বসন্ত সচমকে বলে উঠলেন, হা ভগবান! বলো কী?
দিলীপ জিজ্ঞাসা করলেন, কেন বসন্তবাবু, আপনি একথা বলছেন কেন?
বসন্ত বললেন, ওটা হচ্ছে মণিলাল বুলাভাইয়ের ছাতা। আমি ওর বাঁট দেখেই চিনেছি! দিলীপ বললেন, জহুরি মণিলাল বুলাভাই?
বসন্ত বললেন, হ্যাঁ। মণিলালের একটা অভ্যাস ছিল, টুপির তলায় নিজের নাম লিখে রাখা। ওহে বাপু কুলি, লাশের টুপিটা একবার দেখাও দেখি!
কুলি বললে, কোনও টুপি পাওয়া যায়নি। স্টেশনমাস্টার আসছেন, ওঁকে জিজ্ঞাসা করুন।
স্টেশনমাস্টার এসে বললেন, ব্যাপার কী?
বসন্ত বললেন, এই ছাতা আর এর মালিককে আমি চিনি।
স্টেশনমাস্টার বললেন, তাই নাকি, তাই নাকি? তা হলে একবার আমার সঙ্গে আসুন, লাশটাও শনাক্ত করতে পারেন কি না দেখি!
বসন্ত সভয়ে দুই পা পিছিয়ে গিয়ে বললেন, ও বাবা!
ভয় পাচ্ছেন কেন?
রেলে কাটা পড়ে মণিলালের চেহারা কীরকম বিশ্রী হয়েছে, কে জানে!
চেহারা মোটেই ভালো হয়নি, ছখানা মালগাড়ির চাকা বেচারার ওপর দিয়ে চলে যাবার আগে ড্রাইভার গাড়ি থামাতে পারেনি। ধড় থেকে মুণ্ডটা একেবারে আলাদা হয়ে গিয়েছে।
খাবি খেতে-খেতে বসন্ত বললেন, বাপ রে, কী বীভৎস কাণ্ড! মাপ করবেন মশাই, ও-দৃশ্য আমি সহ্য করতে পারব না। হ্যাঁ দিলীপবাবু, আপনি কী বলেন?
আমি বলি, তাড়াতাড়ি দেহ শনাক্ত করতে পারলে পুলিশের খুব সুবিধা হয়।
বসন্ত ম্লানমুখে বললেন, তা হলে আর উপায় নেই, আমাকে দেখতেই হবে।
স্টেশনমাস্টারের সঙ্গে বসন্ত একটি ঘরের ভিতরে গিয়ে ঢুকলেন–যারপরনাই অনিচ্ছুকভাবে।
বসন্ত মানমুখে পড় দেহ শনাক্ত করুপবাবু, আপনি কী জমাপ করবেন মশাই কিন্তু একমিনিট যেতে না-যেতেই তিনি দৌড়তে-দৌড়তে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন, তার মুখ চোখ ভীত, উদ্ভ্রান্তের মতো।
দিলীপের কাছে ছুটে এসে রুদ্ধশ্বাসে তিনি বললেন, হ্যাঁ, হা, মণিলাল বুলাভাই-ই বটে! হায় রে বেচারা! ভয়ানক, ভয়ানক!
দিলীপ জিজ্ঞাসা করলেন, মণিলালের সঙ্গে কোনও দামি পাথর-টাথর ছিল?
(এই সময়ে একটু আগে আমি যে-হাসিমুখ অথচ ছন্নছাড়ার মতন লোকটাকে লক্ষ করেছিলুম, সে একেবারে আমাদের কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে কথাবার্তা শুনতে লাগল।)।
বসন্ত বললেন, দামি পাথর? থাকাই সম্ভব, কিন্তু আমি ঠিক করে কিছু বলতে পারছি না, তবে মণিলালের কর্মচারীরা নিশ্চয়ই বলতে পারবে। হ্যাঁ, একটি কথা আমার রাখবেন?
বলুন।
যদি আপনার সময় থাকে, এই মামলাটার দিকে একটু লক্ষ্য রাখতে পারবেন? মণিলাল। আমার বিশেষ বন্ধু ছিলেন।
বেশ বসন্তবাবু, তাই হবে। আমার হাতে আজ আর কোনও কাজ নেই, আমি না হয় কাল সকালেই কলকাতায় ফিরব। কী হে শ্ৰীমন্ত, তোমার কিছু অসুবিধা হবে না তো?
