তাড়াতাড়ি জিনিসপত্তর গুছিয়ে নিয়ে আমরা বাড়ির সামনের দিকে গিয়ে হাজির হলুম। সেখানে ইনস্পেকটর ও স্টেশনমাস্টার দাঁড়িয়েছিলেন কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতো।
ইন্সপেক্টর বললেন, বাড়ির ভিতরে আলো জ্বলছে, কিন্তু বাড়িতে কেউ নেই, সদরে কুলুপ দেওয়া। এত ডাকলুম, এত কড়া নাড়লুম–কেউ সাড়া দিল না। আর এখানে দাঁড়িয়ে থেকেই বা কী স্বর্গলাভ হবে, তা জানি না। টুপিটা নিশ্চয়ই রেললাইনের কাছাকাছি কোথাও পড়ে আছে, কাল সকালের আলোয় খুঁজে পাওয়া যাবে।
দিলীপ কোনও কথা না বলে এগিয়ে গিয়ে আরও দু-চারবার কড়া নাড়লেন।
ইনস্পেকটর বিরক্তকণ্ঠে বললেন, আমি বলছি বাড়ির ভিতরে কেউ নেই, তবু আপনার বিশ্বাস হল না? বলেই তিনি ক্রুদ্ধভাবে স্টেশনমাস্টারের হাত ধরে চলে গেলেন।
দিলীপ হাসিমুখে লণ্ঠন তুলে এদিকে-ওদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিপাত করতে করতে বাগানের ফটকের কাছে এসে দাঁড়ালেন। তারপর হেঁট হয়ে মাটির উপর থেকে একটা জিনিস তুলে নিলেন।
শ্ৰীমন্ত, এটি হচ্ছে অত্যন্ত শিক্ষাপ্রদ জিনিস। এই বলে দিলীপ আমার সামনে যা তুলে ধরলেন, তা হচ্ছে একটা আধপোড়া সিগারেট!
শিক্ষাপ্রদ জিনিস? এর দ্বারা তুমি কী জ্ঞানলাভ করবে?
অনেক। চেয়ে দ্যাখো, এটা হচ্ছে হাতে-পাকানো সিগারেট! বাজারে হাতে-পাকানো সিগারেটের জন্যে যে জিগজ্যাগ কাগজ পাওয়া যায়, তাই এতে ব্যবহার করা হয়েছে। মণিলালেরও পকেট থেকে এই কাগজের প্যাকেট পাওয়া গিয়েছে! এইবার দেখা যাক, সিগারেটের তামাক কোন শ্রেণির!
দিলীপ একটি আলপিন দিয়ে সিগারেটের একপ্রান্ত থেকে খানিকটা তামাক বার করে নিয়ে দেখে বললেন, স্টেট-এক্সপ্রেস টোবাকো! চমৎকার! মণিলালের রবারের থলির ভিতরেও ঠিক এই তামাক পাওয়া গিয়েছে! কে বলতে পারে, মণিলালই এই সিগারেটটা নিজের হাতে পাকায়নি! আরে, মাটিতে ওটা আবার কী পড়ে রয়েছে? হেঁট হয়ে সেটা তুলে নিয়ে বললেন, একটা দেশলাইয়ের কাঠি! শ্ৰীমন্ত, মণিলালের পকেট থেকে কোন মার্কার দেশলাই বেরিয়েছিল লক্ষ করেছিলে কি?
না।
Wimco-র Club Quality দেশলাই, উপরে ঘোড়ার মুখের ছবি। সে-দেশলাই কিঞ্চিৎ অসাধারণ, কলকাতার বাঙালি পাড়ায় বিকোয় না, সাহেবরা খুব ব্যবহার করে। বাংলার পল্লিগ্রামেও সে-দেশলাই কেউ দেখেনি। তার কাঠিগুলো হচ্ছে অতিরিক্ত মোটা, Wimco র অন্য কোনও মার্কার দেশলাইতেই অত মোটা কাঠি থাকে না। আমার হাতের কাঠিটিও তাই। এটাও যে মণিলালের দেশলাইয়ের বাক্স থেকে বেরিয়েছে, পরে মিলিয়ে দেখলেই বুঝতে পারবে। শ্ৰীমন্ত, আমার অত্যন্ত সন্দেহ হচ্ছে যে, মণিলালকে খুন করা হয়েছে এই বাড়ির ভিতরেই।
আমরা আবার বাড়ির খিড়কির দিকে গিয়ে হাজির হলুম।
সেখানে দাঁড়িয়ে ইনস্পেকটর অসন্তুষ্টস্বরে স্টেশনমাস্টারের সঙ্গে কথা কইছিলেন। আমাদের দেখে বললেন, চলুন, এইবারে ফিরে যাই। মিছে কাদা ঘেঁটে মরবার জন্যে কেনই বা এখানে এলুম-আরে, আরে, ও কী! না, মশাই খবরদার!
