দৃষ্টিকে যথাসম্ভব তীক্ষ্ণ করে তুলে কাচের কণা খুঁজতে খুঁজতে বললুম, এর কারণ আমি বুঝতে পারছি না।
দিলীপ বললেন, পারছ না? বেশ, টুকরোগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখো। এদের মধ্যে কতকগুলো, আকারে বড়, কতকগুলো কণা-কণা। তারপর পরিমাণটাও লক্ষ করো। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, যে-অবস্থায় চশমাখানা ভেঙেছে, তার সঙ্গে এই কাচের গুঁড়োগুলো ঠিক মিলছে না। এগুলো হচ্ছে পুরু নদের (concave) কাচ, ভেঙে গুঁড়িয়ে গিয়েছে। কিন্তু কেমন করে ভেঙেছে? কেবল যে পড়ে গিয়েই ভেঙেছে তা মনে হয় না। তা যদি ভাঙত তা হলে এখানে মাত্র খানকয়েক বড় বড় টুকরো কাচ পাওয়া যেত। এগুলো ভারী মালগাড়ির চাকার চাপেও ভাঙেনি। কারণ তাহলে কাচগুলো হয়ে যেত পাউডারের মতন আর সেই পাউডার আমরা লাইনের উপরেও দেখতে পেতুম। কিন্তু লাইনের উপরে তার কোনও চিহ্নই নেই! সেই চশমার ফ্রেমখানার কথাও ভেবে দ্যাখো। সেক্ষেত্রেও এমনি অসঙ্গতি। কেবল পড়ে গেলে ফ্রেমখানা এত বেশি মুচড়ে ভাঙত না, আবার তার উপর দিয়ে রেলগাড়ির চাকা চলে গেলে ফ্রেমখানার অবস্থা যত বেশি শোচনীয় হত তা-ও হয়নি।
তা হলে তুমি কী বলতে চাও দিলীপ?
মনে হয়, চশমাখানা মানুষের পায়ের তলায় দলিত হয়েছে। আমাদের অনুমান যদি ভুল না হয়, তা হলে বলতে হবে, দেহটাকে যখন এখানে বহন করে আনা হয়েছে, চশমাখানাকেও আনা হয়েছে, সেই সময়ে। আর ভাঙা অবস্থাতেই। সম্ভবত, হত্যাকারীর সঙ্গে যখন মণিলালের ধস্তাধস্তি চলছিল চশমাখানা পদদলিত হয়েছিল সেই সময়ই, তারপর মৃতদেহের সঙ্গেই হত্যাকারী চশমার চূর্ণাবশেষও এখানে নিয়ে এসেছে।
আমি বোধকরি বোকার মতোই জিজ্ঞাসা করলুম, কিন্তু কেন?
এটুকু তোমার বুঝে নেওয়া উচিত। এখন দ্যাখো। আমরা যদি এখানকার প্রত্যেক কাচ কণা কুড়িয়ে নিয়েও দেখি পুরো চশমার কাচ পাওয়া গেল না, তা হলে বুঝতে হবে বাকি কাচচূর্ণ আছে আসল ঘটনাস্থলেই। কিন্তু আমাদের সংগৃহীত কাচের কণার দ্বারা যদি দুখানা পরকলা সম্পূর্ণ হয় তা হলে মানতেই হবে যে, চশমাখানা ভেঙেছে এইখানেই।
আমরা যখন কাচচূর্ণ সংগ্রহ করছিলুম, ইনস্পেকটর ও স্টেশনমাস্টার তখন এক-একটা লণ্ঠন নিয়ে মণ্ডলাকারে ঘুরে-ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন অদৃশ্য টুপিটাকে দৃশ্যমান করবার জন্যে।
লণ্ঠনের আলোয় আতসী কাচের সাহায্য নিয়েও আর-এককণা কাচও পাওয়া গেল না। স্টেশনমাস্টারকে সঙ্গে নিয়ে ইনস্পেকটর তখন লাইন ধরে অনেক দূরে এগিয়ে গিয়েছেন– অন্ধকারের মুল্লুকে তাদের হাতে ঝোলানো লণ্ঠন দুটো দেখাচ্ছিল নৃত্যশীল আলেয়ার মতো।
