হঠাৎ অক্ষয়ের চোখ পড়ল দালানের কোণে। সেখানে দেওয়ালের কোণে দাঁড় করানো রয়েছে একটা লোহার গরাদে। বাড়ির জানলা থেকে এটা কবে খুলে পড়েছিল, ভৃত্য রামচরণ এখানে এনে রেখেছিল? একমিনিট আগে এইটেই যদি আমার হাতে থাকত।
অক্ষয় লোহাগাছা তুলে নিলে। হাতের উপরে রেখে তার ভার পরীক্ষা করল… হু, এটা হচ্ছে দস্তুরমতো অস্ত্র, ব্যবহার করবার সময় বন্দুক বা রিভলভারের মতন চিৎকার করে পাড়া জাগায় না। আমার কার্যসিদ্ধির পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু না, না, এসব কথা নিয়ে মাথা ঘামানো ভালো নয়। এটাকে যথাস্থানে রেখে দেওয়াই উচিত!
কিন্তু লোহার ডান্ডা সে রেখে দিলে না। উঁকি মেরে দেখলে, মণিলাল তখনও সেইভাবে বসেই সিগারেট টানছে।
আবার অক্ষয়ের ভাব-পরিবর্তন হল! আবার তার মুখ হয়ে উঠল রাঙা-টকটকে ও ভ্রূকুটিকুটিল এবং গলার উপরে ফুলে উঠল একটা শির এবং পায়ে-পায়ে আবার সে এগিয়ে এল বৈঠকখানার ভিতরে।
মণিলালের চেয়ার থেকে কিছু তফাতে দাঁড়িয়ে সে মাথার উপরে তুললে লোহার ডান্ডা! একটা অস্পষ্ট শব্দ হল। ডান্ডাটা যখন নিচে নামছে, মণিলাল হঠাৎ ফিরে দেখল। তাইতেই অক্ষয়ের লক্ষ্য আংশিকভাবে ব্যর্থ হয়ে গেল–ডান্ডাটা মণিলালের মাথার উপরে না পড়ে একপাশ ঘেঁষে নেমে গেল, একটা অপেক্ষাকৃত সামান্য রকম আঘাত দিয়ে।
ভয়ার্ত বিকট চিৎকার করে মণিলাল লাফিয়ে দাঁড়িয়ে উঠল এবং প্রাণপণে চেপে ধরল। অক্ষয়ের দুই হাত।
তারপর আরম্ভ হল বিষম ধস্তাধস্তি! দুজনেই দুজনকে চেপে ধরল সাংঘাতিক আলিঙ্গনে এবং দুজনেই কখনও দুলতে থাকে এপাশে-ওপাশে, কখনও এগিয়ে বা কখনও পিছিয়ে যায়! চেয়ার পড়ল উলটে, টেবিলের উপর থেকে ঠিকরে পড়ল একটা কাচের গেলাস, মণিলালের চশমারও হল সেই দশা, দুজনের পায়ের চাপে গেলাস ও চশমা ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল।
এবং তারপরেও আরও বার-তিনেক জাগল মণিলালের সেই বিকট চিৎকার–বিদীর্ণ করে রাত্রির স্তব্ধতা! সেই উন্মাদগ্রস্ত অবস্থাতেও অক্ষয়ের বুক আতঙ্কে শিউরে উঠল। যদি কোনও পথিক দৈবগতিকে এদিকে এসে পড়ে, যদি সে শুনতে পায়?
নিজের দেহের সমস্ত শক্তি একত্র করে অক্ষয় তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে ঠেলে নিয়ে টেবিলের উপর ফেলে চেপে ধরল এবং টেবিলের আচ্ছাদনের এক অংশ তুলে পুরে দিল তার মুখের ভিতরে। এইভাবে তারা নিশ্চল হয়ে রইল পূর্ণ দুই মিনিট ধরে–সে এক ভয়াবহ নাটকীয় দৃশ্য!
দেখতে-দেখতে মণিলালের দেহ পড়ল এলিয়ে, ক্রমে-ক্রমে তার মাংসপেশির সমস্ত স্পন্দন থেমে গেল। তখন অক্ষয় তাকে ছেড়ে দিল, মণিলালের জীবনহীন দেহটা মাটির উপরে এলিয়ে লুটিয়ে পড়ল।
যা হবার তা হয়ে গেল। এতক্ষণ যে-সম্ভাবনাকে অক্ষয় ভয় করছিল, তা পরিণত হল নিশ্চিত সত্যে! যাক, এ-বিষয় নিয়ে আর অনুতাপ করা মিথ্যা। অনুতাপের দ্বারা মড়াকে আর করা যাবে না জীবন্ত।
.
