বড়জোর দশ মিনিট।
এই তো সবে সাতটা-বিশ! এখনও একঘণ্টারও বেশি সময় আছে। বাইরের ঠান্ডায় অন্ধকারের চেয়ে এ-ঘর ঢের ভালো। মিছে তাড়াতাড়ি করবার দরকার আছে কি?
কিছু না, কিছু না। অক্ষয়ের কণ্ঠস্বর খানিক খুশি, খানিক বিষাদমাখা। আরও খানিকক্ষণ সে সেইখানেই দাঁড়িয়ে রইল কালো রাত্রির মধ্যে দুই চোখ ডুবিয়ে স্বপ্নাচ্ছন্নের মতো। তারপর দরজা বন্ধ করে দিলে, নিঃশব্দে।
তারপর সে নিজের চেয়ারে বসে বাক্যব্যয়ে নারাজ মণিলালের সঙ্গে আলাপ জমাবার চেষ্টা করল। কিন্তু তার কথাগুলো হল কেমন যেন বাধো-বাবধা, অসংলগ্ন! সে অনুভব করলে, তার মুখ যেন ক্রমেই তপ্ত, তার মস্তিষ্ক যেন ক্রমেই পরিপূর্ণ হয়ে উঠছে এবং তার কান যেন করছে ভেঁা ভো! তার চোখ যেন কী এক ভয়াবহ একাগ্রতার সঙ্গে মণিলালের দিকে নজর দিতে চায়। প্রাণপণে সে অন্যদিকে দৃষ্টি ফেরালে বটে, কিন্তু পরমূহুর্তেই আরও ভয়ানকভাবে আবার তার দিকেই তাকাতে বাধ্য হল এবং তার মনের ভিতরে কেবল এই প্রশ্নই চলাফেরা করতে লাগল–এমন অবস্থায় পড়লে অন্য কোনও খুনি কী করত, কী করত, কী করত? দেখতে-দেখতে সে ধীরে-ধীরে প্রত্যেক দিক থেকে নিজের ভীষণ সংকল্পকে পরিপূর্ণ করে তুললে,–কোনও দিকেই কোনও ছিদ্র রাখল না।
তার মনে জাগল অস্বস্তি। মণিলালের দিকে খর-নজর রেখেই সে চেয়ার ছেড়ে উঠে। দাঁড়াল। পকেটে যার অতুল ঐশ্বর্য তার সুমুখে সে আর বসে থাকতে পারল না। সভয়ে অনুভব করল, তার মনের ঝোঁকটা ক্রমেই মাত্রা ছাড়িয়ে উঠছে। এখানে বসে থাকলে সে হঠাৎ নিজের উপরে সমস্ত কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলবে এবং তারপর–।
তারপর যা হতে পারে সেটা ভাবতেই অক্ষয়ের সমস্ত শরীর আতঙ্কে শিউরে উঠল, কিন্তু সেইসঙ্গে রত্নের পুঁজি হাতাবার জন্যে তার হাত যেন নিশপিশ করতে লাগল।
হাজার হোক, অক্ষয় অপরাধী ছাড়া কিছুই নয়। এইসব কাজেই অভ্যস্ত। সে হচ্ছে। শিকারি বাঘ! সৎপথে কোনওদিন অর্থোপার্জন করেনি তার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হচ্ছে হিংস্র। সুতরাং এমন সহজলভ্য ঐশ্বর্যকে ত্যাগ করবার প্রবৃত্তি তার হতেই পারে না। এত হিরা-পান্না তার হাতের কাছে এসেও হাত ছাড়িয়ে যাবে, এই সম্ভাবনা অক্ষয়ের চিত্তকে ক্রমেই বেপরোয়া করে তুলতে লাগল।
এই বিষম লোভের নাগাল থেকে বেরিয়ে যাবার জন্যে সে আর-একবার শেষ চেষ্টা করবে স্থির করল, যতক্ষণ না ট্রেনের সময় আসে ততক্ষণ মণিলালের সামনে থাকবে না।
অক্ষয় বলল, মশাই, আমি জামা-জুতো কাপড় বদলে আসি। যে রকম ঠাণ্ডা পড়েছে, এ-পোশাকে বাইরে যাওয়া উচিত নয়।
মণিলাল বললে, নিশ্চয়ই নয়। অসুখ হতে পারে।
বৈঠকখানায় একপাশে ছিল দালান, ঘর থেকে বেরিয়ে অক্ষয় সেইখানে গিয়ে দাঁড়াল। তার জামাকাপড় বদলাবার দরকার নেই–ওটা বাজে ওজর মাত্র। তবু সে আলনার কাছে গিয়ে অকারণেই পোশাক পরিবর্তনে নিযুক্ত হল। ভাবলে, এইখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই বাকি সময়টা কাটিয়ে দেবে।
সে একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলে–অস্বস্তির। ওঃ, ও-ঘর হচ্ছে অভিশপ্ত–ওখানকার বাতাস বিষাক্ত। ওখান থেকে পালিয়ে এসে বাঁচলুম–নইলে এখনি হয়তো কী করতে গিয়ে কী করে ফেলতুম! এখানে থাকলে প্রলোভন আর আমাকে আক্রমণ করতে পারবে না।
.
