আমি চুপিচুপি বললুম, দিলীপ, আমি এখনও অন্ধকার হাতড়ে বেড়াচ্ছি। তুমি তো দেখছি এরই মধ্যে একটি সিদ্ধান্তে এসে উপস্থিত হয়েছ! এ-ব্যাপারটাকে তুমি আত্মহত্যা না বলে হত্যা বলছ কেন?
দিলীপ উত্তরে বললেন, প্রমাণ খুব ছোট, কিন্তু অকাট্য। মৃতের বাঁ-রগের উপরে মাথার চঁদিতে একটা ক্ষত আছে, তুমি দেখেছ? ইঞ্জিনের আঘাতে ওরকম ক্ষত হলেও হতে পারে। কিন্তু এই ক্ষত দিয়ে রক্ত পড়েছে আর অনেকক্ষণ ধরেই পড়েছে। ক্ষত থেকে নেমে এসেছে। দুটো রক্তের ধারা। দুই ধারার রক্তই ডেলা বেঁধে আর আংশিকভাবে শুকিয়ে গিয়েছে। মনে রেখো, এটা হচ্ছে ছিন্নমুণ্ড। আর এই ক্ষতের জন্ম হয়েছে নিশ্চয়ই মুণ্ডচ্ছেদের আগে, কারণ যেদিক থেকে ইঞ্জিনটা আসছিল, ক্ষতটা সেইদিকে নেই। তারপর ভেবে দেখো, ছিন্নমুণ্ডের ভিতর থেকে এ-রকম রক্তপাত হয় না। অতএব মুণ্ডচ্ছেদের আগেই এই ক্ষতের সৃষ্টি।
ক্ষত থেকে শুধু রক্ত পড়েনি, রক্তের ধারা হয়েছে দুটি। প্রথম ধারাটি মুখের পাশ দিয়ে বয়ে জামার কলারকেও রক্তাক্ত করে তুলেছে। দ্বিতীয় ধারাটি ক্ষত থেকে চলে গিয়েছে মাথার পিছন দিকে। শ্ৰীমন্ত, নিশ্চয়ই তুমি মাধ্যাকর্ষণ শক্তির নিয়ম মানো? রক্ত যদি চিবুকের দিকে নেমে গিয়ে থাকে–প্রথম ধারায় যা হয়েছে তা হলে বলতে হবে, মণিলাল তখন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আর রক্ত যদি সম্মুখ থেকে মাথার পিছন দিকে গড়িয়ে গিয়ে থাকে। দ্বিতীয় ধারায় যা হয়েছে তা হলে বলতে হবে, মণিলাল তখন উপর দিকে মুখ তুলে চিৎ হয়ে শুয়েছিল।
এখন ড্রাইভারের কথা মনে করো। সে দেখেছে, মণিলাল মাটির দিকে মুখ করে উপুড় হয়ে লাইনের উপরে শুয়েছিল। এক্ষেত্রে রক্তের একটা ধারা বাঁ-গাল বয়ে কলার পর্যন্ত এবং আর একটা ধারা মাথার নিচে থেকে উপরে উঠে পিছন দিকে নেমে আসতে পারে না। আসল ব্যাপার কী হয়েছে জানো? মণিলাল যখন সোজা হয়ে বসে বা দাঁড়িয়ে ছিল, তখন কেউ আঘাত করেছিল তার মাথার উপরে–আর রক্তের প্রথম ধারা নেমে এসেছিল তার গাল বয়ে। তারপর সে চিৎ হয়ে মাটির উপরে পড়ে যায়, আর রক্তের দ্বিতীয় ধারা চলে যায় তার মাথার পিছন দিকে।
দিলীপ, আমি ভারি বোকা লোক! এসব কিছু ভাবতে বা লক্ষ করতে পারিনি।
অভ্যাস না থাকলে কেউ তাড়াতাড়ি অনুমান বা পর্যবেক্ষণ করতে পারবে না! আচ্ছা শ্ৰীমন্ত, মৃতের মুখ দেখে তোমার কোনও কথা মনে হয়েছে?
