কলকাতার বিখ্যাত জহুরি মণিলাল বুলাভাইয়ের মৃত্যুরহস্যের মধ্যে বন্ধুবর দিলীপের কৃতিত্ব সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছিল। কিন্তু তার ওই Medico-legal পদ্ধতির কোনও-কোনও বিশেষত্ব পুলিশকে খুশি করতে পারেনি। বিশেষত্বগুলি যে কী, যথাস্থানে দিলীপের মুখেই তা প্রকাশ পাবে। আপাতত, কেমন করে আমরা এই ব্যাপারটার সঙ্গে জড়িয়ে পড়লুম, গোড়া থেকে সেই কথাই বলব।
শীতের কুয়াশামাখা সন্ধ্যা যখন অন্ধকারে একেবারে কালো হয়ে গিয়েছে, আমাদের ট্রেন গতি কমিয়ে ধীরে ধীরে চাঁদনগরের ছোট স্টেশনের ভিতরে গিয়ে ঢুকল।
দিলীপ কামরার জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বললেন, আরে-আরে, বসন্তবাবু যে!
সঙ্গে-সঙ্গে একটি সহজে-উত্তেজিত হওয়ার মতন চেহারার ছোটখাটো, চটপটে অথচ হৃষ্টপুষ্ট ভদ্রলোক আমাদের কামরার কাছে এসে বললেন, অ্যাঁ! দিলীপবাবু? জানলার ধারে আপনার মুখ দেখেই চিনেছি! ভারি খুশি হলুম মশাই, ভারি খুশি হলুম! কিন্তু আপনারা হচ্ছেন মস্তবড় বিজ্ঞ লোক, আমাকে আপদ ভাববেন না তো?
দিলীপ হেসে বললেন, আপনার দীনতা দেখে লজ্জা পাচ্ছি। কিন্তু যাক সে-কথা। এখানে আপনি কী করছেন বলুন দেখি?
আমার ছোটভাই এখান থেকে কিছুদূরে একটা জমি কিনেছে। আমি তাই দেখতে এসেছিলুম। এই ট্রেনেই কলকাতায় ফিরব। বলেই বসন্তবাবু দরজা খুলে কামরার ভিতরে উঠে এলেন, তারপর বসে পড়ে বললেন, কিন্তু আপনারা কোথায় গিয়েছিলেন? সঙ্গে ওই রহস্যময় ছোট বাক্সটিও এনেছেন দেখছি! ও বাক্সটি দেখেই নতুন অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধ পাচ্ছি। আমার কাছে ওটি হচ্ছে ম্যাজিক-বাক্স!
দিলীপ বললেন, ও-বাক্সটি সঙ্গে না নিয়ে আমি কখনও বাড়ির বাইরে পা বাড়াই না। হঠাৎ কখন কী দরকার হতে পারে কে জানে? ছোট বাক্স, বইতে কষ্ট নেই, কিন্তু দরকারের সময়ে ওটিকে হাতের কাছে না পেলে নাকালের একশেষ হতে হয়!
বাক্সের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বসন্ত বললেন, সেই ব্যাঙ্কে খুনের মামলায় ওই বাক্স থেকে যন্ত্রপাতি বার করে আপনি যে-আশ্চর্য ভেলকিবাজি দেখিয়েছিলেন, আমার এখনও মনে আছে। অদ্ভুত বাক্স, অদ্ভুত বাক্স! ওর মধ্যে কী জাদু আছে, কে জানে!
