কিন্তু আবার ফিরে এল ল্যাম্পটা নিভিয়ে দেওয়ার জন্যে।
আলো নেভাবার জন্যে হাত তুলেছে হঠাৎ তার দৃষ্টি আকৃষ্ট হলঘরের একদিকে। কী সর্বনাশ!
.
পঞ্চম
মণিলালের টুপিটা তখনও পড়ে রয়েছে চেয়ারের উপরে।
তার হৃৎপিণ্ডের ক্রিয়া যেন বন্ধ হয়ে গেল–একেবারে আড়ষ্ট! সে মারাত্মক আতঙ্কে ঘেমে উঠল।
আর একটু হলেই তো সে আলো নিভিয়ে চলে যাচ্ছিল পিছনে তার বিরুদ্ধে এতবড় প্রমাণ ফেলে রেখে! বাইরের কেউ যদি এসে এই টুপিটা এখানে দেখতে পেত, কী হত তা হলে?
চেয়ারের কাছে গিয়ে নেমদার টুপিটা তুলে নিয়ে সে তার ভিতর দিকে দৃষ্টিপাত করে শিউরে উঠল।
টুপিটা না দেখে চলে গেলে কি আর রক্ষে ছিল? এখনই যদি কেউ এসে পড়ে, তার হাতে বা ঘরে এই টুপিটা দেখতে পায়, তা হলে কেউ তাকে ফাঁসিকাঠ থেকে বাঁচাতে পারবে না।
এইকথা ভেবেই সে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল। কিন্তু দারুণ আতঙ্কে বুদ্ধি হারাল না।
রান্নাঘরের উনুনের কাছে ছুটে গিয়ে সে দেখল, আগুন নিবে গেছে। তখনই কতকগুলো জ্বালানি কাঠ জোগাড় করে এনে অক্ষয় আবার অগ্নি সৃষ্টি করল। তারপর ছুরি দিয়ে টুপিটা খণ্ড-খণ্ড করে কেটে সমর্পণ করল আগুনের কবলে। তার হৃৎপিণ্ড তখনও যেন দুপ-দুপ করে। লাফিয়ে উঠছে। যদি কেউ এসে পড়ে–যদি কেউ এসে পড়ে। তার হাতের কাঁপুনি যেন আর থামতেই চায় না–এখনই এত সাবধানতা ব্যর্থ হয়ে গিয়েছিল আর কী!
নেমদা বা ফেল্ট সহজে পোড়বার জিনিস নয়। টুপির খণ্ডগুলো ধিকিধিকি করে আস্তে আস্তে পুড়ে প্রচুর ধোঁয়ার জন্ম দিয়ে অঙ্গারের মতন হয়ে যাচ্ছে–সত্যিকার ভস্মে পরিণত হচ্ছে না। তার উপরে চুল-পোড়া গন্ধের সঙ্গে রজনের গন্ধ মেশানো এমন একটা বিষম দুর্গন্ধ বেরুতে লাগল যে, অক্ষয় ভয় পেয়ে রান্নাঘরের জানলাগুলো খুলে দিতে বাধ্য হল।
তখনও সে কান পেতে শুনছে আর ভাবছে, বাইরে বুঝি জাগল কার পদশব্দ, ওই বুঝি নড়ে ওঠে সদরের কড়া, ওই বুঝি আসে নিয়তির নিষ্ঠুর আহ্বান!
ওদিকে সময়ও আর নেই। সাড়ে আটটা বাজতে বাকি আর বিশ মিনিট মাত্র! আর মিনিট কয়েকের মধ্যেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়তে না পারলে ট্রেন ধরা অসম্ভব হবে।
আরও অল্পক্ষণ অপেক্ষা করে দেখল, টুপির খণ্ডগুলোকে আর চেনা যায় না। তখন সে একটা লোহার শিক নিয়ে অঙ্গারগুলোর উপরে সজোরে আঘাত করতে লাগল। পোড়া কাঠ ও কয়লার সঙ্গে টুপির দগ্ধাবশেষ নেড়ে-নেড়ে এমনকরে মিশিয়ে দিলে যে, সন্দেহজনক কোনও কিছু চোখে পড়বার উপায় আর রইল না। এমনকী ভৃত্য রামচরণ পর্যন্ত কিছু বুঝতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না। খুব সম্ভব, সে যখন ফিরে আসবে অঙ্গার তখন ভস্মে পরিণত হবে। অক্ষয় ভালো করেই দেখে নিয়েছে, টুপির মধ্যে ধাতু দিয়ে তৈরি এমন কোনও বস্তু নেই, আগুনের কবলেও যা নষ্ট হবার নয়।
আবার সে ব্যাগ তুলে নিল, আবার সে তীক্ষ্ণদৃষ্টি বুলিয়ে বৈঠকখানার চতুর্দিক পরীক্ষা করল, তারপর ঘর ছেড়ে বাড়ির বাইরে গেল। সদর দরজার কুলুপে চাবি লাগাল। তারপর হনহন করে চলল স্টেশনের দিকে। কিন্তু এবার সে ভুলে গেল, বৈঠকখানার আলো নিবিয়ে দিতে!
