একটি তারাকাটা দামি কাচের গেলাসে জল ঢেলে বললে, কিছু মনে করবেন না, বাড়িতে আপাতত আর কিছু খাবার খুঁজে পেলুম না।
মণিলাল বলল, সঙ্কোচের কারণ নেই। যে-দুটি খাবার দিয়েছেন, ও-দুটিই আমি ভালোবাসি বলেই একটি রসগোল্লা তুলে মুখের ভিতর ফেলে দিলে।
মণিলাল যে কেন জমিদার বাড়িতে গিয়েছিল, এ কথা জানবার জন্যে অক্ষয়ের মনে আগ্রহ হল। কিন্তু অক্ষয় এ-সম্বন্ধে তাকে সরাসরি কোনও প্রশ্ন করতে ভরসা পেল না বরং মণিলালও প্রায় নীরবেই নিজের চা ও খাবার নিয়েই ব্যস্ত হয়ে রইল।
অক্ষয় ভাবতে লাগলঃ মণিলাল বুলাভাই হচ্ছে একজন নামজাদা জহুরি। সে যখন নিজে জমিদারবাড়িতে এসেছে তখন কাজটা নিশ্চয়ই জরুরি।
কিন্তু কীরকম জরুরি…? হুঁ, বোঝা গেছে।
দিন দশ পরে জমিদারের একমাত্র মেয়ের বিয়ে! এতবড় ডাকসাইটে জমিদারের একমাত্র মেয়ের বিয়ে, না জানি কত হাজার টাকার জড়োয়া গহনা যৌতুক দেওয়া হবে। মণিলাল নিশ্চয়ই রাশি-রাশি হিরা-চুনি-পান্নার নমুনা নিয়ে এসেছে। ওর জামার আর ব্যাগের ভিতরে খুঁজলে পাওয়া যাবে হয়তো লক্ষপতির ঐশ্বর্য!
অক্ষয় ছিঁচকে চোর নয়। তার মূলমন্ত্র মারি তো হাতি, লুঠি তো ভাণ্ডার! সোনা দানা সে অপছন্দ করে না বটে, কিন্তু হিরা-পান্নার দিকেই বেঁক তার বেশি। হিরা-পান্না বড় ভালো জিনিস; ভার নয়, মস্ত নয়, হাতের মুঠার ভিতরে লুকিয়ে রাখা যায় দস্তুরমতন সাত রাজার ধন।
অক্ষয় ভাবতে লাগল, মণিলালের কাছে কত টাকার পাথর আছে?
মণিলাল বললে, আজ ভারি শীত পড়েছে!
অক্ষয় বললে, হ্যাঁ, বড়। তারপর আবার ভাবতে লাগল : কত টাকার পাথর আছে? পাঁচ হাজার? দশ হাজার? .উঃ তার চেয়েও বেশি! জমিদার যত টাকার পাথর কিনবেন, তাকে দেখাবার জন্য মণিলাল নিশ্চয়ই তার ঢের-ঢের বেশি টাকার জিনিস এনেছে। নইলে ও নিজে আসত না। ওর কাছে বোধহয় পঞ্চাশ হাজার টাকার পাথর আছে।
অক্ষয় কেমন অস্থির হয়ে উঠল। নিজের অস্থিরতা ঢাকবার জন্যে বলল, আপনি ফুলের বাগান ভালোবাসেন?
