স্লাইডখানা দু-একবার সরিয়ে আবার বললেন, আমাদের বরাত ভালো শ্ৰীমন্ত! যা খুঁজছি, পেয়েছি, এক-একটা টুকরোর উপরে কোনও নকশার অংশ খোদা রয়েছে। এই যে আর-একটা টুকরো–এই উপরে নকশার বেশ খানিকটা বোঝা যাচ্ছে। এইবার ধরতে পেরেছি! তারার নকশা-আঁকা কোনও কাচের গেলাস ভেঙে এই কাচচূর্ণের সৃষ্টি হয়েছে। শ্ৰীমন্ত, তুমিও একবার দেখে নাও!
আমিও অণুবীক্ষণে দৃষ্টি সংলগ্ন করতে যাচ্ছি, এমনসময়ে এসে পড়লেন ইনস্পেকটর ও স্টেশনমাস্টার। কাচের গুঁড়ো, বাক্স ও অণুবীক্ষণ নিয়ে আমাদের চুপ করে অমনভাবে বসে থাকতে দেখে ইনস্পেকটর উচ্চহাস্য সংবরণ করতে পারলেন না।
তারপর বোধকরি অভদ্রতা হচ্ছে ভেবেই কিঞ্চিৎ লজ্জিতভাবে বললেন, আমি হেসে ফেললুম বলে কিছু মনে করবেন না, মশাই! পুলিশের কাজে চুল পাকিয়ে ফেললুম কিনা, কাজেই এসব যেন কেমন-কেমন লাগে! অণুবীক্ষণ ভারি মজার জিনিস বটে, কিন্তু এরকম মামলায় আপনাদের একধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে না–পারবে কি?
দিলীপ বললেন, হয়তো পারবে না। কিন্তু ওকথা যাক। টুপিটা কোথাও খুঁজে পেলেন?
ইনস্পেকটরের মুখ যেন চুন হয়ে গেল। মাথা চুলকোতে-চুলকোতে বললেন, খুঁজে পাইনি।
আচ্ছা, তা হলে একটু অপেক্ষা করুন, আমরাও আপনাদের সাহায্য করব।
দিলীপ দুখানা কার্ডের উপরে ফোঁটা-কয়েক Xylolbalsam ফেললেন–পরকলায় কাচের কুচিগুলো যাতে স্থানচ্যুত না হয়। তারপর সমস্ত জিনিস বাক্সের মধ্যে পুরে স্টেশনমাস্টারকে জিজ্ঞাসা করলেন, এখানে সবচেয়ে কাছে আছে কোন গ্রাম?
আধ-মাইলের ভিতরে কোনও গ্রাম নেই।
রাস্তা?
একটা নতুন রাস্তা তৈরি হচ্ছে বটে। এখান থেকে একটু দূরে একখানা মাত্র বাড়ি আছে, রাস্তাটা তার সামনে দিয়েই গিয়েছে।
কাছাকাছি আর কোনও বাড়ি আছে?
না। আধ-মাইলের মধ্যে ওইখানাই হচ্ছে একমাত্র বাড়ি।
আচ্ছা, তা হলে বোধহয় ওইদিকেই যাওয়া উচিত। সম্ভবত মণিলাল ওই অসম্পূর্ণ রাস্তা দিয়েই এদিকে এসেছিল।
ইনস্পেকটর এই মতে সায় দিলেন।
.
চতুর্থ
পোড়ো জমি। কোথাও আদুড় মাটি, কোথাও বুনো ঘাস, কোথাও কচুবন, কোথাও বিছুটির জঙ্গল। পথ বা রাস্তা নেই। ঝিঁঝি ডাকছে আড়াল থেকে। জোনাকি জ্বলছে মাথার উপরে। চারিদিকে অন্ধকার–কেবল আমাদের সুমুখ ও আশপাশ থেকে অন্ধকার সরে-সরে যাচ্ছে– যেন আলো দেখে ভয় পেয়ে।
যেখানে ঝোপ পান, ইনস্পেকটর তার ভিতরেই পা ছোড়েন, পদাঘাত করেন যদি তার ভিতরে হারানো টুপিটা আত্মগোপন করে থাকে!
খানিকক্ষণ পরে আমরা একখানা বাড়ির পিছনদিকে এসে দাঁড়ালুম। চারিধারে তার নিচু দেওয়াল-ঘেরা বাগান।
বাগানের পিছনকার দেওয়ালের তলায় ছিল আর একটা বিছুটির জঙ্গল ও ইনস্পেকটর তারও এখানে-ওখানে পা ছুঁড়তে লাগলেন।
আচমকা আর্তনাদ শুনলুম–ওরে ব্বাপ রে, গেছি রে, উ-হুঁ-হুঁ-হুঁ!