দিলীপ বললেন, আমাদের বন্ধুরা ফিরে আসবার আগেই এখানকার কাজ শেষ করে ফেলতে হবে। তারের বেড়ার কাছে চলো। ঘাসের ওপরে হাতবাক্সটা রাখো, আপাতত ওটাই হবে আমাদের টেবিল।
বাক্সের উপরে দিলীপ আগে একখানা কাগজ পাতলেন, পাছে বাতাসে সেখানা উড়ে যায়, সেই ভয়ে চারখানা পাথর কুড়িয়ে কাগজের চার কোণে চাপা দেওয়া হল। তারপর খামের ভিতর থেকে কাচের কণা ও চূর্ণগুলোকে কাগজের উপরে ঢেলে দিলীপ কিছুক্ষণ তাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন নীরবে।
হঠাৎ তার মুখে ফুটে উঠল একটা অদ্ভুত ভাব। নিজের কার্ডকেসের ভিতর থেকে তিনি দুখানা ভিজিটিং কার্ড বার করলেন। তারপর অপেক্ষাকৃত বড় কাচের টুকরোগুলোকে একে-একে বেছে নিয়ে দুখানা কার্ডের উপরে সাজিয়ে রাখতে লাগলেন।
চটপটে কৌশলী হাতে দুখানা কার্ডের উপরে তিনি ডিম্বাকারে কাচের কণাগুলোকে পরস্পরের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে গড়ে তুললেন প্রায়-সম্পূর্ণ দুখানা পরকলা। দিলীপের মুখের ভাব দেখে আমিও উত্তেজিত হয়ে উঠলুম। বেশ বোঝা গেল, এখনি একটা কোনও নতুন আবিষ্কারের সম্ভাবনা!
কাগজের উপরে তখনও অনেকখানি কাচের কুচি পড়ে রয়েছে। কিন্তু তা এত সূক্ষ্মভাবে চূর্ণ হয়ে গিয়েছে যে, তার দ্বারা আর কিছু গড়ে তোলা অসম্ভব।
দিলীপ হাত গুটিয়ে বসে মৃদুস্বরে হাস্য করলেন।
তারপর বললেন, এতটা আমি আশা করিনি।
আমি বললুম, কী?
তুমি কি দেখেও বুঝতে পারছ না? বড় বেশি পরিমাণে কাচ রয়েছে। আমরা দুখানা পরকলা প্রায় সম্পূর্ণ করে তুলেছি, তবু এতখানি কাচের গুঁড়ো ব্যবহার করতে হল না।
চেয়ে দেখলুম, সত্যিই তাই! যে চূর্ণগুলো ব্যবহার করা হয়নি, তার দ্বারা হয়তো আরও দু-তিনখানা পরকলা তৈরি করা যায়। বললুম, ভারি আশ্চর্য তো! এর মানে কী?
দিলীপ বললেন, আমরা যদি বুদ্ধিমানের মতো প্রশ্ন করি, কাচের কুচিগুলোই হয়তো সঠিক উত্তর দেবে!
দিলীপ কাগজ ও কার্ড দুখানা তুলে সাবধানে জমির ওপরে রাখলেন। তারপর বাক্সের ডালা খুলে বার করলেন অণুবীক্ষণ। তারপর একখানা স্লাইডের উপরে বাড়তি কাচচুর্ণগুলোকে রেখে, লণ্ঠনের আলোতে অণুবীক্ষণের ভিতর দিয়ে পরীক্ষা করতে লাগলেন।
তারপর তিনি উচ্চস্বরে বললেন, হু, রহস্যের অন্ধকার ঘনীভূত হয়ে উঠল। এখানে কাচ দেখতে পাচ্ছি খুব বেশি আর খুব কম। অর্থাৎ এর ভিতরে চশমার কাচ আছে মাত্র দু-এক টুকরো। এই দু-এক টুকরো গ্রহণ করলেও আমাদের পরকলা দুখানা সম্পূর্ণ হবে না; কারণ বাকি কাচচুর্ণগুলো চশমার নয়–তা হচ্ছে কোনও ছাঁচে তৈরি জিনিসের। ওগুলো কোনও নলাকার অর্থাৎ চোঙার মতন জিনিস থেকে ভেঙে পড়েছে–খুব সম্ভব কোনও গেলাসের অংশ।
