এইবারে আসল কাজ। টেবিলের টানার ভিতর থেকে সে একটা ফিতার কাঠিম বার করল। খানিকটা ফিতা ছিঁড়ে নিয়ে মৃতের ছাতা ও ব্যাগটা বেঁধে নিজের কাঁধে ঝুলিয়ে রাখল, তারপর ভূমিতল থেকে মৃতব্যক্তিকে টেনে তুলল আর-এক কাঁধের উপরে। মণিলাল ছোটখাটো মানুষ, তার দেহও ভারি নয় এবং অক্ষয় হচ্ছে দীর্ঘদেহ, হৃষ্টপুষ্ট, বলবান ব্যক্তি–সুতরাং তার পক্ষে বড়জোর একমণ পনেরো বা বিশ সের ওজনের একটা দেহের ভার বহন করা বিশেষ কষ্টসাধ্য নয়।
শীতার্ত অন্ধ রাত্রিচারিদিক নিঝুম।
অক্ষয় খিড়কি দিয়ে বেরিয়ে পোড়ো জমির উপরে গিয়ে পড়ল। কুয়াশায় অন্ধকারকে যেন আরও ঘন করে তুলেছে–চোখ চেয়েও কিছু দেখা যায় না।
অক্ষয় খানিকক্ষণ কান পেতে দাঁড়িয়ে রইল। একটা ভীত শিয়াল বা কুকুরের দ্রুত পদশব্দ ছাড়া আর জনপ্রাণীর সাড়া পাওয়া গেল না।
অক্ষয় তখন দৃঢ়পদে অগ্রসর হল। পোড় জমিটা এবড়ো-খেবড়ো ও কাঁকর-ভরা হলেও আঁধার রাতে তার খুব অসুবিধা হল না কারণ এ-মাঠ তার বিশেষ পরিচিত।
ঘাসের উপর তার পায়ের শব্দ হচ্ছিল না বটে, কিন্তু সেই সূচিভেদ্য স্তব্ধতার মধ্যে তার কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ আর ছাতা পরস্পরের সঙ্গে ঠোকাঠুকি করে তুলছিল একটা বিরক্তিজনক আওয়াজ। মণিলালের দোদুল্যমান মৃতদেহের চেয়ে সেই ব্যাগ ও ছাতাকে সামলাবার জন্য অক্ষয়কে বিশেষ বেগ পেতে হচ্ছিল।
এই পোড়ো জমির পাশেই রেললাইন। সাধারণত জমিটুকু পার হতে তিন-চারমিনিটের বেশি সময় লাগে না। কিন্তু রাত্রের অন্ধকারে পিঠে একটা মড়া নিয়ে অতি সাবধানে চারিদিকে চোখ ও কান রেখে, চলতে-চলতে মাঝে-মাঝে হঠাৎ থেমে দাঁড়িয়ে আবার অগ্রসর হতে গিয়ে অক্ষয়ের প্রায় আট-নয়মিনিট লাগল।
তারপর পাওয়া গেল রেললাইনের তারের বেড়া। আবার সে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল খানিকক্ষণ। তার সন্দিগ্ধ দৃষ্টি খুঁজতে লাগল কোনও জীবন্ত ছায়া, তার কান খুঁজতে লাগল কোনও জীবনের সাড়া। কিছু নেই। খালি অন্ধকার, খালি নীরবতা।
হঠাৎ দূর থেকে জেগে উঠল চলন্ত রেলগাড়ির চাকার গড়গড় আওয়াজ–তারপর অতি-তীব্র বাঁশির চিৎকার!
অক্ষয় সজাগ হয়ে উঠল–আর দেরি নয়! সে তাড়াতাড়ি তারের বেড়া পার হল। তারপর যেখানটায় লাইন বেঁকে মোড় ফিরেছে সেইখানে গিয়ে দাঁড়াল। লাশটাকে কাঁধ থেকে নামিয়ে মাটির উপরে এমনভাবে উপুড় করে রাখল, যাতে দেহের কণ্ঠদেশটা পড়ে ঠিক লাইনের উপরে।
তারপর সে পকেট থেকে ছুরি বার করে ছাতা ও ব্যাগের ফিতা কেটে ফেলল। ছাতা ও ব্যাগটাকে রাখলে ঠিক লাশের পাশে। সযত্নে ফিতাটাকে আবার পকেটে পুরল, লাইনের কাছে পড়ে রইল কেবল ফিতার ফসটুকু। সেটা তার চোখ এড়িয়ে গেল।
গাড়ির শব্দ কাছে এগিয়ে এসেছে। এখানা নিশ্চয়ই মালগাড়ি।
অক্ষয় শীঘ্রহস্তে পকেট থেকে কাগজের মোড়কটাকে বার করল। চশমার তোবড়ানো ফ্রেমটা রেখে দিলে মৃতের মাথার পাশে। এবং কাচের টুকরোগুলো ছড়িয়ে দিল তারই চতুর্দিকে!
