দিলীপ জিজ্ঞাসা করলেন, লোকটা কীভাবে শুয়েছিল, ড্রাইভার সে কথা কিছু বলেছে?
আজ্ঞে হ্যাঁ। হেডলাইটে সে স্পষ্ট দেখতে পেয়েছে, লোকটা লাইনের ওপর গলা দিয়ে উপুড় হয়ে শুয়েছিল। লোকটা ইচ্ছে করেই প্রাণ দিয়েছে মশাই!
সেখানে কোনও লেভেল-ক্রসিং ছিল?
না বাবু। সেখানে কোনও রাস্তা-টাস্তাও ছিল না। লোকটা নিশ্চয়ই মাঠের ভেতর দিয়ে এসে, তারের বেড়া টপকে লাইনের ওপরে এসেছিল। সে আত্মঘাতী হবে বলে পণ করেছিল।
এত কথা তুমি জানলে কেমন করে?
স্টেশনমাস্টার আমাকে বলেছেন।
দিলীপের সঙ্গে আমি ফিরে এসে একখানা বেঞ্চির উপরে বসে পড়লুম।
দিলীপ বললেন, একদিক দিয়ে লোকটার কথা খুব ঠিক। এটা দৈব-দুর্ঘটনা নয়। তবে। লোকটা যদি রাতকানা, কালা বা নির্বোধও হত হয়তো বেড়া ডিঙিয়ে লাইনে নেমে মারা পড়তেও পারত। কিন্তু মণিলাল বুলাভাই সে-শ্রেণির লোক নয়। মণিলাল লাইনের উপরে গলা দিয়ে শুয়েছিল। এ-থেকেও আমরা দু-একটা অনুমান করতে পারি। হয় সে স্বেচ্ছায় আত্মহত্যা করেছে; নয়, মৃত বা অজ্ঞান অবস্থাতেই তার দেহ পড়েছিল লাইনের উপরে। যতক্ষণ আমরা লাশ পরীক্ষা করবার সুযোগ না পাব, ততক্ষণ এর বেশি আর কিছু জানতে পারা যাবে না। …ওই দ্যাখো শ্ৰীমন্ত, পুলিশ এসে পড়েছে! চলো, ওরা কী বলে শোনা যাক।
.
দ্বিতীয়
স্টেশনমাস্টার একজন ইউনিফর্ম-পরা পুলিশ ইনস্পেকটরের সঙ্গে কথা কইছিলেন।
দিলীপ ও আমাকে দেখেই তাঁদের মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল এবং দুজনেই একবাক্যে জানালেন, এসব ব্যাপারে তারা বাইরের লোকের সাহায্য গ্রহণ করতে ইচ্ছুক নন।
দিলীপ এতক্ষণ আত্মপরিচয় দেননি। তিনি জানতেন, বাংলাদেশের যেসব পুলিশ কর্মচারী তার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত নন, তাঁরাও অন্তত তার নামের সঙ্গে সুপরিচিত। তিনি তার কার্ড বার করে ইনস্পেকটরের হাতে দিলেন।
কার্ডখানা হাতে করে ইনস্পেকটর নিজের মনে বিড়বিড় করে কী যেন বকতে লাগলেন। তারপর বললেন, আচ্ছা, আপনারা আমার সঙ্গে আসুন।
ঘরের ভিতরে ঢুকে দেখা গেল স্ট্রেচারটা রয়েছে মেঝের উপরে–সেইভাবেই তেরপল ঢাকা। কাছেই একটা বড় বাক্সের উপরে রয়েছে ব্যাগ ও ছাতাটা। তাদের পাশেই একটা চশমার তোবড়ানো ফ্রেম, তার কাচ নেই।
দিলীপ জিজ্ঞাসা করলেন, এই চশমার ফ্রেমটা কি লাশের সঙ্গেই পাওয়া গিয়েছে?
