আমি হতভম্বের মতন বললুম, আপনি কী বলতে চান যে, আমি স্বপ্ন দেখছি না?
না।
এখন আমি কোথায়? এইটুকু আমার মনে আছে যে, আমি পাহাড়ের খাদে পড়ে গিয়েছিলুম!
ঠিক তাই। তোমাকে আমরা সেইখান থেকেই কুড়িয়ে এনেছি। তুমি নিশ্চয়ই বাঁচতে না। তোমার মেরুদণ্ড আর দু-খানা পা ভেঙে গিয়েছিল। আমি বৈজ্ঞানিক উপায়ে আবার তোমাকে বাঁচিয়ে তুলেছি।
লোকটা বলে কী? আমি স্বপ্ন দেখছি না তো এ কী দেখছি? মানুষ কখনও ঝোলানো টেবিলে এমনভাবে পিঠ রেখে শুনে শুয়ে থাকতে পারে? আর নীচে ওই যে প্রকাণ্ড চাঁদের মতন মুখখানা আমার সঙ্গে কথা কইছে, ওরকম মুখ দুনিয়াতে কেউ কখনও দেখেছে? আমার মাথাটা বোঁ বোঁ করে ঘুরতে লাগল।
পিপের মুখ আবার বললে, অমল, এখন তুমি আরোগ্য লাভ করেছ।
আমি বললুম, আপনি আমার নাম জানলেন কী করে?
তোমার পকেট-বই দেখে। রোসো তোমাকে নামিয়ে দিচ্ছি।–এই বলেই সেই চাঁদমুখো কেমন করে কী কল টিপলে জানি না, কিন্তু আমাকে সুদ্ধ নিয়ে টেবিলটা ধীরে ধীরে ঘুরে সোজা হয়ে মাটির ওপরে গিয়ে দাঁড়াল।
চাঁদমুখো বললে, এইবার তুমি নীচে নামতে পারো!
আমি আস্তে আস্তে উঠে বসে টেবিল ছেড়ে নেমে পড়লুম। পিপের ভিতর থেকে একখানা হাত বেরুল–সেই হাতে একটা কাচের গেলাস। চাঁদমুখো বললে, নাও, এইটুকু পান করো।
গেলাসে সবুজ রঙের কী একটা তরল পদার্থ ছিল। যেমনি তা পান করলুম, অমনি আমার দেহের ভিতর দিয়ে যেন একটা জ্বালাময় বিদ্যুৎপ্রবাহ ছুটে গেল!
আমি সভয়ে বলে উঠলুম, এ আমার কী খাওয়ালেন?
চাঁদমুখো হেসে বললে, ভয় নেই–ভয় নেই! ওতে তোমার উপকারই হবে!
আমি আবার জিজ্ঞাসা করলুম, আমি এখন কোথায় আছি?
আফ্রিকার এক গুপ্ত দেশে।
আপনি বাংলা শিখলেন কোথা থেকে?
এখানে সবাই বাংলা বলে। আমাদের ইতিহাস পরে বলব অখন, এখন যা বলি শোনো। আমি জানি তুমি বাঙালি। কিন্তু এ দেশে বিদেশিদের প্রবেশ নিষেধ। তবু যে তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছি, তার কারণ তোমাকে নিয়ে আমি একটা নতুন রকম পরীক্ষা করতে চাই। কিন্তু মহারাজ তোমাকে এখানে থাকতে দেবেন কি না জানি না। শীঘ্রই মহারাজার সভা বসবে। সেই সভায় স্থির হবে, তোমাকে এদেশে থাকতে দেওয়া হবে কি তোমাকে হত্যা করা হবে!
আমি চমকে উঠে বললুম, হত্যা?
চাঁদমুখো বেশ স্থির ভাবেই বললে, হ্যাঁ। এদেশে কোনও বিদেশি এলে তাকে হত্যা করাই হচ্ছে এখানকার আইন।
চমৎকার আইন! আমার বুক ভারি দমে গেল।
চাঁদমুখো বললে, কিন্তু অমল, একথা ভেবে এখন তুমি মাথা খারাপ কোরো না। তোমাকে যাতে হত্যা করা না হয়, আমি প্রাণপণে সে চেষ্টা করব।
আমি কৃতজ্ঞ স্বরে বললুম, ধন্যবাদ। কিন্তু আপনার নামটি জানতে পারি কি?