তৃতীয়
এখানে থাকলে হয়তো প্রলোভন আর আমাকে আক্রমণ করতে পারবে না–হয়তো সময় উত্তীর্ণ হয়ে যাচ্ছে দেখে মণিলাল নিজেই চলে যাবে। হ্যাঁ, সে একলা চলে গেলেই খুশি হই, তা হলে সমস্ত আপদই চুকে যায়–অন্তত এই ভীষণ সুযোগ বা সম্ভাবনার দায় থেকে আমি রেহাই পাই–আর ওই হিরা-পান্নাগুলো।
একজোড়া নতুন জুতো পরতে-পরতে অক্ষয় ধীরে-ধীরে মাথা তুললে।
খোলা দরজার দিকে পিছন ফিরে বসে আছে মণিলাল। কাগজ আর তামাক দিয়ে আপন মনে সে নতুন সিগারেট পাকাচ্ছে।
অক্ষয় আবার দীর্ঘশ্বাস ফেললে। তার জুতো পরা আর হল না। মণিলালের পৃষ্ঠদেশের দিকে নিষ্পলক নেত্রে তাকিয়ে স্থির হয়ে রইল সে মূর্তির মতো, তারপর দৃষ্টি না ফিরিয়েই পা থেকে জুতোজোড়া খুলে ফেললে।
মণিলাল নিশ্চিন্তভাবে সিগারেট পাকিয়ে তামাকের রবারের থলিটা পকেটের ভিতরে রেখে দিলে। তারপর জামার উপর থেকে তামাকের গুঁড়ো ঝেড়ে ফেলে দেশলাই বার করল।
আচম্বিতে কী এক প্রবল ঝোঁকের তাড়নায় অক্ষয় চট করে দাঁড়িয়ে উঠল এবং চোরের মতন গুঁড়ি মেরে পা টিপে টিপে বৈঠকখানার ভিতরে গিয়ে ঢুকল। তার পায়ে এখন জুতো নেই, কোনও শব্দ হল না। বিড়ালের মতন চুপিচুপি সে এগিয়ে চলল ধীরে-ধীরে। তার মুখ চকচকে, তার দুই চক্ষু উজ্জ্বল ও বিস্ফারিত এবং নিজের কানে সে শুনতে পেলে ধমনীর রক্ত-চলাচল-ধ্বনি!
মণিলাল দেশলাই জ্বেলে সিগারেট ধরাল এবং তারপর ধূমপান করতে লাগল।
ধাপে-ধাপে নিঃশব্দে এগিয়ে অক্ষয় গিয়ে দাঁড়াল একেবারে মণিলালের চেয়ারের পিছনে। পাছে তার নিশ্বাস মণিলালের মাথার উপরে গিয়ে পড়ে, সেই ভয়ে সে নিজের মুখ ফিরিয়ে নিল। এইভাবে কেটে গেল আধমিনিট! সে যেন সাক্ষাৎ হত্যার মূর্তি বলির জীবের দিকে তাকিয়ে আছে ভয়াল প্রদীপ্ত চক্ষে, উন্মুক্ত মুখবিবর দিয়ে দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস বইছে নীরবে, দুই হাতের আঙুলগুলো যেন ধড়ফড় করছে বহুমুখ সর্পের মতো!
তারপর আবার তেমনি নিঃশব্দেই অক্ষয় ফিরে গেল দালানের দিকে। একটা গভীর নিশ্বাস ফেলল। একটু হলেই হয়েছিল আর কী! মণিলালের জীবন ঝুলছিল একগাছা সরু সুতোর ডগায়! সত্যিকথা বলতে কী, আমি যখন চেয়ারের পিছনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলুম, তখন যদি আমার হাতে কোনও অস্ত্র থাকত,–এমনকী একটা হাতুড়ি বা একখানা পাথর