কিছু না।
বসন্ত বললেন, ধন্যবাদ। ওই কলকাতার গাড়ি এসে পড়েছে। কাল দেখা হলে অন্য সব কথা।
কালকেই আপনি সব খবর পাবেন।
সেই যে-অদ্ভুত লোকটা আমাদের কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে কথাবার্তা শুনছিল, দিলীপের মুখের দিকে সে একবার অত্যন্ত উৎসুক চোখে তাকাল, তারপর যেন অনিচ্ছাসত্ত্বেও বসন্তবাবুর পিছনে পিছনে কলকাতার গাড়ির দিকে অগ্রসর হল।
কলকাতার গাড়ি চলে যাবার পর দিলীপ স্টেশনমাস্টারের কাছে গিয়ে জানালেন, বসন্তবাবু তাঁর উপরে কোন ভার অর্পণ করে গিয়েছেন। এবং সেইসঙ্গে বললেন, অবশ্য পুলিশ না-আসা পর্যন্ত আমি কিছুই করব না। পুলিশে খবর দেওয়া হয়েছে তো?
হ্যাঁ। পুলিশ খুব শীঘ্রই এসে পড়বে। পুলিশকে আপনার কথা জানাব। স্টেশনমাস্টার এই বলে চলে গেলেন।
আমি আর দিলীপ প্ল্যাটফর্ম-এর উপরে পদচারণা করতে লাগলুম।
দিলীপ বললেন, এ-ধরনের মামলায় তিনরকম ব্যাখ্যা থাকে। দৈব দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা, হত্যা। আর এই তিনরকম তথ্যের সিদ্ধান্ত থেকেই আমাদের একটা মীমাংসায় এসে পৌঁছতে হবে। প্রথম, মামলার সাধারণ তথ্য; দ্বিতীয়, দেহ পরীক্ষা করে যে-সত্যের সন্ধান পাওয়া যাবে; তৃতীয়, ঘটনাস্থল পরীক্ষা করে জানা যাবে যে-সত্য। আপাতত, আমরা যে-সাধারণ তথ্যটুকু জানতে পেরেছি, তা হচ্ছে এই মৃতব্যক্তি হীরক-ব্যবসায়ী। নিজের ব্যবসার জন্যেই যে সে এমন জায়গায় এসেছিল, এটুকু আমরা ধরে নিতে পারি। হয়তো তার সঙ্গে ছিল দামি-দামি পাথর। এই তথ্য হচ্ছে আত্মহত্যার বিরোধী। মনে সন্দেহ আনে, হয়তো এর মধ্যে হত্যাকারীর হাত আছে। তারপর প্রশ্ন ওঠে, এটা দৈব-দুর্ঘটনা কি না? তালে জানতে হবে, যেখানে দেহ পাওয়া গিয়েছে সেখানে কোনও লেভেল-ক্রসিং কি লাইনের কাছে কোনও রাস্তা আছে কি না? কিংবা ঘটনাস্থলে মৃতব্যক্তির আকস্মিক উপস্থিতির কোনও সঙ্গত কারণ আছে কি না? এসব তথ্য এখনও আমরা জানতে পারিনি। কিন্তু এগুলি আমাদের জানা উচিত।
আমি বললুম, যে কুলিটা ছাতা আর ব্যাগ নিয়ে আসছিল, তাকে জিজ্ঞাসা করলেই তো পারো! ওই দেখো, একদল লোকের কাছে দাঁড়িয়ে সে খুব সম্ভব আজকের ঘটনাই বর্ণনা করছে। আমাদের মতন নূতন শ্রোতা পেলে তার উৎসাহ আরও বেড়ে উঠতে পারে!
দিলীপ বললেন, শ্রীমন্ত, তোমার কথাই শুনব। দেখা যাক ও কী বলে?
আমরা কুলিটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালুম সত্য-সত্যই সে গল্পের ভার নামাবার জন্যে অতিশয় উৎসুক হয়ে উঠেছে!
দিলীপ জিজ্ঞাসা করলেন, ব্যাপারটা কেমন করে ঘটল বলতে পারো?
সে বলল, ড্রাইভার যা বললে তা আমি শুনেছি। ওখানে এক জায়গায় লাইনটা বেঁকে গিয়েছে। মালগাড়ি যখন সেই বাঁকের মুখে এসে পড়ে, ড্রাইভার তখন হঠাৎ দেখতে পায়, লাইনের উপরে কী যেন পড়ে আছে! সে তখনি বাষ্প বন্ধ করে দেয়, বাঁশি বাজায় আর ব্রেক কষে। কিন্তু জানেন তো মশাই, এত তাড়াতাড়ি মালগাড়ি থামানো সোজা ব্যাপার নয়। থামবার আগেই ছ-খানা গাড়ি লোকটার উপর দিয়ে গড়গড় করে চলে যায়!