চতুর্থ
অক্ষয় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাঁফাতে লাগল। শীতকালেও সে ঘেমে উঠেছে।
রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে ঘড়ির দিকে তাকাল।
সবে সাড়ে সাতটা!
এই ক’মিনিটের মধ্যে এতবড় কাণ্ড ঘটে গেল! এতক্ষণ প্রত্যেক মিনিটই ছিল যেন একঘণ্টার মতন দীর্ঘ।
সাড়ে সাতটা! ট্রেন আসবে সাড়ে আটটায়, হাতে সময় আছে আর-একঘণ্টা! এর মধ্যেই বাকি সমস্ত কাজ শেষ করে ফেলতে হবে। তা একঘণ্টা সময় নিতান্ত অল্প নয়।
অক্ষয়ের ভাবভঙ্গি এখন শান্ত। তার একমাত্র দুর্ভাবনা, মণিলালের চিৎকার কেউ শুনতে পেয়েছে কি না। কেউ যদি না শুনে থাকে, তা হলে তাকে আর পায় কে!
সে হেঁট হয়ে মৃতব্যক্তির দাঁতের ভিতর থেকে টেবল ক্লথখানা আস্তে-আস্তে টেনে বার করে নিল। তারপর তার জামাকাপড় খুঁজতে আরম্ভ করল। বেশিক্ষণ লাগল না যা খুঁজছিল তা পেতে।
একটি ছোট্ট চামড়ার বাক্সের ভিতরে আলাদা-আলাদা কাগজের মোড়কে রয়েছে হিরা, চুনি, পান্না ও মুক্তা প্রভৃতি অনেক দামি জিনিস। তা হলে তার শ্রম সার্থক! মানুষের প্রাণবধ করেছে বলে তার মনে আর কোনওরকম অনুশোচনার সঞ্চার হল না। বরং নিজেই নিজেকে দিতে লাগল অভিনন্দন।
তারপর সে সুপটু হাতে কর্তব্য-সম্পাদনে নিযুক্ত হল। টেবল-ক্লথের উপরে পড়েছিল কয়েক ফোঁটা রক্ত। লাশের মাথার তলায় কার্পেটেরও উপরে লেগেছে রক্তের ছোপ। জল ও ন্যাকড়া এনে সে আগে সাবধানে রক্তচিহ্নগুলো ধুয়ে-মুছে ফেলল। তারপর লাশের মাথার তলায় একখানা। খবরের কাগজ রেখে দিল নতুন রক্ত লেগে যাতে আর কার্পেট কলঙ্কিত না হয়।
তারপর টেবিল কাপড়খানা আবার টেবিলের উপরে পেতে দিল, উল্টানো চেয়ারখানা দাঁড় করিয়ে দিলে সোজা করে।
কার্পেটের উপরে পড়েছিল একটা পায়ের চাপে চ্যাপ্টা সিগারেটের ধ্বংসাবশেষ ও একটা দেশলাইয়ের কাঠি। সে দুটো তুলে ছুঁড়ে দালানের দিকে ফেলে দিলে। কার্পেটের উপরে একরাশ কাচের গুঁড়ো পড়েছিল। সেই তারামার্কা গেলাসের ও মণিলালের চশমার ভাঙা কাচ। সেগুলো তুলে আগে সে একখানা কাগজের উপরে জড়ো করলে। তারপর যতদূর সম্ভব যত্ন করে বেছে-বেছে চশমা-ভাঙা কাচের টুকরোগুলো আর-একখানা কাগজের উপরে তুলে রাখল। চশমার ফ্রেম ও কাচের চূর্ণগুলো মোড়কে পুরে রাখল নিজের পকেটের ভিতরে। যেগুলোকে গেলাসের ভাঙা কাচ বলে মনে হল, সেগুলো কাগজে করে তুলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে বাড়ির খিড়কির দিকে গেল। সেখানে একটা আস্তাকুঁড় ছিল কাগজে-মোড়া কাচগুলো তার ভিতরে ফেলে দিয়ে আবার ফিরে এল।