দিলীপ তখন লাফিয়ে উঠেছেন বাগানের নিচু পাঁচিলের উপরে। ইনস্পেকটরের কথা শেষ হওয়ার আগেই তিনি ওপাশে নেমে গিয়ে দাঁড়ালেন।
ইনস্পেকটর বললেন, বিনা হুকুমে পরের বাড়িতে আপনাকে আমি ঢুকতে দিতে পারি ना।
দেওয়ালের উপরে মুখ তুলে দিলীপ বললেন, শুনুন মশাই, শুনুন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, মণিলাল বুলাভাই মৃত্যুর ঠিক আগেই এই বাড়ির ভিতরে এসেছিলেন–আমি তার অনেক প্রমাণ পেয়েছি। হয়তো তাঁকে এই বাড়ির ভিতরেই খুন করা হয়েছে। সময় হচ্ছে মূল্যবান, দেরি করলে সমস্ত সূত্র নষ্ট হয়ে যেতে পারে। আপাতত না দেখেশুনে আমি একেবারে বাড়ির ভিতরেও ঢুকতে চাই না। এখানে দেখছি একটা আস্তাকুঁড় রয়েছে। আমি আগে ওই আস্তাকুঁড়টা পরীক্ষা করতে চাই!
.
পঞ্চম
ইনস্পেকটর চমকে উঠে সবিস্ময়ে বললেন, আস্তাকুঁড়! আপনি আস্তাকুঁড় ঘাঁটতে চান? বলেন কী মশাই? আপনার মতন আশ্চর্য লোক আমি জীবনে দেখিনি! ভালো, আস্তাকুঁড় ঘেঁটে আপনার কী লাভ হবে শুনি?
আমার সন্দেহ হচ্ছে, ওই আস্তাকুঁড়ের ভিতরে আমি একটা তারার নকশাকাটা ভাঙা কাচের গেলাসের টুকরো পাব। আস্তাকুঁড়ে বা এই বাড়ির ভিতরে ওই গেলাসের টুকরো পাওয়া যাবে বলেই মনে করি।
ইনস্পেকটর হতভম্বের মতন বললেন, ভাঙা গেলাসের টুকরোর সঙ্গে এ-মামলার কী সম্পর্ক, কিছুই তো বোঝা যাচ্ছে না। বোঝা যাচ্ছে কি স্টেশনমাস্টারমশাই?
স্টেশনমাস্টার বোকার মতন ঘাড় নেড়ে বললেন, উঁহু!
বেশ, দেখা যাক দিলীপবাবুর অবাক কাণ্ড-কারখানা! ইনস্পেকটরও পাঁচিল ডিঙোলেন। স্টেশনমাস্টারের সঙ্গে-সঙ্গে আমিও বাগানের ভিতরে গিয়ে দাঁড়ালুম।
সামনেই রয়েছে একটা আস্তাকুঁড়ের মতন জায়গা–তার মধ্যে পুঞ্জীভূত হয়ে আছে। সব নোংরা জঞ্জাল।
দিলীপ বাঁ-হাতে লণ্ঠন নিয়ে ডানহাতে একটা কাঠি দিয়ে মিনিটখানেক জঞ্জালগুলো নাড়াচাড়া করে কতকগুলো ছোট-বড় কাচের টুকরো টেনে বার করে আনলেন।
তারপর ফিরে উৎসাহিত কণ্ঠে বললেন, দেখুন।
স্পষ্ট দেখা গেল, দুই-তিনটে বড় টুকরোর উপরে রয়েছে নকশাকাটা তারকা!
ইনস্পেকটর প্রথমটা স্তম্ভিতের মতন স্তব্ধ হয়ে রইলেন। তিনি যেন নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তারপর বললেন, কী করে যে আপনি জানলেন কিছুই বুঝতে পারছি না। এরপর আপনি যে আরও কী ভেলকি দেখাতে চান, তাও বুঝতে পারছি না!