ট্রেন আসবার আগেই অক্ষয় স্টেশনে গিয়ে পৌঁছল। টিকিট কিনল। তারপর যেন নিশ্চিন্তভাবেই প্ল্যাটফর্মের উপরে পায়চারি করতে লাগল।
সে আড়চোখে বেশ লক্ষ করল, ট্রেনের সিগন্যাল দেওয়া হয়নি বটে, কিন্তু চারিদিকেই যেন একটা চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। যাত্রীরা প্ল্যাটফর্মের একপ্রান্তে গিয়ে দলবেঁধে রেললাইনের একদিকেই দূরে তাকিয়ে আছে।
সঙ্কোচ-ভরা কৌতূহলের সঙ্গে অক্ষয় সেইদিকে এগিয়ে গেল পায়ে-পায়ে।
অন্ধকার ফুঁড়ে আত্মপ্রকাশ করলে দুইজন লোক। প্ল্যাটফর্মের ঢালু প্রান্ত দিয়ে উপরে উঠে এল। তারা তেরপলে ঢাকা স্ট্রেচারে করে কী যেন বয়ে আনছে।
সেটা যে কী, তা বুঝতে অক্ষয়ের দেরি লাগল না। তার বুক করতে লাগল ছাঁৎ ছাঁৎ।
তেরপলের তলা থেকে একটা অস্পষ্ট দেহের গঠন ফুটে উঠছে যাত্রীরা তাড়াতাড়ি এপাশে-ওপাশে সরে গিয়ে সেইদিকে তাকিয়ে রইল আড়ষ্ট, মন্ত্রমুগ্ধ চোখে।
বাহকরা চলে গেল। পিছনে-পিছনে আসছিল একটা কুলি। তার হাতে একটা ব্যাগ আর ছাতা।
হঠাৎ যাত্রীদের ভিতর থেকে একটি ভদ্রলোক বেরিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, যে লোক কাটা পড়েছে, ওটা কি তারই ছাতা?
কুলি বললে, হাঁ বাবু! ছাতাটা সে ভদ্রলোকের চোখের সামনে তুলে ধরল। দামি ছাতা। তার হাতলটা বিশেষ ধরনের রুপো দিয়ে বাঁধানেনা।
ভদ্রলোক সচমকে বলে উঠলেন, হা ভগবান! বল কী?
তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন আর-একটি দীর্ঘদেহ ভদ্রলোক। তিনি শুধোলেন, কেন বসন্তবাবু, আপনি একথা বলছেন কেন?
বসন্তবাবু বললেন, ওটা হচ্ছে মণিলাল বুলাভাইয়ের ছাতা। আমি বাঁট দেখেই চিনেছি!
.
দ্বিতীয় অংশ — অপরাধ আবিষ্কারের কলাকৌশল
প্রথম
ডাক্তার দিলীপ চৌধুরীর এত নামডাক ডাক্তারির জন্যে নয়। তিনি সুবিখ্যাত রসায়নতত্ত্ববিদ। এবং তার আসল খ্যাতির কারণ, বিজ্ঞানের সাহায্যে বিচিত্র উপায়ে তিনি বহু কঠিন ও রহস্যপূর্ণ পুলিশ-কেসের কিনারা করেছেন। শ্ৰীমন্ত সেন হচ্ছেন তাঁর বিশেষ বন্ধু ও নিত্যসঙ্গী। নিচেকার অংশ শ্ৰীমন্ত সেনের ডায়ারি থেকে তুলে দেওয়া হল।
সকলেই জানেন, চিকিৎসাশাস্ত্রের সঙ্গে যেখানে আইনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকে, সেখানে পুলিশের মাথাওয়ালারা আমার বন্ধু ডাক্তার দিলীপ চৌধুরীর সাহায্য লাভ করবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন।
