তাই নাকি? যে অপঘাতে মারা পড়েছে, তার শেষ-খাবারের কথাটা কি এতই তুচ্ছ? মৃতের ফতুয়ার গায়ে এই যে গুঁড়ো-গুঁড়ো কী জিনিস লেগে রয়েছে, দেখছেন? এ-থেকে আমরা কি কিছুই জানতে পারব না?
ইনস্পেকটর অবিচলিতভাবে বললেন, এমন কী আর জানতে পারবেন?
দিলীপ প্রথমে নিরুত্তর হয়ে মৃতের ফতুয়ার উপর থেকে সাঁড়াশির সাহায্যে গুঁড়োগুলো একে একে তুলে নিলেন। তারপর সেগুলো স্লাইডের উপরে রেখে অণুবীক্ষণের ভিতর দিয়ে পরীক্ষা করলেন।
তারপর মুখ তুলে বললেন, এই জানা যাচ্ছে যে, ভদ্রলোক মারা যাবার আগে ক্রিম ক্র্যাকার বিস্কুট খেয়েছিলেন।
ইনস্পেকটর বললেন, আমার মতে, ও-কথা না জানলেও চলত। মৃত কী খেয়েছিলেন। তা নিয়ে মাথা ঘামাবার কোনওই দরকার নেই। এখানে একমাত্র প্রশ্ন হচ্ছে, লোকটা মারা পড়েছে কেন? সে কি আত্মহত্যা করেছে? দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়েছে? না কেউ তাকে খুন করেছে?
দিলীপ বললেন, মাপ করবেন মশাই! একমাত্র যে-প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাচ্ছে না তা হচ্ছে, এই লোকটিকে খুন করেছে কে? আর কেনই বা খুন করেছে? অন্য সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেছে–অন্তত আমি পেয়েছি।
ইনস্পেকটর সবিস্ময়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন–সে-দৃষ্টিতে ছিল অবিশ্বাসের ছায়াও।
অবশেষে বললেন, মামলার কিনারা করে ফেলতে আপনার দেরি লাগেনি দেখছি। তাঁর কণ্ঠস্বরে ব্যঙ্গের ভাব।
দিলীপ দৃঢ়স্বরে বললেন, দেরি লাগবার কথা নয়। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে এটা হচ্ছে খুনের মামলা। খুনের কারণ আন্দাজ করাও শক্ত নয়। মণিলাল বুলাভাই ছিলেন নামজাদা জহুরি আর খুব সম্ভব তার সঙ্গে অনেক দামি পাথরও ছিল, আপনি বরং মৃতের পোশাক একবার খুঁজে দেখুন।
মুখে একটা বিরক্তিসূচক শব্দ করে ইনস্পেকটর বললেন, এ হচ্ছে আপনার বাজে আন্দাজ। মৃত ব্যক্তি জহুরি ছিলেন, তাঁর সঙ্গে দামি পাথর ছিল, অতএব ধরে নিতে হবে তিনি খুন হয়েছেন? এ-ও যুক্তি নাকি?
তিরস্কার-ভরা কঠিন দৃষ্টিতে অল্পক্ষণ দিলীপের দিকে চেয়ে থেকে আবার বললেন, মৃতের জামাকাপড় খোঁজার কথা বলছেন? হ্যাঁ, আমরা এসেছি সেইজন্যেই। মনে রাখবেন মশাই, এটা হচ্ছে বিচারাধীন মামলা খবরের কাগজের পুরস্কার-প্রতিযোগিতা নয়। বলেই তিনি সদর্পে আমাদের দিকে পিছন ফিরে লাশের পোশাকের ভিতরে হাত ঢুকিয়ে দিলেন। এবং যা-যা পেলেন, বড় বাক্সটার উপরে ব্যাগের পাশে সাজিয়ে রাখতে লাগলেন।
এদিকে দিলীপ পরীক্ষায় নিযুক্ত হলেন লাশের সমস্ত দেহটা নিয়ে। বিশেষভাবে আতসী কাচ দিয়ে পরীক্ষা করতে লাগলেন মৃতের পাদুকা। ইনস্পেকটর মাঝে-মাঝে তার দিকে তাকান আর তার মুখ হয়ে ওঠে কৌতুকহাস্যে সমুজ্জ্বল।
তারপর নিজের কাজ সেরে ফিরে বললেন, আমি হলে মশাই, খালি চোখেই জুতোটা দেখতে পেতুম! (সহাস্যে স্টেশনমাস্টারকে ইঙ্গিত করে) তবে আপনি হয়তো খালি চোখে ভালো দেখতে পান না!
