অন্য গ্রামে গিয়েছিলুম।
কখন?
বৈকাল থেকেই আমি বাইরে আছি।
তোমার মনিব?
আজ সন্ধের গাড়িতে তাঁর কলকাতায় যাবার কথা।
কলকাতায় কোথায়?
জানি না।
তিনি কী কাজ করেন?
তাও ঠিক জানি না। তবে তিনি বোধহয় জহুরি।
কখন ফিরবেন?
বলতে পারি না। সময়ে-সময়ে তিনি তিন-চারদিন বাড়িতে ফেরেন না।
এ-বাড়িতে আজ কোনও নূতন লোক এসেছিল?
আমি বাড়িতে থাকতে কেউ আসেনি।
কলকাতায় তোমার মনিবের কোনও বাসা নেই?
জানি না। তবে শুনেছি তিনি কলকাতার বড়বাজারে কোথায় গিয়ে ওঠেন।
দিলীপ গাত্রোত্থান করে ইনস্পেকটরকে নিয়ে দালানে গেলেন।
চুপিচুপি বললেন, এখানে আর বেশি সময় নষ্ট করবেন না, আসামি একেবারে গা ঢাকা দিতে পারে। তার কার্যকলাপ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, সে বিষম চতুর ব্যক্তি। অক্ষয়ের বেয়ারাকে নজরবন্দি রাখুন। বাড়িটা পুলিশের হেপাজতে থাকুক। এখান থেকে এককণা ধুলোও যেন না সরানো হয়। আপনি আর একটু অপেক্ষা করুন। ইতিমধ্যে আমরা থানায় খবর দিয়ে আপনার মুক্তির ব্যবস্থা করে যাচ্ছি। নমস্কার।
আমরা সবাই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লুম।
যেতে-যেতে দিলীপ বললেন, আমার দৃঢ় বিশ্বাস অক্ষয় কালকেই ধরা পড়বে। সে যখন জহুরি, তখন তার বড়বাজারের ঠিকানা জানা অসম্ভব হবে না। অক্ষয়ের সম-ব্যবসায়ীদের কেউ-না-কেউ তার ঠিকানা বলতে পারবে। তারপর শ্ৰীমন্ত, কর্তব্য তো শেষ হল। অতঃপর?
আমি বললুম, অতঃপর? আমি বেশ বুঝতে পারছি, এইবার তুমি তোমার হাত বাক্সের জয়গান আরম্ভ করবে!
তাই নাকি? অসীম তোমার বোঝবার শক্তি! যাক। আপাতত ভেবে দ্যাখো, এই মামলা হাতে নিয়ে আমরা কী কী শিক্ষালাভ করলুম? প্রথমত, একটুও সময় নষ্ট করা উচিত নয়। আর ঘণ্টা কয়েক পরে এলে বাড়ির ভিতরে ঢুকেও আমরা আর কোনও সূত্রই খুঁজে পেতুম না–সমস্তই উপে যেত কর্পূরের মতো। দ্বিতীয়ত, খুব তুচ্ছ সূত্রকেও অগ্রাহ্য করতে নেই, তাকে অবলম্বন করে শেষপর্যন্ত এগিয়ে যাওয়াই উচিত। দৃষ্টান্ত চাও যদি, ভাঙা চশমার কথা বলতে পারি। তৃতীয়ত, পুলিশের অনুসন্ধানকার্যে একজন শিক্ষিত বৈজ্ঞানিকের সাহায্য অত্যন্ত দরকারি এবং চতুর্থত, আমার এই হাতবাক্সটি হচ্ছে অমূল্য নিধি, একে ছেড়ে বাড়ির বাইরে পা বাড়ানো উচিত নয়।
আমি বললুম, অতএব, জয় হাতবাক্সের জয়!
.
শ্ৰীমন্ত সেনের ডায়ারি সমাপ্ত
.