চাঁদমুখে বললেন, এ রাজ্যে কেউ আমার নাম ধরে ডাকে না। তুমি আমাকে পণ্ডিতমশাই বলে ডেকো। আমি মহারাজার প্রধান পণ্ডিত জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা করাই আমার কাজ। বলেই পণ্ডিতমশাই ঘরের ভিতরে পায়চারি করতে লাগলেন।
এতক্ষণ পরে হঠাৎ একটা ব্যাপার দেখে আমার চক্ষুস্থির হয়ে গেল! কী সর্বনাশ, পিপের ভিতর থেকে বেরিয়েছে তিনখানা মানুষের পা আর পিপের একদিকে আছে পণ্ডিতমশাইয়ের চাঁদ-মুখ–এবং এই মুখ-পা-ওয়ালা পিপেটা আমার চোখের সামনে ঘরময় ঘুরে বেড়াতে লাগল।
একটা জাপানি রূপকথায় আশ্চর্য এক চায়ের কেটলির বর্ণনা পড়েছিলুম। সেই চায়ের কেটলিটার বিষম এক বদ অভ্যাস ছিল। মাঝে-মাঝে হাত-পা-মুখ বার করে সে নাচের নানারকম প্যাঁচ দেখাত! কিন্তু সেসব হচ্ছে তো ছেলেভুলানো বাজে গল্প! আজ আমার চোখের সুমুখে হাত-পা-মুখ-ওয়ালা যে জ্যান্ত পিপেটাকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, একে তো গাঁজাখোরের নেশার খেয়াল বলে উড়িয়ে দেওয়া চলে না কিছুতেই।
আমি হাঁ করে অবাক হয়ে চেয়ে আছি দেখে পণ্ডিতমশাই মুচকে হেসে বললেন, আমার দেহটা একটু নতুনরকম দেখাচ্ছে? আচ্ছা, এসব কথা নিয়ে পরে আলোচনা করা যাবে অখন, আপাতত একটু কাজে আমি বাইরে যাচ্ছি। ততক্ষণ আমার মেয়ের সঙ্গে তুমি গল্প করো– আমি গেলেই সে আসবে!
কাগজের একরকম সাপ দেখেছ? যখন জড়ানো থাকে তখন খুব ছোট। তারপর ছেলেরা যেই ফুঁ দেয় অমনি ফুড়ুৎ করে হাত খানেক লম্বা হয়ে যায়! ঠিক সেই ভাবেই পিপে-পণ্ডিতের পাশ থেকে ফুড়ুৎ করে একখানা হাত বেরিয়ে পড়ল এবং একটানে ঘরের দরজাটা খুলে ফেলেই হাতখানা চোখের নিমিষে আবার অদৃশ্য হয়ে গেল। পণ্ডিতমশাই যেখানে দাঁড়িয়েছিলেন সেখান থেকে ঘরের দরজাটা ছিল ষোলো-সতেরো হাত তফাতে!
তার পরেই দেখি, পণ্ডিতমশাইয়ের ঠ্যাং তিনখানাও গুটিয়ে পিপের ভিতরে ঢুকে গেল এবং পিপেটা মাটির ওপরে গড়াতে-গড়াতে ঘরের দরজার ভিতর দিয়ে বেরিয়ে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল!
নিজের চোখকেও আমি বিশ্বাস করতে পারলুম না–এও কখনও সম্ভব হয়?
বিস্ফারিত নেত্রে দরজার দিকে তাকিয়ে আকাশপাতাল ভাবছি আর ঘেমে উঠছি, এমন সময়ে হঠাৎ দেখি, সেখানেও এক অপূর্ব নতুন মূর্তির আবির্ভাব।
.
সপ্তম । মায়াময়ী কমলা
এবারে যার আবির্ভাব হল, তাকে দেখে ভয় পাবার কোনও কারণ ছিল না। কারণ তাকে দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায় আর প্রাণ মন খুশি হয়ে উঠে। পরমাসুন্দরী সে–যেন রূপকথার রাজকুমারী!
পরমাসুন্দরী মেয়ের কথা অনেক উপকথায়, অনেক কাব্যে এবং অনেক গল্প-উপন্যাসে পাঠ করেছি। কিন্তু এ-মেয়েটির রূপ সেসব বর্ণনার চেয়েও ঢের বড়! এর চেয়ে সুন্দর রং, গড়ন ও নাক-চোখ-মুখের কল্পনাও করা অসম্ভব! সৃষ্টিছাড়া পিপে-জগতে স্বপ্নলোকের এই মানসকন্যাকে দেখে যেন মোহিনী-মন্ত্রে আমার মন অভিভূত হয়ে গেল!
