দিলীপ বললেন, আবার একটা টুপি সৃষ্টি করতে পারব না, সেকথা বলাই বাহুল্য! তবে এটা কীসের অবশিষ্টাংশ, তা বলতে পারি! হয়তো ওর সঙ্গে টুপির কোনওই সম্পর্ক নেই। আসুন বৈঠকখানায়।
বৈঠকখানায় ফিরে এসে তিনি একটি দেশলাইয়ের কাঠি জ্বেলে অঙ্গারের তলায় ধরলেন। অমনি সেটা বেজায় পট-পট শব্দ করে গলে যেতে লাগল এবং তা থেকে খুব ঘন ধোঁয়া উঠল–সঙ্গে-সঙ্গে পাওয়া গেল একটা উগ্র গন্ধ!
স্টেশনমাস্টার বললেন, গন্ধটা বার্নিসের মতো।
দিলীপ বললেন, হ্যাঁ। গালার গন্ধ। আমাদের প্রথম পরীক্ষা সফল হয়েছে। এর পরের পরীক্ষায় কিছু সময়ের দরকার।
তিনি হাতবাক্সের ভিতর থেকে Marsh-এর আর্সেনিক-পরীক্ষার উপযোগী একটি ছোট ফ্লাস্ক একটি Safety Funnel, একটি Escape Tube, একটি দু-পাট তেপায়া, একটি স্পিরিট ল্যাম্প ও একটি অ্যাসবেসটসের চাক্তি বার করলেন। ফ্লাস্কের মধ্যে সেই অঙ্গারীভূত জিনিসের খানিকটা ফেলে তা পরিপূর্ণ করলেন, অ্যালকোহলের দ্বারা। তারপর তেপায়ার উপরে অ্যাসবেসটসের চাক্তিখানা রেখে তার তলায় স্পিরিট-ল্যাম্পটি জ্বেলে দিলেন।
দিলীপ বললেন, অ্যালকোহল গরম হতে থাকুক, ততক্ষণে আমরা আর একটি সন্দেহ মিটিয়ে ফেলতে পারি। শ্ৰীমন্ত, আবার একফেঁটা Farrant ঢেলে আমাকে একখানা স্লাইড এগিয়ে দাও।
দিলুম। দিলীপ টেবিলের ধারেই বসেছিলেন। একটা ছোট সাঁড়াশি দিয়ে টেবিলের আচ্ছাদনী থেকে একটুকরো কাপড় ছিঁড়ে নিয়ে বললেন, মনে হচ্ছে, এই কাপড়ের নমুনা আমরা আগেই পেয়েছি।
কাপড়ের টুকরো স্লাইডের উপরে রেখে তিনি অণুবীক্ষণের মধ্যে দৃষ্টিনিক্ষেপ করলেন। বললেন, হ্যাঁ, ঠিক! এর সঙ্গে আমাদের আগেই চেনাশোনা হয়ে গিয়েছে নীল পশমি তন্তু, নীল কার্পাস, হলদে পাট। আচ্ছা, এবারের নমুনাকে নম্বর মেরে আলাদা করে রাখা যাক, নইলে অন্যগুলোর সঙ্গে গুলিয়ে যেতে পারে।
ইনস্পেকটর চমকৃত হয়ে দিলীপের কার্যকলাপ লক্ষ করছিলেন। তারপর বললেন, আমি এখনও অন্ধ হয়ে আছি, কিছুই দেখতে বা ভালো করে বুঝতে পারছি না। মণিলাল কেমন করে মারা পড়েছেন, আপনি কি তা আন্দাজ করতে পেরেছেন?
হ্যাঁ। আমার অনুমান হচ্ছে, হত্যাকারী মণিলালকে যে-কোনও অছিলায় ভুলিয়ে বাড়ির ভিতরে আনে, তাকে জলখাবার খেতে দেয়। মণিলাল হয়তো, আপনি যে-চেয়ারে বসে আছেন, সেইখানেই বসেছিল। হত্যাকারী সেই লোহার গরাদ নিয়ে তাকে আক্রমণ করে, কিন্তু প্রথম আঘাতেই মণিলালকে বধ করতে পারেনি। তার সঙ্গে হত্যাকারীর ধস্তাধস্তি হয়, তারপর মণিলালকে সে টেবল ক্লথ চাপা দিয়ে মেরে ফেলে। ভালো কথা, আর-একটা মীমাংসা এখনও হয়নি। আপনি এই ফিতার খণ্ডটি চিনতে পারেন?