দিলীপ মৃদু হেসে সস্নেহে বাক্সটির দিকে তাকিয়ে তার ডালা খুলে ফেললেন। একরত্তি বাক্স–চৌকো একফুট মাত্র। দিলীপ এটিকে বলেন, আমার পকেট-রসায়নশালা। এর মধ্যে ক্ষুদে-ক্ষুদে যে-জিনিসগুলি আছে, তার সাহায্যে যে-কোনও রসায়নতত্ত্ববিদ অনায়াসেই প্রাথমিক পরীক্ষা কার্য সম্পাদন করতে পারেন।
অদ্ভুত বাক্স, অদ্ভুত বাক্স! বলে বসন্তও মুগ্ধচোখে তার ভিতর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার ভিতরে যা-কিছু আছে সব এতটুকু-এতটুকু–যেন গালিভারের ভ্রমণকাহিনিতে বর্ণিত কড়ে আঙুলের মতন ছোট্ট মানুষের দেশ লিলিপুটের ব্যবহারযোগ্য, অথচ তার মধ্যে নেই কী? নানা রাসায়নিক তরল পদার্থে ভরা পরীক্ষক-শিশি, কাচনল, স্পিরিট-ল্যাম্প, অণুবীক্ষণ প্রভৃতি।
বসন্ত বললেন, এ যেন পুতুলখেলার বাক্স! কিন্তু মশাই এত ছোট-ছোট জিনিস নিয়ে কী কাজ করা যায়? ধরুন, ওই অণুবীক্ষণটি।
দিলীপ বললেন, ওটিকে খেলনার মতন দেখতে বটে, কিন্তু ওটি খেলনা নয়। ওর বীক্ষণ কাচ ছোট হলেও যথেষ্ট শক্তিশালী। অবশ্য বড় যন্ত্রে কাজের সুবিধা হয় বেশি, কিন্তু পথে-বিপথে যেখানে বড় যন্ত্র পাওয়া অসম্ভব, সেখানে তার অভাব এর দ্বারা যথাসম্ভব পূরণ করা চলে। এগুলি হচ্ছে মধুর অভাবে গুড়ের মতো কিছু নেইয়ের মধ্যে তবু কিছু!
বসন্ত হাত দিয়ে এক-একটি জিনিস তোলেন, আর বালকের মতন প্রশ্নের পর প্রশ্ন করেন। তাঁর অসীম কৌতূহল চরিতার্থ করতে করতে গাড়ি এসে পড়ল চাঁদনগর জংশনে।
বসন্ত বাইরের দিকে তাকিয়ে বললেন, ও দিলীপবাবু, এইখানেই আমাদের গাড়িবদল করতে হবে না?
দিলীপ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, হ্যাঁ।
আমরা তিনজনেই প্ল্যাটফর্মে নেমে পড়লুম। এবং নেমেই বুঝলুম, এখানে কোনও অসাধারণ ঘটনা ঘটেছে। যাত্রী এবং স্টেশনের লোকজনরা প্ল্যাটফর্মের একপ্রান্তে সমবেত হয়েছে–চারিদিকেই যেন কেমন একটা চাপা চাঞ্চল্যের ভাব।
স্টেশনের একটি লোককে ডেকে বসন্ত জিজ্ঞাসা করলেন, ব্যাপার কী মশাই?
লাইনের ওদিকে একটি লোক রেলগাড়ি-চাপা পড়েছে। দূর থেকে ওই যে একটা লণ্ঠনের আলো দেখা যাচ্ছে, খুব সম্ভব স্ট্রেচারে করে লাশ নিয়ে আসা হচ্ছে।
আমরা যখন সেই অন্ধকারে দোদুল্যমান আলোটার দিকে তাকিয়ে আছি, তখন টিকিট ঘর থেকে একটি লোক বেরিয়ে আমাদের কাছে এসে দাঁড়াল।
লোকটি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলে দুই কারণে। প্রথমত, তার মুখ হাসিখুশিমাখা হলেও কেমন যেন বিবর্ণ এবং তার চক্ষে ছিল একটা বন্য ভাব; দ্বিতীয়ত, সাগ্রহ কৌতূহলের সঙ্গে রেললাইনের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকলেও সে কারুকে কোনও প্রশ্ন করছিল না।
দুলন্ত আলোটা কাছে এগিয়ে এল। তারপর দেখা গেল, দুজন লোক তেরপলে ঢাকা একটা স্ট্রেচার নিয়ে প্লাটফর্ম-এর ঢালু গা বেয়ে উপরে উঠে আসছে। তেরপলের তলায় যে একটা মনুষ্যদেহ আছে, সেটাও আমরা বুঝতে পারলুম।
একটা ছাতা ও একটা ব্যাগ নিয়ে আসছিল একজন কুলি। বসন্তবাবু তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, যে লোক কাটা পড়েছে, ওটা কি তারই ছাতা?
কুলি ছাতাটা তুলে ধরে বললে, হ্যাঁ বাবু!