স্টেশনমাস্টার বললেন, হ্যাঁ। ফ্রেমটা ঠিক লাশের পাশেই ছিল আর তার চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল ভাঙা কাচের টুকরো।
দিলীপ নোটবুক-এ কথাগুলো টুকে নিলেন।
এদিকে ইনস্পেকটর লাশের উপর থেকে সরিয়ে দিলেন তেরপলের আচ্ছাদন।
দৃশ্যটা ভীষণ, সন্দেহ নেই। মৃতদেহটা এলিয়ে পড়ে আছে স্ট্রেচারের উপরে। বিচ্ছিন্ন মুণ্ডভাবহীন চোখদুটো দৃষ্টিহীন স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কড়িকাঠের দিকে। মুণ্ডহীন দেহ অস্বাভাবিকভাবে বেঁকে রয়েছে–দেখলেই শরীর শিউরে ওঠে।
দিলীপ পূর্ণ এক মিনিটকাল ধরে নীরবে হেঁট হয়ে মৃতদেহের দিকে চেয়ে রইলেন, ইনস্পেকটর লণ্ঠনের আলো ফেললেন লাশের উপরে।
তারপর আমার দিকে ফিরে বললেন, শ্ৰীমন্ত, আমরা তিনটে অনুমানের ভিতরে দুটোকে বাদ দিতে পারি।
ইনস্পেকটর কী বলতে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ তার দৃষ্টি আকৃষ্ট হল দিলীপের হাতবাক্সের দিকে।
দিলীপ সেটি খুলে একজোড়া শবব্যবচ্ছেদে ব্যবহার করবার মতো ছোট্ট সাঁড়াশি বার করলেন।
ইনস্পেকটর বললেন, শবব্যবচ্ছেদ করবার হুকুম আমরা পাইনি।
আমি তা জানি মশাই! আমি কেবল মৃতের মুখের ভিতরটা পরীক্ষা করব। এই বলে দিলীপ সাঁড়াশি দিয়ে মুণ্ডের ঠোঁট টেনে তুললেন এবং মুখের ভিতরটা ভালো করে দেখে একমনে দাঁতগুলো পরীক্ষা করতে লাগলেন।
তারপর মুখ তুলে আমার দিকে চেয়ে বললেন, শ্ৰীমন্ত, তোমার আতসী-কাচখানা একবার আমাকে দাও তো!
দিলীপ কী করেন দেখবার জন্যে ইনস্পেকটর লণ্ঠন নিয়ে আগ্রহভরে ঝুঁকে পড়লেন।
দিলীপ মৃতের অসমোচ্চ দাঁতের সারির উপর দিয়ে আতসী কাচখানা এদিক থেকে ওদিক পর্যন্ত সরিয়ে নিয়ে গেলেন। তারপর সাঁড়াশি দিয়ে দাঁতের উপর থেকে সযত্নে খুব সূক্ষ্ম। কী একটা জিনিস তুলে নিলেন এবং আতসী-কাচের ভিতর দিয়ে জিনিসটা দেখতে লাগলেন।
অনেককাল দিলীপের সঙ্গে-সঙ্গে আছি, এরপর তার কী দরকার হবে আমি জানি। আমি তখনি অণুবীক্ষণে ব্যবহার্য একখানা কাচের স্লাইড ও শবব্যবচ্ছেদের শলাকা তার দিকে এগিয়ে দিলুম। তিনি সেই সূক্ষ্ম জিনিসটা স্লাইডের উপরে রেখে শলাকা দিয়ে ছড়িয়ে দিতে লাগলেন। ততক্ষণে আমি অণুবীক্ষণ যন্ত্রটা প্রস্তুত করে রাখলুম।
দিলীপ বললেন, একফেঁটা Farrant আর একটা Cover-glass দাও।
দিলুম।
দিলীপ তাঁর অণুবীক্ষণ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে রইলেন। আমি ইনস্পেকটরের মুখের দিকে তাকালুম তার মুখে বিদ্রূপ-হাস্য! আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই তিনি হাসি চাপবার চেষ্টা করলেন–বোধহয় ভদ্রতার অনুরোধেই!
অপ্রস্তুতভাবে তিনি বললেন, এসব আমার বাহুল্য বলে মনে হচ্ছে মশাই! ভদ্রলোকটি মারা যাবার আগে কী খেয়েছিলেন, সেটা জেনে কিছু লাভ আছে কি? আমার বিশ্বাস, ভদ্রলোক কুখাদ্য খেয়ে মারা পড়েননি।
দিলীপ সহাস্য মুখ তুলে বললেন, মশাই, এ-শ্রেণির মামলায় কিছুই বাহুল্য নয়। প্রত্যেক তথ্যের কিছু-না-কিছু মূল্য আছে।
ইনস্পেকটর দমলেন না, বললেন, যার মুণ্ড কাটা গেছে, তার শেষ-খাবারের কথা জেনে কোনও লাভ নেই।
