আমার কাছে এসে মধুর হাসি হেসে সে বললে, আপনিই বুঝি আমার বাবার অতিথি? আপনার নাম কী?
অমলকুমার সেন।
আপনি বুঝি খুব ভয় পেয়েছেন?
এখানে এসে ভয় পায় না, এমন মানুষ দুনিয়ায় আছে নাকি? যে জীবটি এখনই এখান থেকে চলে গেল, তাকে বোধহয় তুমি দ্যাখোনি?
মেয়েটি খিলখিল করে হেসে উঠে বললে, বাঃ, কেন দেখব না?
তা দেখেও জিজ্ঞাসা করতে চাও, কেন আমি ভয় পেয়েছি! অমন আরও কতগুলো চাঁদমুখ তোমরা পিপেয় পুরে বন্ধ করে রেখেছ?
অনেক। তা আর গুনে বলা যায় না।
বলো কী! ওদের নিয়ে তোমরা কী করো?
কী আবার করব? ওদের কেউ আমার বন্ধু, কেউ আমার শত্ৰু, কেউ আমার খেলার সাথি, কেউ আমার বাবা
তোমার বাবা! চাঁদের মতন গোল মুখ, ষোলো হাত লম্বা হাত, পিপের মতন দেহ আর তিনখানা পা, উনিই কি তোমার বাবা?
হ্যাঁ গো হা, উনিই আমার বাবা!
কিন্তু তুমি তো দেখছি আমাদেরই মতন মানুষ!
যা দেখছেন এ চেহারা আমার আসল চেহারা নয়।
আমি হতভম্বের মতন বললুম, তার মানে?
আমি আমার পূর্বপুরুষদের চেহারা নকল করেছি। আমার নিজের চেহারা আমি পছন্দ করি না।
মেয়েটি পাগলি নাকি! চেহারার আবার আসল নকল কী? বললুম, তোমার আসল চেহারা কীরকম শুনি?
ওই বাবার মতনই আর কী! তবে বাবার গোঁফ আছে, আমার নেই! মাঝে-মাঝে আমাকেও সেই মূর্তি ধারণ করতে হয়, কারণ এই নকল দেহ নিয়ে বেশিক্ষণ থাকা চলে না। কষ্ট হয়।
মেয়েটি বলে কী? পূর্বপুরুষদের চেহারার নকল, বাবার মতন মূর্তি ধারণ,–এসব উদ্ভট কথা শুনলেও যে পেটের পিলে চমকে ওঠে! এ কি আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছে? কিন্তু তার সরল নির্দোষ শিশু-মুখের পানে তাকালে তো সেকথা মনে হয় না। তবে আমি কি সত্য সত্যই কোনও প্রেতলোকে এসে পড়েছি? পৃথিবীর অনেক বড় বড় পণ্ডিত বলেন, ইহলোকের পর পরলোক বলে যে জগৎ আছে, সেখানে প্রেত আর প্রেতিনী বাস করে। এই কি সেই পরলোক? জুজু-পাহাড়ের খাদের মধ্যে পড়ে গিয়ে আমার কি অনেকক্ষণ আগেই মৃত্যু হয়েছে– এখন কি আমিও ইহলোকের মানুষ নই এবং এই ভয়ানক সত্য কথাটা এখনও বুঝতে পারিনি? না, গল্পের বিখ্যাত অ্যালিসের মতন আমিও এখন ওয়ান্ডারল্যান্ডে ঘুরে বেড়াচ্ছি নিজের অজ্ঞাতসারে স্বপ্নের ঘোরেই?..কিন্তু মনের এই সব দুর্ভাবনা আমি মুখে না প্রকাশ করেই বললুম, তাহলে তুমিও পিপের ভেতরে থাকো?
হাঁ। কাছিমরা যেমন খোলের ভেতরে থাকে, আমরাও তেমনি পিপের ভেতরে থাকি। তবে তোমাদের মতন তো আমাদের দেহে হাড় নেই, তাই ইচ্ছে করলেই যে কোনওরকম মূর্তি ধারণ করতে পারি। আমাদের দেহ হচ্ছে রবারের মতন–খুশিমতন কমানো বাড়ানো যায়। এই দ্যাখো না–বলেই সে গলাটাকে ক্রমেই বেশি লম্বা করতে লাগল। দেখতে দেখতে তার গলাটা আমাদের রাস্তায় জল দেওয়ার নলের মতন এতটা লম্বা হয়ে উঠল যে, তার মাথাটা জানলার বাইরে গিয়ে হাজির হল!