দিলীপ কিছু বললেন না, মুখ টিপে টিপে হাসতে লাগলেন।
তারপর তিনি বড় বাক্সটার কাছে এগিয়ে গিয়ে দেখলেন, মৃতের জামাকাপড়ের ভিতর থেকে কী কী জিনিস পাওয়া গিয়েছে।
মানিব্যাগ, পকেট-বুক, একখানা চশমা (বোধহয় লেখাপড়ার জন্যে), পকেট-ছুরি, দেশলাইয়ের বাক্স, তামাকের রবারের থলি ও কার্ড কেস প্রভৃতি ছোট-ছোট আরও দু-একটি জিনিস।
দিলীপ প্রত্যেক জিনিসটা ভালো করে উলটে-পালটে পরীক্ষা করতে লাগলেন এবং ইনস্পেকটর তাকে লক্ষ করতে লাগলেন কৌতুক ও অবহেলাপূর্ণ চোখে।
দিলীপ চশমার কাচ-দুখানা আলোর বিরুদ্ধে রেখে তাদের শক্তি পরীক্ষা করলেন। থলি থেকে তামাকের গুঁড়ো তুলে দেখলেন। সিগারেট পাকাবার কাগজ ও দেশলাইয়ের বাক্সটাও তার তীক্ষ্ণদৃষ্টি এড়াল না।
ইনস্পেকটর বললেন, তামাকের থলি দিয়ে এত নাড়াচাড়া করছেন, ওর ভেতরে আপনি কী দেখতে চান?
তামাক। এর ভেতরে স্টেট-এক্সপ্রেস তামাক রয়েছে।
তাও বুঝতে পেরেছেন?
পেরেছি। বাজারে যেসব তামাক চলে তা দেখলেই আমি বলে দিতে পারি সেগুলোর নাম কী? এ-অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি অনেক পরীক্ষায় পর।
আপনার বাহাদুরি আছে।
বিনয় দেখাবার জন্যে সেটা অস্বীকার করতে চাই না। কিন্তু আপনি দেখছি মৃতের পকেট থেকে দামি পাথর-টাথর কিছুই পাননি।
না। ওসব কিছু ছিল বলেও মনে হয় না। তবে দামি পাথর না পেলেও দামি জিনিস পেয়েছি বটে। সোনার ঘড়ি আর চেন, একটি গলাবন্ধের হিরার পিন, দুখানা একশো আর চারখানা দশ টাকার নোট। বুঝতেই পারছেন, খুন হলে খুনি এসবের মায়া ত্যাগ করত না! আপনার খুনের মামলা ফেঁসে গেল। কী বলবেন মশাই?
দিলীপ বললেন, ওই ভেবে আপনি যদি খুশি হতে চান, খুশি হোন। কিন্তু আমার মত একটুও বদলায়নি। এইবারে কি ঘটনাস্থলটা দেখা উচিত নয়?
চলুন।
হ্যাঁ, আর-এক কথা। মালগাড়ির ইঞ্জিনটা কি ভালো করে পরীক্ষা করা হয়েছে?
স্টেশনমাস্টার বললেন, হ্যাঁ। সামনের আর পিছনের চাকায় রক্তের দাগ লেগে আছে।
দিলীপ বললেন, দেখা যাক, রেললাইনেও রক্তের দাগ পাওয়া যায় কি না।
স্টেশনমাস্টার বিস্মিত হয়ে কী জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু ইনস্পেকটর তাকে আর প্রশ্ন করবার অবসর দিলেন না। তিনি তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়লেন–আমাদেরও পাততাড়ি গুটোতে হল।
দিলীপ নিজেও একটা লণ্ঠন চেয়ে নিলেন। তার হাতে রইল লণ্ঠন, আমার হাতে তার বাক্স। ইনস্পেকটর আর স্টেশনমাস্টার যেতে লাগলেন আগে-আগে।
