দিলীপ জবাব দিলেন না। নিজের মনেই আস্তাকুঁড় ঘাঁটতে লাগলেন। সাঁড়াশি দিয়ে দুই-তিনটে কাচের কুচি তুলে, ভালো করে দেখে আবার ফেলে দিলেন। একটু পরে খুঁজে খুঁজে আরও দুই-তিনটে কুচি বার করলেন, তারপর সেগুলো আতসী কাচের সাহায্যে পরীক্ষা করে বললেন, যা খুঁজছিলুম এতক্ষণ পরে তা পেয়েছি! শ্ৰীমন্ত, সেই কাচের কুচি বসানো কার্ড দুখানা বার করো তো!
আমি সেই প্রায়-সম্পূর্ণ পরকলা বসানো কার্ড দুখানা বার করে দিলুম। তারপর তার দু-দিকে রেখে দিলুম দুটো লণ্ঠনও।
দিলীপ কিছুক্ষণ সেইদিকে অপলক-চোখে তাকিয়ে থেকে আস্তাকুঁড়ে কুড়িয়ে-পাওয়া কাচের কুচি কয়টা আর একবার পরীক্ষা করতে করতে ইনস্পেকটরকে সম্বোধন করে বললেন, আপনি স্বচক্ষে দেখলেন তো, এই কাচের কুচি আমি এইখান থেকে পেয়েছি?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
আর কার্ডে বসানো পরকলার কাচ আমি কোথা থেকে পেয়েছি তাও জানেন তো?
হ্যাঁ মশাই। ওগুলো হচ্ছে মণিলালের চশমার কাচ। ওগুলো আপনি রেলপথ থেকে কুড়িয়ে এনেছেন।
বেশ! এইবারে ভালো করে দেখুন।
ইনস্পেকটর ও স্টেশনমাস্টার আরও সামনের দিকে এগিয়ে এলেন, সাগ্রহে।
কার্ডের একখানা পরকলার দুই জায়গায় ও আর-একখানা পরকলার এক জায়গায় ফাঁক ছিল।
দিলীপ হাতের তিনটে কাচের কুচি দুখানা পরকলার ফাঁকে-ফাঁকে বসিয়ে দিলেন– সঙ্গে-সঙ্গে কার্ডের চশমার কাচ দুখানা হয়ে উঠল একেবারে সম্পূর্ণ!
ইনস্পেকটর রুদ্ধশ্বাসে বললেন, হে ভগবান, এ কী ব্যাপার? ওই কাচের কুচি যে এখানে পাওয়া যাবে, কেমন করে জানলেন?
সেকথা পরে সব শুনবেন। আপাতত, আমি বাড়ির ভিতরে যেতে চাই। ওখানে গিয়ে আশাকরি আমি একটা পোেড়া সিগারেট বা সিগারেটের খানিকটা দেখতে পাব! আরও কী কী পেতে পারি জানেন? ক্রিম-ক্র্যাকার বিস্কুট, হয়তো Wimco-র ঘোড়ামুখওয়ালা Club Quality দেশলাইয়ের কাঠি, এমনকী হয়তো মণিলালের হারানো টুপিটাও। এখনও বাড়িতে ঢুকতে আপনার আপত্তি আছে? মনে রাখবেন, আজ বাদে কাল এলে হয়তো আমরা জিনিসগুলোর কোনওটাই আর দেখতে পাব না।
ইনস্পেকটর পুলিশের সমস্ত আইনকানুন বিলকুল ভুলে গেলেন। বিপুল আগ্রহে বাড়ির পিছনকার দরজার উপরে ধাক্কা মেরে বললেন, ভিতর থেকে বন্ধ। ঢুকতে গেলে ভাঙতে হবে। কিন্তু আমাদের পক্ষে সেটা নিরাপদ নয়।
তবে সদরের দিকে চলুন।
কিন্তু সেখানকার দরজায় তো কুলুপ লাগানো।
আসুন না।
সবাই আবার পাঁচিল টপকে সদরের দিকে এলুম। দিলীপ আমাদের দিকে পিছন ফিরে সদর দরজায় সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং পকেট থেকে কী যেন একটা বার করে নিলেন।
পরমুহূর্তে দিলীপের হাতের ঠেলায় দরজাটা দু-হাট হয়ে খুলে গেল। ইনস্পেকটর দুই চক্ষু বিস্ফারিত করে বললেন, অ্যাঁ!