মণিলাল শুষ্কস্বরে বলল, মাঝে-মাঝে পার্কে হাওয়া খেতে যাই। আমি কলকাতায় থাকি কি না।
আবার সে বোবা। এইটেই স্বাভাবিক। অক্ষয় বুঝল, মণিলাল বেশি কথা কইতে নারাজ, হাজার-হাজার টাকার সম্পত্তি যার সঙ্গে-সঙ্গে ফেরে, মুখরতা তার সাজে না।… ধরলুম, ওর কাছে পঞ্চাশ হাজার টাকার পাথর আছে। পঞ্চাশ হাজার অর্থাৎ আধ লক্ষ টাকা! ও-টাকায়। কোম্পানির কাগজ কিনলে মাসে কত টাকা আয় হয়। তার সঙ্গে যদি আমার জমানো টাকা যোগ করি–তা হলে? ওঃ! তা হলে আর আমাকে চুরি-চামারি করতে হয় না সারাজীবন পায়ের ওপর পা দিয়ে বসে-বসে খেতে পারি।
অক্ষয় একবার আড়চোখে মণিলালের দিকে তাকিয়ে চট করে আবার নজর ফিরিয়ে নিলে। তার মনের ভিতরে জেগে উঠছে একটা বিশ্রী ভাব–একে দমন করতেই হবে। আমি চুরি করি বটে, কিন্তু খুন? না, না, এ হচ্ছে ভয়াবহ পাগলামি! হ্যাঁ, একবার শ্যামবাজারের একটা পাহারাওয়ালাকে ছোরা মারতে হয়েছিল বটে, কিন্তু সে তো হচ্ছে তার নিজেরই দোষ। তারপর হাটখোলার সেই বুড়োটা। তার মুখ বন্ধ না করলে উপায় ছিল না, আমাকে দেখে সে যা ষাঁড়ের মতন চিৎকার শুরু করে দিয়েছিল! এ-দুটো হচ্ছে দৈব-দুর্ঘটনা ইচ্ছার বিরুদ্ধেই আমাকে কাজ করতে হয়েছিল। এজন্যে আমি নিজেও কম দুঃখিত নই। কিন্তু স্বেচ্ছায় নরহত্যা! খুন করে টাকা কেড়ে নেওয়া! উন্মত্ত না হলে এমন কাজ কেউ করে…!
তবে একথাও ঠিক, আমি যদি খুনি হতুম এমন সুযোগ আর পেতুম না। এত টাকার সম্পত্তি, খালি বাড়ি, পল্লির বাইরে নির্জন ঠাই, রাত্রিবেলা, ঘুটঘুটে অন্ধকার…।
কিন্তু এই লাশটা! খুনের পরে যত মুশকিল বাধে এই লাশ নিয়ে। লাশের গতি করা বড় দায়।
এমনি সময়ে হঠাৎ একখানা চলন্ত রেলগাড়ির শব্দ শোনা গেল। বাড়ির পিছনকার পোড়ো জমির ওপাশ দিয়ে লাইন যেখানে মোড় ফিরে গিয়েছে, গাড়ি আসছে সেইখান দিয়ে।
অক্ষয়ের মাথার ভিতর দিয়ে ধাঁ করে একটা নতুন চিন্তা খেলে গেল! সেই চিন্তা সূত্র ধরে তার মন হল অগ্রসর এবং তার দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল মণিলালের দিকে সে নিজের মনেই চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিচ্ছে মাঝে-মাঝে।
অক্ষয়ের বুকের ভিতরটা কেমন করে উঠল। সে তাড়াতাড়ি উঠে মণিলালের দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে দেওয়ালের বড় ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার মন যেন বললে– অক্ষয়, শিগগির বাড়ির বাইরে পালিয়ে যাও!
যদিও অক্ষয়ের দেহ হয়ে উঠেছিল তখন উত্তপ্ত, তবু তার বুকের ভিতরে জাগল যেন শীতের কাপন! মাথা ঘুরিয়ে দরজার পানে তাকিয়ে সে বলল, কী কনকনে হাওয়া! আমি কি ভালো করে দরজা বন্ধ করে দিইনি? এগিয়ে গিয়ে দু-হাট করে দরজা খুলে বাইরে উঁকি মারল। তার ইচ্ছা হল দৌড়ে খোলা বাতাসের কোলে গিয়ে পড়ে, একেবারে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ায়, এই আকস্মিক খ্যাপামির কবল থেকে মুক্তিলাভ করে।
বাইরের অন্ধকারের দিকে চেয়ে সে বললে, এইবার স্টেশনের দিকে পা চালালে কেমন হয়, তা-ই ভাবছি।
মণিলাল চায়ের শূন্য পেয়ালাটা রেখে দিয়ে মুখ তুলে বললে, আপনার ঘড়ি কি ঠিক?
অক্ষয় যেন অনিচ্ছাসত্ত্বেও ঘাড় নেড়ে জানালে, হ্যাঁ।
মণিলাল বললে, স্টেশনে গিয়ে পৌঁছতে কতক্ষণ লাগবে?