অবশিষ্ট
বড়বাজারের একটা ছোট অন্ধকার রাস্তা চার-পাঁচ হাতের বেশি চওড়া নয়। কিন্তু তার মধ্যে প্রতিদিন জনস্রোত যেন উপচে পড়ে। প্রত্যহ কত হাজার লোক যে সেখান দিয়ে আনাগোনা করে, কেউ তার হিসাব রাখেনি।
রাস্তা সরু হলে কী হয়, দুপাশের বাড়িগুলোর অধিকাংশই পাঁচ-ছয়তলার কম নয়। যেন নিচে আলোকের অভাব দেখে মুক্ত আকাশ-বাতাসকে খোঁজবার জন্যে তারা উপরে– আরও উপরে ওঠবার চেষ্টা করেছে।
প্রত্যেক বাড়ির তলায়-তলায় যেন পায়রার খোপের পর খোপ সাজানো হয়েছে। এইসব খোপে যারা বাস করে, তাদের মধ্যে বাঙালির দেখা পাওয়া যায় না।
অথচ এমনি একখানা মস্ত বড় বাড়ির সব চেয়ে উপরতলার একটি ঘরে চৌকির উপরে যে বসে আছে, সে আমাদের অক্ষয় ছাড়া আর কেউ নয়।
শহরে এত জায়গা থাকতে এখানে এসে কেন যে সে বাসা বেঁধেছে তা বলা কঠিন। হয়তো তার অসাধু–কিন্তু সুচতুর মন বুঝেছে, চৌর্য-ব্যবসায় কোনওদিনই নিরাপদ নয়; বিশেষ সাবধানতা সত্ত্বেও যে-কোনও বিপদ ঘটবার সম্ভাবনা; পুলিশকে ঠকাবার জন্যে যারা নির্জন জায়গায় আশ্রয় নেয়, তারা হচ্ছে নির্বোধ, কারণ পুলিশের দৃষ্টি সর্বাগ্রে তাদেরই আবিষ্কার করতে পারে; কিন্তু জনতাসাগরে হারিয়ে গেলে সহজে কেউই তার পাত্তা পাবে না!
এইটেই তার বড়বাজারে বাসা নেওয়ার একমাত্র কারণ কি না জানি না; কিন্তু সেই অন্ধকার রাস্তার এই ছতলা বাড়ির উপরতলায় সত্য-সত্যই বাসা বেঁধেছিল আমাদের অক্ষয়। কলকাতার এলে সে এইখানেই আশ্রয় গ্রহণ করত।
অক্ষয় চৌকির উপরে বসে আছে। ঘরের অন্য সব দরজা-জানলা বন্ধ। কেবল একটি খোলা জানলা দিয়ে ঘরের ভিতরে আসছে অপরাহের রৌদ্রপীত আলো এবং বড়বাজারের বিপুল মানব-মধুচক্রের অশ্রান্ত গুঞ্জন।
তার সামনে একখানা কাগজের উপরে ছড়ানো রয়েছে নানা রঙের নানা আকারের রত্ন! হিরা, পান্না, চুনি, মকরত, মুক্তা প্রভৃতি। তাদের উপরে এসে দিনের আলো পড়ছে যেন ঠিকরে-ঠিকরে!
অক্ষয় বসে-বসে ভাবছে : একে-একে হিসাব করে দেখলুম, এগুলোর বাজারদর ত্রিশ হাজার টাকার কম হবে না। আশা করেছিলুম আরও বেশি লাভ হবে, কিন্তু মানুষের সব আশা সফল হয় না।
তবু যা পেয়েছি তার জন্যে নিজের সৌভাগ্যকে ধন্যবাদ দিতে পারি। নিজের বাড়িতে বসে মাত্র দেড়ঘণ্টার মধ্যে ত্রিশ হাজার টাকা লাভ, এটা কল্পনার অতীত! যদিও মণিলালের উচিত ছিল, আরও বেশি দামের পাথর সঙ্গে করে আনা! এ তো সামান্য চুরি নয়, আমাকে দস্তুরমতন নরহত্যা করতে হয়েছে। নরহত্যায় আরও বেশি লাভ হওয়া উচিত। কারণ, নরহত্যায় নিজের জীবন বিপন্ন হয়।
কিন্তু আমার জীবন কি বিপন্ন হয়েছে? নিশ্চয়ই নয়। ঠিকমতো মাথা খাটাতে পারলে নরহত্যায় মতন সহজ ও নিরাপদ ব্যবসা আর নেই। খুনিরা ধরা পড়ে নিজেদের বোকামির জন্যেই। তেমন বোকামি করবার পাত্র আমি নই।
পুলিশ কেমন করে আমাকে ধরবে? এমন কোনও সাক্ষী নেই যে বলতে পারে কাল সন্ধেবেলায় মণিলাল বুলাভাই এসেছিল আমার বাড়িতে। পুলিশ আমার বাড়িতে এলেও, আমাকে সন্দেহ করলেও এমন কোনও সূত্র খুঁজে পাবে না, যার জোরে আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে।