ভিতরে আসুন।
দিলীপবাবু, আপনি যদি চোর হতেন।
তা হলে আপনাদের চাকরি হয়তো থাকত না। এখন ভিতরে আসুন।
দিলীপের পিছনে-পিছনে আমরা সবাই বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলুম।
ঢুকেই ডানদিকে একটি ঘর–বৈঠকখানা। একটা ঝোলানো ল্যাম্প জ্বলছে। নিচে কার্পেট পাতা। সোফা, কৌচ ও টেবিল প্রভৃতি দিয়ে ঘরখানা সাজানো। কোথাও কোনও বিশৃঙ্খলা নেই।
এক কোণে একটা তেপায়ার উপরে রয়েছে একটি বিস্কুটের বাক্স। তার উপরে বড় বড় ছাপানো হরফে বিস্কুটের নাম–ক্রিম-ক্র্যাকার।
দিলীপ আঙুল দিয়ে সেইদিকে ইনস্পেকটর দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন।
ইনস্পেকটর একেবারে থ। বিস্মিতকণ্ঠে বললেন, অবাক কাণ্ড বাবা!
স্টেশনমাস্টার বললেন, এ-বাড়িতে যে ক্রিম-ক্র্যাকার বিস্কুট পাওয়া যাবে, একথা কে আপনাকে বলল?
কেউ বলেনি।
তবে কী করে জানলেন?
খুব সহজে। শুনলে আপনি হতাশ হবেন। বলেই দিলীপ এদিকে-ওদিকে তাকাতে-তাকাতে ঘর ছেড়ে একটা দালানে গিয়ে দাঁড়ালেন। তারপর হেঁট হয়ে দুটো কী কুড়িয়ে নিলেন।
ইনস্পেকটর বললেন, কী পেলেন?
যা পাবার আশা করেছিলুম। একটা পায়ে ঘঁাতলানো পোড়া সিগারেটের অংশ, আর একটা দেশলাইয়ের কাঠি।
ইনস্পেকটর বললেন, না মশাই, এইবারে আমি হার মানলুম। এমন ব্যাপার কস্মিনকালেও দেখিনি।
দিলীপ বললেন, মণিলালের স্টেট-এক্সপ্রেস তামাকের থলি, জিগজ্যাগ সিগারেটের কাগজ আর কিঞ্চিৎ অসাধারণ দেশলাইয়ের বাক্স আপনার কাছেই আছে তো?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
তা হলে তাদের সঙ্গে এখানে পাওয়া এই জিনিসগুলি মিলিয়ে দেখুন।
ইনস্পেকটর কথামতো কাজ করে সচিৎকারে বলে উঠলেন, একই তামাক, একই কাগজ, একই দেশলাইয়ের কাঠি! দিলীপবাবু, আপনি কি জাদুকর? বাকি রইল খালি টুপিটা! সেটাও কি এখানে আছে?
জানি না। অন্তত, এ-ঘরে বলে মনে হচ্ছে না। তবে এখনও আমি হতাশ হইনি। আসুন, খুঁজে দেখি।
ঘর থেকে গেলুম দালানে। সেখানেও টুপির চিহ্ন নেই।
পাশেই আর-একটি ঘর। দিলীপ উঁকি মেরে দেখে বললেন, রান্নাঘর। একবার ঢুকেই দেখা যাক না।
রান্নাঘরের চারিদিকে একবার ঘুরে উনুনের কাছে গিয়ে দিলীপ কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর বললেন, উনুনের ভিতরটা দেখুন। ওগুলো কী?
ইনস্পেকটর স্বহস্তে উনুনটা পরীক্ষা করতে করতে বললেন, উনুনটা এখনও তপ্ত! একটু আগেও এর মধ্যে আগুন ছিল। কয়লার সঙ্গে এখানে কাঠও পোড়ানো হয়েছিল দেখছি। কিন্তু এগুলো কী? এই ডেলা-পাকানো কালো জিনিসগুলো কাঠও নয়, কয়লাও নয়। খুনি টুপিটা উনুনে পুড়িয়ে ফেলেনি তো? কে জানে? পুড়িয়ে ফেলে থাকলে আর উপায় নেই! আপনি কাচচূর্ণ দিয়ে পরকলা খাড়া করেছেন বটে, কিন্তু খানিকটা অঙ্গার থেকে একটা আস্ত টুপি তো আর গড়তে পারবেন না? অসম্ভব আর কেমন করে সম্ভব হবে বলুন! তিনি একমুঠো কালো স্পঞ্জের মতন অঙ্গার তুলে দিলীপের সামনে ধরে দেখালেন। তারপর আবার বললেন, পারেন এ-থেকে একটা গোটা টুপি সৃষ্টি করতে?