হয়েছে। মনে হয়, ও যেন শ্বাসরুদ্ধ হওয়ার দরুণ মারা পড়েছে।
ঠিক বলেছ। ও মুখ হচ্ছে শ্বাসরুদ্ধ-হওয়া মানুষের। তুমি বোধহয় আরও লক্ষ করেছ, ওর জিভ ফোলা-ফোলা, আর ওর উপর-ঠোঁটের ভিতরে দাঁত বসে যাওয়ার দাগ–তার কারণ, মুখের উপরে পড়েছিল প্রবল চাপ। এখন এইসব তথ্য আর অনুমানের সঙ্গে মাথার ক্ষতের কথা মিলিয়ে দ্যাখো। খুব সম্ভব, মণিলাল মাথায় আঘাত পাবার পর হত্যাকারীর সঙ্গে যোঝাবুঝি করেছিল, তারপর হত্যাকারী তার মুখ চেপে ধরে শ্বাসরোধ করে তাকে মেরে ফেলে।
আমি চমৎকৃত হয়ে নীরবে কিছুক্ষণ অগ্রসর হলুম!
তারপর জিজ্ঞাসা করলুম, মৃতের দাঁতের ভিতর থেকে তুমি সাঁড়াশি দিয়ে কী বার করে নিয়েছিলে? অণুবীক্ষণে সেটা দেখবার সুযোগ আমি পাইনি।
দিলীপ বললেন, ও, সেটা তুমি জানতে চাও? তার দ্বারা আমাদের অনুমান আরও বেশি অগ্রসর হয়ে গিয়েছে। সেটা হচ্ছে একগোছা বোনা কাপড়ের অংশ। অণুবীক্ষণের ভিতর দিয়ে দেখে বুঝেছি আলাদা-আলাদা তন্তুর দ্বারা তা বোনা হয়েছে, প্রত্যেক তন্তুর রং ভিন্ন। তার বেশিরভাগই হচ্ছে রাঙা পশমি তন্তু। সেইসঙ্গে তার মধ্যে আছে কাপড়ের নীলরঙা তন্তু, আর কতকগুলো হচ্ছে হলদে পাটের। এটা হয়তো কোনও মেয়ের রঙিন কাপড়ের অংশ। তবে পাট আছে বলে সন্দেহ হয়, হয়তো এটা কোনও পরদা বা কম-দামি অন্য কিছুর অংশ।
এ-থেকে কী বুঝতে হবে?
যদি এটা পরনের কাপড়ের অংশ না হয়, তবে বুঝতে হবে এটা এসেছে কোনও আসবাব থেকে। আর আসবাব মানেই বোঝায় গৃহস্থালী!
আমি আপত্তি জানিয়ে বললুম, এ-যুক্তি অকাট্য বলে মনে হচ্ছে না!
না। কিন্তু এর দ্বারা আমার একটা মত রীতিমতো সমর্থিত হচ্ছে।
কী!
মৃতের জুতোর তলা দেখে আমি যে-সিদ্ধান্তে উপস্থিত হয়েছি। খুব ভালো করে জুতোর তলা পরীক্ষা করে দেখেছি, কিন্তু তাতে বালি, কাঁকর, মাটি বা টুকরো ঘাসের কোনও চিহ্নই পাইনি। অথচ মৃতকে রেললাইনের উপরে আসবার জন্যে নিশ্চয়ই এবড়ো-খেবড়ো মাঠ পার হয়ে আসতে হয়েছে কারণ ঘটনাস্থলের আশপাশে না কি কোনও রাস্তা নেই। তার বদলে জুতোর তলায় পেয়েছি তামাকের ছাই আর একটা পোড়া দাগ–যেন সেই জুতো দিয়ে কোনও জ্বলন্ত চুরোট বা সিগারেট মাড়ানো হয়েছে। জুতোর তলায় একটা পেরেক একটু বেরিয়ে পড়েছিল, তার ডগায় লেগেছিল একটুখানি রঙিন তন্তু–তা কার্পেটের অংশ ছাড়া কিছুই নয়। এর দ্বারা বেশ বোঝা যাচ্ছে, লোকটি মারা পড়েছিল কোনও কার্পেট-পাতা ঘরের ভিতরে। তার জুতোর তলায় সেই ঘরে ঢোকবার আগে যে-সব দাগ ছিল, কার্পেট বা পাপোশের সংঘর্ষে সব বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। তারপর ঘর থেকে সে আর পায়ে হেঁটে বেরোয়নি, কারণ মৃত্যুর পর কেউ পায়ে হাঁটতে পারে না। নিশ্চয়ই কেউ তার মৃতদেহ বহন করে রেললাইনের উপরে রেখে এসেছিল।