ইঞ্জিনের ধূম্র-উদগিরণের ভেঁস-ভোস শব্দ শোনা যাচ্ছে অতি নিকটে! অক্ষয়ের ইচ্ছা হল, সেইখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। স্বচক্ষে দেখে যায়, যবনিকা-পতনের পূর্বে এই বিয়োগান্ত নাটকের শেষ দৃশ্যটা কেমন করে নরহত্যা পরিণত হয় আত্মহত্যায় বা দৈব-দুর্ঘটনায়।
কিন্তু না, এখানে তার উপস্থিতি নিরাপদ নয়। তা হলে হয়তো অদৃশ্য হবার আগে কেউ তাকে দেখে ফেলবে। চটপট সে আবার বেড়া পার হল, দ্রুতপদে পোড়ো জমির উপর দিয়ে নিজের বাড়ির দিকে ফিরতে লাগল–পিছনে যথাস্থানে আগতপ্রায় রেলগাড়ির বজ্রধ্বনি শুনতে-শুনতে।
রেলগাড়ি দাঁড়িয়ে পড়েছে!
শ্বাস রুদ্ধ করে ভূপ্রোথিত মূর্তির মতন স্তম্ভিত হয়ে অক্ষয় দাঁড়িয়ে পড়ল–মুহূর্তের জন্যে। তারপর সে প্রায় দৌড়ে নিজের বাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়ল। নীরবে দরজা বন্ধ করে খিল লাগিয়ে দিলে।
সে ভয় পেয়েছে। ব্যাপার কী? গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ল কেন? নিশ্চয়ই লাশটা আবিষ্কৃত হয়েছে।
কিন্তু, এখন কী হচ্ছে ওখানে? ওরা কি তার বাড়িতে আসবে? রান্নাঘরের কাছে দাঁড়িয়ে সে উত্তর্ণ হয়ে শুনতে লাগল। হয়তো এখনই কেউ এসে তার দরজার কড়া নাড়বে।
বৈঠকখানায় ঢুকে পড়ে সে ব্যস্তভাবে তাকিয়ে দেখলে চারিদিকে। সমস্তই বেশ গোছালো।
কিন্তু লোহার ডান্ডাটা এখনও ঘরের মেঝেয় পড়ে আছে।
সে ডান্ডাটা তুলে নিয়ে ল্যাম্পের আলোয় পরীক্ষা করে দেখলে। তার উপরে কোনও রক্তের দাগ নেই। কেবল দুই-একগাছা চুল লেগে আছে।
রেলগাড়ির ব্যাপারটা ভাবতে-ভাবতে অন্যমনস্কর মতন সে টেবিল-কাপড় দিয়ে ডান্ডাটা একবার মুছে ফেললে।
সেটাকে নিয়ে আবার বাড়ির পিছন দিকে দৌড়ে গেল। পাঁচিলের উপর দিয়ে ডান্ডাটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিল–সেটা পড়ল গিয়ে পোড়ো জমির বিছুটির ঝোপের ভিতরে।
ডান্ডাটার ভিতরে তাকে ধরিয়ে দেবার মতন কোনও প্রমাণ ছিল না। কিন্তু সেটাকে অস্ত্ররূপে ব্যবহার করা হয়েছে বলেই অক্ষয়ের চক্ষে তা ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল।
সে বুঝল, এইবার তার স্টেশনের দিকে যাত্রা করা উচিত। যদিও এখনও গাড়ির সময় হয়নি তবু আর বাড়ির ভিতরে থাকতে তার ভরসা হল না। সে চায় না, এখানে এসে কেউ তাকে দেখতে পায়।
অক্ষয় তাড়াতাড়ি বাইরে বেরুবার আয়োজন সেরে নিলে। তারপর একটা ব্যাগ তুলে। নিয়ে বৈঠকখানা থেকে বেরিয়ে পড়তে গেল।