কী ব্যাপার, কী ব্যাপার?
ইনস্পেকটর একখানা পায়ে হাত বুলাতে বুলাতে কাতরস্বরে বললেন, কোন হারামজাদা, কোন রাস্কেল, কোন গাধা বিছুটির জঙ্গলে এটা ফেলে রেখেছে?
দিলীপ হেঁট হয়ে জিনিসটা তুলে নিয়ে বললেন, একটা লোহার গরাদ। এর গায়ে মর্চে-টর্চে কিছুই নেই। তার মানে বিছুটির গাদায় এ বেশিক্ষণ থাকেনি।
ইনস্পেকটর গর্জন করে বললেন, বেশিক্ষণ কি অল্পক্ষণ আমি জানতে চাই না মশাই, কিন্তু আমার ঠ্যাং আর একটু হলেই খোঁড়া হয়ে যেত। ওই ডান্ডাটা যে ফেলেছে, তাকে যদি একবার হাতের কাছে পাই!
ইন্সপেক্টরের দুর্ভাগ্যে কোনওরকম সহানুভূতি প্রকাশ না করে দিলীপ একমনে ডান্ডাটা পরীক্ষায় নিযুক্ত হলেন। কিন্তু কেবল সেই পরীক্ষাতেই তার মন বোধকরি তুষ্ট হল না, কারণ তারপর তিনি আবার আতসী-কাচ বার করে ডান্ডাটাকে আরও ভালো করে দেখতে লাগলেন।
তাই দেখে ইনস্পেকটর এত বেশি উত্যক্ত হয়ে উঠলেন যে, সে-দৃশ্য আর সহ্য করতে পারলেন না। খোঁড়াতে-খোঁড়াতে এগিয়ে বাড়ির আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। স্টেশনমাস্টারও করলেন তাঁর অনুসরণ ভদ্রলোকের মুখ দেখে মনে হল, তিনি আমাদের অদ্ভুত জীব বলেই মনে করছেন। অল্পক্ষণ পরেই শুনলুম, বাড়ির সদরের কড়া ঘন-ঘন নড়ছে–সঙ্গে-সঙ্গে ইনস্পেকটরের হাঁক-ডাক!
দিলীপ বললেন, শ্ৰীমন্ত, একফোঁটা Farrant ঢেলে আমাকে একখানা স্লাইড দাও। এই ডান্ডার ওপরেও দেখছি গাছকয় তন্তু লেগে আছে।
আমি কথামত স্নাইড, Cover-glass, সাঁড়াশি ও শলাকা এগিয়ে দিলুম এবং অণুবীক্ষণ যন্ত্রটা রাখলুম বাগানের নিচু দেওয়ালের উপরে।
অণুবীক্ষণে চোখ লাগিয়ে দিলীপ বললেন, ইনস্পেকটরের দুর্ভাগ্যের জন্যে আমি দুঃখিত। কিন্তু ঝোপের উপরে তাঁর পা ছোঁড়াটা আমাদের পক্ষে হয়েছে অত্যন্ত সৌভাগ্যজনক! একবার অণুবীক্ষণের ভিতরে তাকিয়ে বলল দেখি, কী দেখতে পাচ্ছ?
দেখতে-দেখতে বললুম, রাঙা পশমী তন্তু, নীল কার্পাসসুতোর তন্তু আর কতকগুলো হলদে উদ্ভিজবোধহয় পাটের তন্তু।
দিলীপ প্রফুল্লকণ্ঠে বললেন, হ্যাঁ। মনে আছে তো, মণিলালের দাঁতের ভিতরেও ঠিক এই তিনরকম তন্তু পাওয়া গিয়েছে? তা হলে বোঝা যাচ্ছে, দুই ক্ষেত্রেই তন্তু এসেছে এক জায়গা থেকে। ব্যাপারটাও অনুমান করতে পারছি। যে কাপড় চাপা দিয়ে হতভাগ্য মণিলালের শ্বাসরোধ করা হয়েছিল, এই ডান্ডাটা মোছা হয়েছে বোধহয় সেই কাপড় দিয়েই! আচ্ছা, ডান্ডাটা আপাতত পাঁচিলের ওপরই তোলা থাক–যথাসময়ে এটা কাজে লাগবে। অতঃপর ছলে-বলে কৌশলে যেমন করেই হোক, আমাদের ঢুকতে হবে এই বাড়ির ভিতরে। যে-ইঙ্গিত পেলুম, তাই যথেষ্ট। এসো।
