধীরে-সুস্থে আমি কাজ করেছি। সেই সর্বনেশে টুপিটা আর একটু হলেই আমার নজর এড়িয়ে যেত বটে, কিন্তু যায়নি! সেও এখন আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে। আমার আবার ভয় কী?
মণিলালের লাশ পাওয়া গিয়েছে–তা তো যাবেই। নির্বোধের মতন আমি তার লাশ লুকোবার চেষ্টা করিনি। রেলগাড়ির চাকার তলায় সে কাটা পড়েছে! মণিলালের সব জিনিসই–এমনকী ছাতা আর ব্যাগ থেকে চোখের চশমা পর্যন্ত তার সঙ্গেই পাওয়া গিয়েছে। অতি-লোভী মূর্খ চোরের মতন মণিলালের সোনার ঘড়ি, চেন, হিরার পিন আর নগদ দুশো চল্লিশ টাকাও আমি নেওয়ার চেষ্টা করিনি। পুলিশ নিশ্চয়ই স্থির করবে, মণিলাল মারা পড়েছে রেল-দুর্ঘটনায়। কিংবা সে আত্মহত্যা করেছে।
আমি নিরাপদ। আমি সাধারণ খুনি নই।
কিন্তু স্টেশনে সেই ঢ্যাঙা লোকটা কে?
সেই যার হাতে বসন্ত নামে লোকটা মামলা তদ্বিরের ভার দিল? লোকটা কি ডিকেটটিভ? তার মুখ যতবারই মনে করি, ততবারই আমার বুক ধড়াস করে ওঠে কেন? সে আমার কী করতে পারে! যদিই সে এটাকে খুনের মামলা বলে ধরে নেয়, তা হলেই বা আমার ভয়টা কী? আমার বিরুদ্ধে প্রমাণ কোথায়? মণিলালের সঙ্গে আমার সম্পর্ক আবিষ্কার করবে কে?
কোনও ভয় নেই, কোনও ভয় নেই, আমার কোনও ভয় নেই। যা হওয়ার নয়, তাই যদি হয়, তা হলেই-বা আমাকে ধরবে কে? আমার কলকাতার ঠিকানা কেউ জানে না। তোড়জোড় করে তদন্ত শেষ করতেও পুলিশের বেশ কিছুদিন কেটে যাবে। আর আমি কলকাতা থেকেও সরে পড়ছি আজ সন্ধ্যার গাড়িতেই। ব্যাঙ্কের সমস্ত টাকা আমি তুলে নিয়েছি। দূর বিদেশে অদৃশ্য হব–এখন কিছুদিনের জন্যে। আমাকে ধরবে কে?
সিঁড়ির ওপর অমন ভারী-ভারী পায়ের শব্দ কাদের? যেন অনেক লোক উপরে উঠছে একসঙ্গে। উপরতলার ঘরগুলো তো খালি। নতুন ভাড়াটে আসছে না কি…?
ঘরের দরজায় হল করাঘাত।
অক্ষয় সচমকে রত্নগুলো মুড়ে পকেটে রেখে দিলে। তারপর জিজ্ঞাসা করলে, কে?
দরজা খুলুন।
কে আপনি?
দরজা খোলো, দরজা খোলো বলছি!
কেমন যেন বেসুরো কণ্ঠস্বর! এখানে কোনও বাঙালিই তো তাকে ডাকতে আসে না!
অক্ষয় উঠল। একমুহূর্তে তার মুখ হয়ে গেল রক্তহীন–যেন সে নিয়তির আহ্বান শুনতে পেয়েছে!
দরজা খোলো, দরজা খোলো।
অক্ষয় দরজা খুলল না। দরজা থেকে তিন হাত তফাতে একটা জানলা ছিল। তারই একটা পাল্লা খুলে, বাইরে একবার উঁকি মেরেই দুম করে জানলাটা আবার বন্ধ করে দিল।
ইনস্পেকটর! পাহারাওয়ালার দল!
