আমি একেবারে নীরব হয়ে রইলুম। দিলীপের সঙ্গে আমার পরিচয় এত ঘনিষ্ঠ, তবু যতবারই তাঁর সঙ্গে যাই, ততবারই আমার জন্যে অপেক্ষা করে থাকে নতুন-নতুন বিস্ময়! অতি তুচ্ছ সব তথ্য থেকে তিনি সকল দিক দিয়ে সম্পূর্ণ এমন একটি সত্যিকার ও অপূর্ব গল্প খাড়া করে তোলেন, যা শুনলে পরম বিস্ময়ে অভিভূত হওয়া ছাড়া উপায়ান্তর থাকে না; মনে হয়, দিলীপ যেন মায়াবী।
অবশেষে আমি বললুম, যদি তোমার সিদ্ধান্ত ঠিক হয়, তা হলে তো বলতে হয় আমাদের সমস্ত সমস্যারই সমাধান হয়ে গেল। কোনও বাড়ির ভিতরে আসল ঘটনাস্থল হলে সেখানে নিশ্চয়ই আরও অনেক সূত্র পাওয়া যাবে। এখন প্রশ্ন থাকল খালি একটা। সেই বাড়িটা কোথায়?
দিলীপ বললেন, হ্যাঁ, আমার মনে এখন শুধু ওই প্রশ্নই জাগছে। কিন্তু ওইটেই হচ্ছে অত্যন্ত কঠিন প্রশ্ন। সেই বাড়িটার ভিতরে একবার উঁকি মারতে পারলে সমস্ত রহস্যই পরিষ্কার হয়ে যায়! কিন্তু উঁকি মারি কেমন করে? আমরা খুনের তদন্ত করছি বলে বাড়ির পর বাড়ি খানাতল্লাশ করতে পারব না। আপাতত আমাদের সমস্ত সূত্ৰই এক জায়গায় এসে হঠাৎ ছিঁড়ে যাচ্ছে। ছিন্নসূত্রের অপর অংশ আছে কোনও অজানা বাড়ির মধ্যে, আর আমরা যদি দুই সূত্রকে একসঙ্গে বাঁধতে না পারি তা হলে সমস্যার কোনও সমাধানই হবে না। কারণ, আসল প্রশ্ন হচ্ছে, মণিলাল বুলাভাইয়ের হত্যাকারী কে?
তা হলে তুমি কী করতে চাও?
এর পরের প্রধান কর্তব্য হচ্ছে, কোনও বিশেষ বাড়িকে এই অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করা। ওই দিকেই দৃষ্টি রেখে এখন আমাকে সমস্ত তথ্য সংগ্রহ করতে আর সেই সব নিয়ে বিচার করতে হবে। কিন্তু শেষপর্যন্ত ওই বাড়িখানাকে যদি আবিষ্কার করতে না পারি, তা হলে এদিক দিয়ে আমাদের সমস্ত অনুসন্ধানই ব্যর্থ হয়ে যাবে। তখন বেছে নিতে হবে আবার কোনও নতুন পথ।
আমাদের কথাবার্তা আর অগ্রসর হল না। আমরা যথাস্থানে এসে পড়েছি। স্টেশনমাস্টার দাঁড়িয়ে আছেন। ইনস্পেকটর লণ্ঠনের আলোকের সাহায্যে রেললাইন পরীক্ষা করছেন।
.
তৃতীয়
ইনস্পেকটর সম্বোধন করে স্টেশনমাস্টার বললেন, এখানে রক্ত পাওয়া গেছে অত্যন্ত কম। এটা বড়ই আশ্চর্য! এরকম আরও অনেক দুর্ঘটনা আমি দেখেছি। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই মাটির উপরে আর ইঞ্জিনের গায়ে দেখেছি প্রচুর রক্ত। কিন্তু এবারকার ব্যাপারে আমি অবাক হয়েছি।
দিলীপ রেললাইনের দিকে বিশেষ মনোযোগ দিলেন না। ওখানে রক্ত আছে কি নেই, এ-প্রশ্ন তাঁর কাছে যেন নিরর্থক।
তার লন্ঠনের আলো পড়ল গিয়ে লাইনের পাশের জমির উপরে। কাঁকর-ভরা জমি এবং কাকরের সঙ্গে মিশানো রয়েছে খড়ি বা খড়ির মতন সাদা কীসের চূর্ণ।
ইনস্পেকটর তখন হাঁটু গেড়ে মাটির উপরে বসে পড়েছেন। তার পায়ের জুতোর তলা দেখা যাচ্ছিল। আলোটা ইনস্পেকটর জুতোর উপরে ফেলে দিলীপ চুপিচুপি আমাকে বললেন, দেখছ?