হ্যাঁ, ওটি আপনি ঘটনাস্থলে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন।
আর সেইজন্যে আপনি আমাকে ঠাট্টা করেছিলেন। যাক, আমি দুঃখিত হইনি। এখন টেবিলের টানার ভিতরে দৃষ্টিপাত করুন। ওই ফিতার কাঠিমটা তুলে নিন। তারপর আমার হাতের এই ফিতার ফঁসের সঙ্গে ওই কাঠিমের ফিতা মিলিয়ে দেখুন!
ইন্সপেক্টর তাড়াতাড়ি কাঠিমটা তুলে নিলেন। দিলীপ ফিতার ফাঁসটা রেখে দিলেন টেবিলের উপরে।
দুই ফিতা মিলিয়ে দেখে ইনস্পেকটর বিপুল উৎসাহে বলে উঠলেন, দুটো ফিতেই এক! মাঝখানটা সবুজ–দুপাশে সরু সাদা রেখা! বাহবা কী বাহবা! মস্তবড় প্রমাণ। দিলীপবাবু, না-জেনে আপনাকে ঠাট্টা করেছি বলে আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
দিলীপ হাসতে হাসতে বললেন, ক্ষমা প্রার্থনার দরকার নেই। ওই নিয়ে খুনি কোন কার্যসাধন করেছিল, আন্দাজ করতে পারেন? তাকে একা লাশটা সামলাতে আর বইতে হয়েছিল। তাই হাত খালি রাখবার জন্যে নিশ্চয়ই সে ছাতা আর ব্যাগটা ফিতা দিয়ে বেঁধে কাঁধে ঝুলিয়ে রেখেছিল।
স্টেশনমাস্টার বললেন, আপনি যেভাবে বর্ণনা করছেন, মনে হচ্ছে যেন আপনিও নিজে ঘটনাস্থলে হাজির ছিলেন। কিন্তু টুপির কী ব্যবস্থা করলেন?
দিলীপ একটি ছোট্ট নল ও একখানা কাচের স্লাইড তুলে নিয়ে বললেন, একটা মোটামুটি পরীক্ষা বোধহয় করতে পারব।
তিনি নলিকাটি ফ্লাস্কের অ্যালকোহলে চুবিয়ে স্লাইডের উপরে ধরলেন। কয়েক ফোঁটা অ্যালকোহল পড়ল। তারপর তার উপরে Cover-Glass বসিয়ে স্লাইডখানা অণুবীক্ষণ যন্ত্রের মধ্যে স্থাপন করলেন।
যন্ত্রে চক্ষু রেখে নিবিষ্ট মনে খানিকক্ষণ পরীক্ষা করে বললেন, মশাই, ফেল্ট বা নেমদ কী দিয়ে তৈরি, জানেন?
ইনস্পেকটর বললেন, না।
উচ্চশ্রেণির ফেল্ট তৈরি হয় খরগোশের চুলে। গালার লেপন দিয়ে চুলগুলো বসানো হয়। যে অঙ্গার আমরা পরীক্ষা করছি তার মধ্যে গালা আছে। অণুবীক্ষণের সাহায্যে বেশ কয়েক গাছা খরগোশের চুলও দেখা যাচ্ছে। আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, এই অঙ্গারগুলো হচ্ছে কোনও ফেল্টহ্যাটের দগ্ধাবশেষ। খরগোশের চুলগুলো যখন রং করা নয়, তখন এ কথাও বলতে পারি, টুপিটার রং ছিল ধূসর।
ঠিক এইসময়ে পদশব্দ শুনে আমরা চমকে উঠে ফিরে দেখি, ঘরের ভিতরে হয়েছে একটি নতুন লোকের আবির্ভাব।
বিপুল বিস্ময়ে সে বলে উঠল, কে আপনারা? কী করছেন এখানে?
ইনস্পেকটর একলাফে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আমরা পুলিশের লোক। তুমি কে?
পুলিশের নাম শুনেও লোকটা একটুও দমল না। বললে, আমি অক্ষয়বাবুর বেয়ারা।
এতক্ষণ তুমি কোথায় ছিলে?