অক্ষয় উদ্ভ্রান্তের মতন চারিদিকে তাকিয়ে দেখল। কোনও দিকেই পালাবার পথ নেই।
দরজার উপরে দুমদাম পদাঘাত আরম্ভ হল। দরজা এখনি ভেঙে পড়বে।
দাঁতে দাঁত চেপে অক্ষয় নিজের মনেই বললে, ধরা দেব? কখনও নয়, কখনও নয়। তার মুখের ভাব হয়ে উঠল ঠিক সেইরকম–মণিলালকে খুন করবার জন্যে যখন সে তার পিছনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল!
দুম-দুম-দুম-দরজায় পদাঘাত!
ওদিকে রাস্তার ধারের বারান্দা–ওদিকেও বাইরে যাওয়ার জন্যেও একটা দরজা।
না, না, পালাবার পথ আছে, ওই দরজা দিয়েই আমি পালাবদরজা দিয়েই।
দুম-দুম-দুমদুম!
অক্ষয় উন্মত্তের মতন ছুটে গিয়ে ছ-তলা বারান্দার দরজা খুলে ফেলল।
দুম-দুম–হুড়মুড় করে ঘরের দরজা ভেঙে পড়ল!
এবং সঙ্গে সঙ্গে অক্ষয় একলাফ মেরে বারান্দা ডিঙিয়ে নিচের দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল।
অক্ষয়ের রক্তাক্ত দেহ পাওয়া গেল বটে, কিন্তু তার আত্মা তখন পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে গিয়েছে।
সত্যিকার দানব-দানবী
তোমাদের কাছে প্রায়ই আমি ভূতের গল্প, বা অ্যাডভেঞ্চারের কাহিনি বলে থাকি। কিন্তু আজ আমি তোমাদের কাছে একটি ডিটেকটিভের গল্প বলব।
এটি তোমরা বাজে গাল-গল্প বলে মনে কোরো না। ইউরোপের অস্ট্রিয়া দেশে এই সত্য ঘটনাটি ঘটেছিল। আমরা ঘটনাটি উদ্ধার করব পুলিশের নিজের ডায়ারি থেকেই।
পৃথিবীর অন্যান্য দেশের পুলিশের সঙ্গে অস্ট্রিয়ার পুলিশের মস্ত একটি তফাত আছে, সেটিও তোমাদের জানিয়ে রাখি। অন্য-অন্য দেশের পুলিশ, চুরি-ডাকাতি-খুনের কিনারা করবার জন্যে বাইরের কারুর দরজায় গিয়ে ধরনা দেয় না। কিন্তু অস্ট্রিয়ার পুলিশ যখন কোনও গোলমেলে মামলায় পড়ে, তখন প্রায়ই সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরদের সাহায্য নিয়ে থাকে।
প্রফেসররা পুলিশকে সাহায্য করেন শুনে তোমরা বোধহয় অবাক হচ্ছ? কিন্তু এতে অবাক হওয়ার কিছুই নেই। কারণ, অস্ট্রিয়ার ইউনিভার্সিটিতে অপরাধ-তত্ত্বের একটি বিভাগ আছে। ওই প্রফেসরেরা সেই বিভাগেই ছাত্রদের শিক্ষা দেন। ওখানকার এক-একজন প্রফেসর অপরাধ তত্ত্বে এত বেশি পণ্ডিত যে, পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ডিটেকটিভরাও তাঁদের কাছে হার মানতে বাধ্য। নীচের ঘটনাটি শুনলেই তোমরা প্রফেসরদের বাহাদুরির কিছু কিছু প্রমাণ লাভ করবে।
বিখ্যাত ভিয়েনা শহর যে অস্ট্রিয়ার রাজধানী, একথা তোমরা নিশ্চয়ই জানো। ওই ভিয়েনা শহরের পুলিশের বড়সাহেবের কাছে একদিন ডাকযোগে একটি পার্সেল এল।
পার্সেলের মোড়ক খুলেই বড়সাহেবের চক্ষুস্থির আর কি! মোড়কটি পুরোনো খবরের কাগজের। তার ভিতরে একটি চলতি সিগারেটের প্যাকেট, এবং প্যাকেটের মধ্যে রয়েছে মানুষের বাঁ-হাত থেকে কেটে নেওয়া একটি তর্জনী। দেখলেই বোঝা যায়, আঙুলটা কাটা হয়েছে, মেয়েমানুষের হাত থেকে!