আমি ভয়ানক ভড়কে গিয়ে খুব চেঁচিয়ে বললুম, থামো থামো–আর দেখতে পারি না, আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে!
এক মুহূর্তে তার গলা গেল আবার ছোট্ট হয়ে এবং তার মাথাটা হাসতে-হাসতে রবারের বলের মতন এক লাফে আবার যথাস্থানে এসে হাজির!
সে বললে, আবার ইচ্ছে করলে আমার চোখ দুটোকে নিয়ে এইভাবে খেলা করতে পারিকথা শেষ হবার আগেই তার চোখ দুটো কোটর থেকে প্রায় ছয় ইঞ্চি বেরিয়ে এসেই আবার সুড়সুড় করে নিজের কোটরে ফিরে গেল!
আতঙ্কে আমার প্রাণ ধড়ফড় করতে লাগল! রূপকথার রাক্ষস-রাক্ষসীরা খুশিমতন নানারকম মূর্তি ধারণ করতে পারে, তবে কি আমি কোনও রাক্ষস রাজ্যে এসে পড়েছি? আমার মাথার চুল ও গায়ের রোমগুলো পর্যন্ত খাড়া হয়ে উঠল! এখন যে আর স্বপ্ন দেখছি না, এটুকু আমি বেশ বুঝেছি, কিন্তু…কিন্তু…এসব কী অসম্ভব কাণ্ড!
মিনতি ভরা স্বরে বললুম, লক্ষ্মীমেয়েটি, তুমি অমন করে আর আমাকে ভয় দেখিয়ে, তার চেয়ে আমাকে একেবারে মেরে ফ্যালো!
সে আবার খিলখিল করে হেসে উঠে বললে, ও! বুঝেছি, এসব দেখলে তুমি ভয় পাও? আচ্ছা, এই ঘাট মানছি, আর এ কাজ করব না! কিন্তু সত্যি বলছি, এতে ভয় পাবার কিছু নেই, এখানে দুদিন থাকলেই সব তোমার অভ্যাস হয়ে যাবে! এখন তাহলে আসি। সে চলে গেল।
মেয়েটি দেখছি ভারি গায়েপড়া! এই একটু আগে আপনি বলছিল, আর এখনই তুমি বলতে শুরু করেছে। কাল থেকেই হয়তো আমাকে তুইতোকারি করবে!
হঠাৎ দরজার দিকে চেয়েই দেখি, চাঁদমুখো পণ্ডিতমশাই তিনপায়ে দাঁড়িয়ে পিপের ভিতর থেকে মুখ টিপে টিপে হাসছেন।
তিনি বললেন, কী, অমন করে জড়সড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছ যে? কমলা বুঝি তোমার সঙ্গেও দুষ্টুমি করছিল? হ্যাঁ, ও দুষ্টুমি না করে থাকতে পারে না! তারপর? কমলার চেহারা বোধহয় তোমার খুব পছন্দ হয়েছে? তা তো হবেই! তোমার মতে ওইরকম চেহারাই খুব সুন্দর! কিন্তু আমরা তা বলি না। কেন বলি না জানো? আচ্ছা সংক্ষেপে আগে আমাদের ইতিহাস শোনো!
.
অষ্টম। জুজু রাজ্যের ইতিহাস
পণ্ডিতমশাই বলতে লাগলেনঃ
জানো তো, বাংলার বিজয়সিংহ সমুদ্রপথে সিংহলে এসে বাহুবলে সেখানকার রাজা হন? আমাদের পূর্বপুরুষরা ছিলেন সেই সিংহল জেতা বিজয়সিংহের সঙ্গে।
সমুদ্রে হঠাৎ ঝড় উঠে বিজয়সিংহের নৌবাহিনীর একখানা জাহাজকে বিপথে নিয়ে যায়। অনেকদিন সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে সেই জাহাজখানা শেষটা আফ্রিকায় এসে কুল পায়।