আমি ঘাড় নেড়ে সায় দিলুম। ইনস্পেকটরের জুতোর তলায় লেগে রয়েছে ছোট-ছোট কাঁকর ও সাদা-সাদা চূর্ণের চিহ্ন। দিলীপের অনুমানই ঠিক। মণিলাল পদব্রজে এখানে এলে তারও জুতোর তলায় থাকত সাদা দাগ ও কাঁকর।
হেঁট হয়ে জমির উপর থেকে একটি ফাস-দেওয়া ফিতের মতন কী কুড়িয়ে নিয়ে ইন্সপেক্টরকে ডেকে দিলীপ জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি মৃতের টুপিটা এখনও খুঁজে পাননি?
না! টুপিটা নিশ্চয় কাছেই কোথাও পড়ে আছে। তারপর দিলীপের হাতের দিকে তাঁর নজর পড়ল। তিনি মুখ টিপে হেসে বললেন, আপনি দেখছি একটা নতুন প্রমাণ হস্তগত করেছেন।
দিলীপ বললেন, হতেও পারে। এটা হচ্ছে কোনও দুরঙা ফিতার ছোট্ট টুকরো– মাঝখানটা সবুজ, দু-পাশে খুব সরু সাদা রেখা। হয়তো পরে এটা কাজে লাগবে। অন্তত এটিকে আমি ত্যাগ করব না। তিনি পকেট থেকে একটি ছোট টিনের বাক্স বার করলেন তার মধ্যে অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে ছিল খানকয় একরত্তি খাম। একখানা খামের ভিতরে ফিতার টুকরাটি পুরে খামের উপরে পেন্সিল দিয়ে কী লিখলেন।
করুণাপূর্ণ হাসিমাখা মুখে ইনস্পেকটর দিলীপের কার্যপদ্ধতি লক্ষ করলেন। তারপর আবার নিযুক্ত হলেন রেলপথ পরীক্ষায়। এবারে দিলীপও যোগদান করলেন তাঁর সঙ্গে।
ইনস্পেকটর চশমার ইতস্তত বিক্ষিপ্ত কাচচুর্ণের দিকে অঙ্গুলি-নির্দেশ করে বললেন, বেচারা চোখে বোধহয় ভালো দেখতে পেত না। তাই ভুলে বিপথে এসে পড়েছিল।
দিলীপ সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন, হবে।
একখণ্ড স্লিপারের (যে কাঠের বা তক্তার উপরে রেললাইন পাতা হয়) উপরে ও তার পার্শ্ববর্তী স্থানে কাচচূর্ণগুলো ছড়িয়ে পড়েছিল। দিলীপ আবার বার করলেন তার টিনের বাক্স এবং আবার বেরুলো একখানা খাম।
আমার দিকে ফিরে তিনি বললেন, আর-একবার সাঁড়াশিটা চাই। তুমিও আর-একটা সাঁড়াশি নিয়ে আমাকে একটু সাহায্য করো।
কী সাহায্য?
এই কাচের টুকরোগুলো কুড়োতে হবে।
দুজনে সাঁড়াশি দিয়ে কাচের টুকরো সংগ্রহ করতে লাগলুম।
ইনস্পেক্টর বললেন, এই কাচের গুঁড়ো যে মৃতের চশমা থেকে পড়েছে, সে-বিষয়েও কোনও সন্দেহ আছে নাকি? লোকটি যে চশমা পরত, তার নাকের দাগ দেখেই আমি বুঝে নিয়েছি।
ও-তথ্য যে সত্য, সেটা প্রমাণ করতে কোনও দোষ নেই। তারপর দিলীপ নিম্নস্বরে আমাকে বললেন, কাচের প্রত্যেকটি কণা কুড়িয়ে নেবার চেষ্টা করো।
